kalerkantho


উদ্যমী বাংলাদেশ

রেললাইনের স্কুল

৩১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



রেললাইনের স্কুল

 নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ রেলস্টেশনের আধা কিলোমিটার দূরে রেললাইনের পশ্চিমে আছে একটি বস্তি। দূর থেকেই মাসুদ রানা আশিক দেখতে পাচ্ছিলেন শিশুদের কেউ বসেছে কাগজ বিছিয়ে, কেউ বা চটের ছালা। এই শিশুদের সবাই পথশিশু। তাদের পড়াচ্ছেন স্থানীয় একদল তরুণ

 

বিন ইয়ামিন বেশ লম্বা। তিনি আহসানউল্লাহ মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ান। মোয়াজ্জেম হোসেন মাঝারি গড়নের মানুষ। পড়ান আত্রাই মহিলা কলেজে। শিক্ষকদের মধ্যে আরো আছেন মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের কয়েকজন ছাত্র। কিভাবে শুরু হলো এই কার্যক্রম? প্রশ্ন করি মোয়াজ্জেম হোসেনকে।

প্রথমে হাসলেন, তারপর আমানউল্লাহ ফারুক বাচ্চুকে দেখালেন। বললেন, এই বাচ্চু আর আত্রাই উপজেলা স্থাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার আশিষ কুমার সরকার (এখন নওগাঁ সদরে কর্মরত) একদিন আহসানগঞ্জ রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন। দুটি শিশু এসে তাঁদের কাছে টাকা চায়। আশিষের খারাপ লাগে, এই এতটুকু বয়স! এখন তো তাদের বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময়। অথচ তারা হাত পাতছে! আশিষ জানতে চান, ‘তোমরা স্কুলে যেতে পার না? লেখাপড়া করতে ইচ্ছা করে না?’

শিশুরা বলল, ‘আমরা স্কুলে যেতে চাই। কিন্তু বই, খাতা কোথায় পাব?’

তারপর থেকে বাচ্চু আর আশিষ ভাবতে লাগলেন। আরো বন্ধুদের সঙ্গে ভাবনা বিনিময় করলেন। সবাই একমত হলেন, শিশুদের পড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

আগে তো অন্ন-বস্ত্র

বস্তিতে গিয়ে জানলেন প্রতিটি পরিবারেরই কম করেও একটা শিশু ভিক্ষা করে। তাদের পোশাক আর খাওয়ার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। পরিবারও চায় তারা রোজগার করুক। আশিষরা মা-বাবাকে গিয়ে বোঝালেন। কিন্তু তারা সাড়া দিল না। এরপর মোয়াজ্জেম হোসেন একটু ভিন্ন চিন্তা করলেন। বললেন, আগে তাদের অন্ন আর বস্ত্রের ব্যবস্থা করা দরকার। অন্যরাও বিষয়টিতে সহমত হলো। বস্তিতে গিয়ে শিশুদের নতুন কাপড় দিল। ঈদে বস্তির প্রায় ৪০টি পরিবারে সেমাই, চিনি আর দুধ দিল। প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হলো। একপর্যায়ে বস্তির নূর ইসলাম এগিয়ে এলেন। তিনি মুরব্বি মানুষ। তাঁর কথা অন্যরা ফেলতে পারে না। বস্তিবাসী বলল, ‘পড়াব কিন্তু স্কুলে পাঠাব না।’ আশিষরা তাই বস্তিরই একটা ফাঁকা জায়গায় পড়ানো শুরু করলেন। এভাবেই শুরু।

 

সপ্তাহে চার দিন

শুক্র থেকে সোম, মোট চার দিন, বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ক্লাস হয়। বাংলা, ইংরেজি আর গণিত শেখানো হয়। প্রত্যেককে বই, খাতা, কলম, পেনসিল, চক, স্লেট আর ব্যাগ কিনে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিলেবাস ধরেই পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার্থী মোট ৪৮ জন। বিকেল ৪টা বাজার আগেই কাগজ বা ছালার চট নিয়ে সবাই চলে আসে। শিক্ষক এলে তারা সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর জাতীয় সংগীত গায়। উপস্থিতি খাতাও আছে। ছাত্ররা নিয়মমতো হোমওয়ার্ক করে। স্কুলটির একটি নামও দেওয়া হয়েছে—ছায়াপথ শিশু বিদ্যানিকেতন। ছাত্রদের কেউ এখন আর ভিক্ষা করে না।

টাকা জোগাড় হচ্ছে কিভাবে? জানতে চাইলে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমরাই টাকার ব্যবস্থা করি। যার যেমন সামর্থ্য তেমন দেয়। এখানে আসলে মন-মানসিকতাই বড় কথা।’

বিন ইয়ামিন বললেন, সমাজের সবাই যদি এই পথশিশুদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তাদের কী হবে? তারা তো অন্ধকার জগতে চলে যাবে। আমরা তাদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে চাই। পড়াশোনায় তারা কিন্তু খারাপ নয়। তাদের পরিবারও এখন বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছে। উদ্যোগ ছিল না বলে হচ্ছিল না।     ছবি : লেখক

ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকরা


মন্তব্য