kalerkantho


আরো জীবন

নিখিল চন্দ্র খবরওয়ালা

৩১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নিখিল চন্দ্র খবরওয়ালা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিখিল চন্দ্র লৌদের প্রায় চার দশক হতে চলল। খবর ফেরি করে ফিরছেন। দেখা পেয়েছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

ভোর সাড়ে ৪টার মধ্যেই ঘুম ভাঙে তাঁর। এরপর চানখাঁরপুল থেকে সাইকেলে চেপে যান মতিঝিল। পত্রিকা বুঝে নিয়ে চলে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। অক্টোবর স্মৃতি ভবনের নিচে তাঁর জন্য অপেক্ষা করেন গণেশ, লিটন, মানিক ও ইউনুস। তাদের পত্রিকা বুঝিয়ে দিলে তারা চলে যায় হলের ভেতর বিলি করতে। রোদ বা বৃষ্টিতে হেরফের হয় না রুটিন। ক্যাম্পাসের ছাত্র, শিক্ষক সবারই তিনি নিখিল দা।

 

বাড়িতে মন বসত না

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের মানুষ নিখিল। ১৯৭৭ সালে পড়তেন ষষ্ঠ শ্রেণিতে। তবে ক্লাসে ৎাকে কমই পাওয়া যেত। একদিন বন্ধুরা মিলে বাড়ি থেকে পালিয়েও গিয়েছিলেন, সুদূর সিলেটে। পরে চেনাজানা একজন তাঁদের আবার ফেরত পাঠান। কিন্তু বাড়িতে তাঁর মন বসছিল না। আবারও পালালেন। এবার এলেন রাজধানীতে। ঘুরতে ঘুরতে বঙ্গবাজারের কাছের রেলওয়ে হাসপাতালের ক্যান্টিনে হাজির। চাঁদপুরেরই একজন সে ক্যান্টিন চালাতেন। তাঁকে গিয়ে বললেন, একটি কাজ দেন। তিনি নিখিলকে নিয়ে গেলেন জগন্নাথ হলে সুদীপের ক্যান্টিনে। ১৫ টাকা বেতনে গ্লাসবয়ের কাজ। প্রায় বছরখানেক নিখিল ছিলেন সেখানে। তারপর হলেরই এক ছাত্রের মারফত পিয়নের কাজ পেলেন মতিঝিলের একটি অফিসে। বেতন ২৫০ টাকা। কিছুদিন পরে সেই অফিসের আরেক লোক বললেন, তুমি সকালে পেপার বিলি করতে পারবে? নিখিল পারলেন। সেখান থেকে পেতেন ৭০ টাকা। তারপর হঠাৎই একদিন বদলির আদেশ এলো। চট্টগ্রাম যেতে হবে। নিখিল রাজি হলেন না। চাকরি ছেড়ে দিলেন।

 

আবার চাকরি ছাড়লেন

এরপর উত্তরা ব্যাংকের মানিকগঞ্জ শাখায় চাকরি মিলল। এবার তিনি দারোয়ান। মাসিক বেতন ২৫০ টাকা। বছরখানেক পর সেটাও ছাড়লেন নিখিল। ফিরে এলেন জগন্নাথ হলে। দুপুর আর রাতে ডাইনিংয়ে ছাত্রদের খাবার দিতেন। আর সকালে পেপার বিলি করতেন। নিখিল যার থেকে কাগজ আনতেন সেই হকার একদিন বলল, ‘ব্যবসা ছাইড়া দ্যাশে চইলা যামু। তুমি আমার সাইটটা নিয়ে নিতে পার।’ নিখিল ২০ হাজার টাকা দিয়ে সাইটটি কিনেছিলেন। ধারদেনা করে জোগাড় করেছিলেন সেই টাকা। এরপর থেকে সূর্যসেন হল, মুহসীন হল, কবি জসীমউদ্দীন হল, জগন্নাথ হল এবং ঈশা খাঁ রোডে পেপার বিলি করতে লাগলেন। নিখিল বললেন, ‘তখন ইত্তেফাক আর সংবাদ বেশি চলত। একেকদিন হাজার কপি বিলি করতাম। এখন কিন্তু পেপার আনা লাগে হকার্স সমিতির মাধ্যমে। আগে মানুষ পেপারের জন্য অপেক্ষা করত। পেপার তখন পড়ার জিনিস ছিল, এখন হইছে দেখার জিনিস।’ নিখিলের বয়স এখন ৬০ ছুঁই ছুঁই। এই বয়সেও সেই আগের দিনের মতোই যান মতিঝিল। পত্রিকা নিয়ে হলে আসতে আসতে ৭টা বাজে। বিলি করতে করতে ৯টা। এরপর বাসায় গিয়ে নাশতা সারেন। মাসের প্রথম দিকে ব্যস্ততা বেশি থাকে। পেপার বিল তোলারও সময় সেটা। এখন তাঁর সহকারী আছেন চারজন।

 

তখন ছিল মারামারির দিন

এরশাদের আমলে ক্যাম্পাস বন্ধই থাকত বেশি। ছয় মাসও ক্লাস হতো না বছরে। নব্বইয়ের দশকটাও তেমনই গেছে। সে সময় রাজনীতিতে ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড চালু হয়েছিল। যেমন ধরেন গোপালগঞ্জ হলো ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড, বরিশাল সেকেন্ড আর অন্যান্য ডিস্ট্রিক্ট থার্ড ওয়ার্ল্ড। ২০০১ থেকে পরিস্থিতি কিছু ভালো। এখনো পরিস্থিতি খুব ভালো।

 

সেই ভয়াল রাতের কথা

সেটা ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর। বিটিভিতে শুকতারা নাটকের শেষ পর্ব ছিল সেদিন। টিভি রুমের কাছেই তপন নামে এক ছাত্রের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নিখিলের। তপন বললেন, নিখিল দা চলেন। নাটক দেখি। ‘আপনে যান। আমি ভাত খেয়ে আসতেছি।’ বলে নিখিল খেতে গেলেন।

ভাত খাচ্ছেন এমন সময় বিকট শব্দ। এক ছাত্র চিৎকার দিয়ে উঠল, অ্যাসেম্বলি ভেঙে পড়ছে। দৌড়ে গেলেন নিখিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছু দেখা যাচ্ছিল না। খালি কান্না আর চিৎকার। সেই তপনকেই প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন নিখিল। কিন্তু মৃত। আরো অনেককে বের করেছিলেন নিখিল। ক্যান্টিনে লাশ, শহীদ মিনারেও কিছু রাখা হয়েছিল। আহত ছাত্রদের আর্তচিৎকারে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালও কেঁদে উঠেছিল। 

 

ওরা ভালো থাকুক

১৯৯৬ সালে বিয়ে করেছেন নিখিল দা। দুই মেয়ে। বড় মেয়েটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগের ছাত্রী। ছোটটি অগ্রণী স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। এখন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চানখাঁরপুলে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। বললেন, ‘বড়লোক বা কোটিপতি হওয়ার চিন্তা করি না। মেয়েদের নিয়েই স্বপ্ন দেখি। ওরা ভালো থাকলে শান্তি।’

 

ছবি : নিলয় দেবনাথ

 



মন্তব্য