kalerkantho


লাহোর থেকে যুদ্ধে

২৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



লাহোর থেকে যুদ্ধে

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করছেন

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক ছিলেন হেলাল উদ্দিনের বাবা। বড় হয়ে নিজেও নাম লেখান সেনাবাহিনীতে। পাকিস্তানের শিয়ালকোট ক্যান্টনমেন্টেও ছিলেন কিছুদিন। একাত্তরে ছিলেন লাহোরে। যশোরের পুরাতন কসবায় গিয়ে দেখা করে এসেছেন ফখরে আলম

 

১৯৬৮ সালের ১০ মে। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হন হেলাল উদ্দিন। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ছয় মাস ট্রেনিং শেষে বদলি হন রংপুর ক্যান্টনমেন্টে। ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে তাঁকে বদলি করা হয় পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে। নৌপথে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর পাড়ি দিয়ে করাচি পৌঁছতে লেগেছিল আট দিন।

 

হেলাল উদ্দিন বলেন

সত্তরের নির্বাচনের পর কী ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না। বিবিসির খরব থেকে জানতে পেরেছিলাম, একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝিতে মেজর মঞ্জুর শিকারে যাওয়ার ছুতায় বর্ডার পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছেন। পরে আগস্টে তিনি আট নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। তিনি বর্ডার পাড়ি দেওয়ার পর আমাদের ওপর নজরদারি বেড়ে যায়। জুনের শেষের দিকে আমাদের (পঞ্চম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) পাঞ্জাবেরই খারিয়া ক্যান্টনমেন্টে বদলি করা হয়। আমাদের প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রতিদিনই লাশ আসত হেলিকপ্টারে। জানতে পারছিলাম, এগুলো বাংলাদেশ আক্রমণকারী পাকিস্তানি সেনাদের। সেপ্টেম্বরে আবার আমাদের লাহোরে ট্রেনিংয়ে পাঠাল। এর কিছুদিন পর শহর থেকে ১০ মাইল দূরে বিআরবি ড্যাম ডিফেন্স করার জন্য পাঠানো হলো। আমরা বুঝতে পারছিলাম এখান থেকে ভারত বেশি দূরে নয়। ড্যাম পাহারায় আমাদের বেশ অনেক দিন রাখা হয়েছিল।

 

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পরিচয়পত্র হাতে

লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতাম

রেডিওতে বিবিসি ও আকাশবাণীর খবর শুনতাম লুকিয়ে লুকিয়ে। আমার একটি অ্যান্টেনা ভাঙা রেডিও ছিল। রাইফেলের বেয়নেট ভাঙা অংশের সঙ্গে টাচ করিয়ে রাখলে শব্দ পাওয়া যেত। বাংকারে ঢুকে ভলিউম কমিয়ে দিয়ে শুনতাম। এক সন্ধ্যায় জরুরি নির্দেশ, পাঁচ মিনিটের মধ্যে মুভ করতে হবে। চলতে চলতে তিন মাইল পাড়ি দিয়ে ফেলেছি। প্লাটুন কমান্ডার হাবিলদার মোজাফফর ওস্তাদের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। বিশ্রামের সময় আমাকে ডেকে বললেন, হেলাল পানির বোতলটি খুলে দেন। অবস্থা সুবিধের মনে হচ্ছে না। পবিত্র হয়ে নিই। যাহোক বিশ্রাম শেষ হলে আবার অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে রাভি নদী (ভারত অংশে এ নদীটার নাম ইরাবতী) পার হলাম। কিছুক্ষণ পরই শেল পড়া শুরু হলো।

 

যুদ্ধের ভেতর যুদ্ধ

কম্পানি কমান্ডার সাদেকুর রহমান চৌধুরী নির্দেশ দিলেন, যার যার ম্যাগাজিনে গুলি ভরে নিতে আর একে অপরের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে। একটি জঙ্গল আড়াল করে আমরা পজিশন নিই। জঙ্গল পার হওয়ার পরে কিছুদূরে দেখি একটি আমবাগান। এর মধ্যে ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু হলো। ওই আমবাগান থেকেই হচ্ছিল। মোজাফফর ওস্তাদের বুকে গুলি এসে লাগল। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই লুটিয়ে পড়লেন। এদিকে আমরাও গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে গেলাম। তখন আমরা ভারতের সাত মাইল ভেতরে ঢুকে পড়েছি। মাইলতিনেক দূরেই অমৃতসর। কারখানার ধোঁয়াও দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি ও সহযোদ্ধা বদর দ্রুতই আখক্ষেতের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। এক মাইলের মতো যাওয়ার পর একটি গ্রাম পেলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি নাজিমও সঙ্গে এসেছে। সন্ধ্যা লাগতে লাগতে প্রায় ৪৫ জন সৈন্য আমাদের সঙ্গী হয়ে গেল। তারপর আরো অনেকজন। একজন বৃদ্ধ শিখকে পেয়ে অনুরোধ করি তাঁদের সেনাবাহিনীর কাছে আমাদের নিয়ে যেতে। প্রায় এক মাইল হেঁটে তাঁদের সাক্ষাৎ পেলাম। অস্ত্রগুলো জমা দিলাম। আমরা জানতাম, ভারত সরকার আমাদের, মানে বাঙালিদের সহায়তা দিচ্ছে। তাই ভয় পাইনি। ইন্ডিয়ান আর্মি আমাদের সঙ্গে খুবই ভালো ব্যবহার করল। আশ্বাস দিল, সত্বর আমাদের জেনারেল ওসমানীর কাছে কলকাতা পাঠিয়ে দেবে। বিরাট একটি মাটির ঘর দেখিয়ে আমাদের রেস্ট নিতে বলল। 

 

হাতের কালো ব্যাগটিতে হেলাল উদ্দিন রাখেন মুক্তিযুদ্ধের স্মারক

 

তারপর ভোর হলো

আমাদের সবাইকে একটি আমবাগানে নিয়ে জড়ো করল ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। বড় বড় দুটি পুরি আর চা খেতে দেওয়া হলো। আমি খেয়েছিলাম ১৫টি পুরি আর দুই মগ চা। কারণ আগের তিন দিন আমি বলতে গেলে কিছুই খাইনি। চা, পুরি শেষ হলে সেনাবাহিনীর গাড়িতে চড়িয়ে আমাদের জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হলো। সবার নাম লেখা হলো। পরের দিন সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আমরা কলকাতা রওনা হই। হাওড়া পৌঁছানোর পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সদর দপ্তরে। সেখানে জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী, শেখ কামাল ও আরো কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। ওসমানী সাহেব আমাদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। আমরাও কেঁদে ফেললাম। তারপর ক্যাম্প থেকে আমাদের জন্য লুঙ্গি, জামা, স্যান্ডেল, সাবান ইত্যাদি বরাদ্দ করা হলো। পরের দিন ১০০ রুপি বেতন নির্ধারণ করে কল্যাণী পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কল্যাণী থেকে অস্ত্র ও একটি কম্বল নিয়ে বেনাপোল হয়ে যশোর পৌঁছাই। সেটা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। বেজপাড়া আনসার ক্যাম্পে অবস্থান নেই। যশোরে কয়েকটি শত্রু এলাকা তল্লাশি করি। এর মধ্যে নির্দেশ আসে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী যাওয়ার। তখনো কাশিয়ানীতে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেনি। সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই কাশিয়ানীতে। কাশিয়ানী শত্রুমুক্ত হয় ১৯ ডিসেম্বর।                                                 ছবি : ফিরোজ গাজী

 



মন্তব্য