kalerkantho


পুঁথিযোদ্ধা

২৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পুঁথিযোদ্ধা

বই বিক্রি করেই দিন চালান রিয়াজুল হক

একাত্তরে রৌমারীর রিয়াজুল হকের বয়স ছিল ১৮ বছর। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহ করা বা শত্রুপক্ষের গতিবিধি জানানোর কাজ করতেন রিয়াজুল। নদীও পার করে দিতেন। আরো যেটা করতেন তা হলো পুঁথি পড়ে শোনানো। কুদ্দুস বিশ্বাস শুনেছেন আরো অনেক গল্প

 

সে রাতে খুব বৃষ্টি। আমরা ছিলাম তিনতলি চরে। প্রায়

দেড় শ মুক্তিযোদ্ধা। বৃষ্টির কারণে কেউ বাইরে যেতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ খন্দকার আমাকে ডেকে বললেন, ‘এই রিয়াজুল, বৃষ্টিতে তো বাইরে যেতে পারছি না। তুই পুঁথি পাঠ শুরু কর।’ এই কথা শুনে আর যাঁরা ছিলেন তাঁরাও কাছে এলেন। আমাকে ঘিরে ধরলেন। আমি পুঁথি পাঠ করছি, অন্যরাও আমার সুরে সুর মেলালেন। প্রায় সময়ই রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের নদী পার করে দিতাম। তাঁদের যেন ঘুম না পায় সে জন্য গল্প করতাম। একরাতে যেমন আমরা সবাই নৌকায়। হঠাৎই এলোপাতাড়ি গুলি আসতে লাগল। তখন নৌকা কিনারে ভিড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আমিও গুলি মারা শুরু করলাম। সারা রাত এই যুদ্ধ চলল। পাকিস্তানি বাহিনী তিনতলির পশ্চিম চর থেকে পিছু হটে চিলমারীর রমনায় ফিরে গেছে। রৌমারী সিজি জামান হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছিল। আমি ওইখানে প্রশিক্ষণ নিছি। তারপর টাপুরচর হাই স্কুলে ক্যাম্প ছিল। আমি সেখানেও মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার পৌঁছে দিছি।

তিনতলি চর

 

এবার বলি ছালিপাড়া চরের গল্প

তিনতলি চরে কিছুদিন থাকার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র নদের আরেক দ্বীপচর ছালিপাড়ায় চলে যাই। ওইখানে এক মাস ছিলাম। গল্প বলে আর পুঁথি শুনিয়ে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রিয়পাত্র হয়ে যাই। এক সন্ধ্যা রাতে ঝড়ের মাঝে আমাদের নৌকা উল্টে যায়। আমরা সাঁতয়ে পাড়ে উঠি। সবারই জামা-কাপড় ভেজা। মুক্তিযোদ্ধা কছিবর রহমান বলে উঠলেন, ‘রিয়াজ ভাই, আজ গান শোনাতে হবে আমাদের।’ গান কিন্তু আমার বেশি জানা ছিল না। কিন্তু সবাই মিলে ধরল। আমি গাইলাম। গান ওই এক দিনই গাইছিলাম। গ্রামের মানুষও তখন পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে ক্যাম্পে এসে থাকত। আমার কাজ ছিল রাতভর গল্প শোনানো। এর মধ্যে একবার পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের জায়গার খবর পেয়ে যায়। পুঁথি পড়ে শোনাচ্ছিলাম সে রাতে। শুনলাম পাকিস্তানি বাহিনী গানবোট নিয়ে রওনা হইছে। আমরাও খবর পাওয়ামাত্র যার যার অস্ত্র হাতে তুলে নিই। খবর পাঠাই আশপাশের ক্যাম্পে। প্রায় আড়াই শ মুক্তিযোদ্ধা ব্রহ্মপুত্রের পারে অবস্থান নিয়েছিলেন। খুব সকালে যখন শত্রুর গানবোট দেখা গেল, তিন দিক থেকে গুলি চালালাম আমরা। তিনটি গানবোট নিয়ে আসছিল প্রায় ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা। ওদের বেশির ভাগই মারা পড়ে। তবে এরপর আর ছালিপাড়া চরে আমরা নিরাপদ বোধ করলাম না। পাশের কোদালকাটি চলে যাই। আরো মুক্তিযোদ্ধা এখানে আগে থেকেই ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বদিউজ্জামান, আব্দুল মজিদ, আবুল হোসেন আর আব্দুল লতিফকে আমি আগে থেকেই চিনতাম। কোদালকাটি কিছুদিন থাকার পর ফিরি সিজি জামান স্কুলে। শুনলাম সুবেদার আবতাফ আলী (বীর বিক্রম) আমার পুঁথিপাঠের খবর পেয়ে গেছেন। তিনি আমাকে নিতে লোক পাঠিয়েছেন।

 

আবতাফ বাহিনীর সঙ্গে

সুবেদার আবতাফ আলীর একটি নিজস্ব বাহিনী ছিল। তিনি পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প থেকে অস্ত্র, গোলা-বারুদ নিয়ে পালিয়ে এসে নিজেই একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন। তাঁর এ বাহিনীর সদস্যরা কোদালকাটি, শংকর মাদবপুর, ধলাকাছা ও সন্ন্যাসীকান্দি চরে আগাতে দেয়নি পাকিস্তানি বাহিনীকে। আমি তাঁর ওই চারটি ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে সময় দিতে লাগলাম। আমার কাজ তো মুক্তিযোদ্ধাদের আনন্দ দেওয়া, তাঁদের মনোবল শক্ত করা। ধলাকাছা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের পাশেই আমাদের বাংকার ছিল। অনেক সময় রাতেও বাংকারে থেকেছি। চরের আব্দুর রহিমের বাড়ির রান্নাঘরেও ঘুমিয়েছি। মাটিতে খড় বিছিয়ে থাকতাম। মুক্তিযোদ্ধা আবু আসাদ এক রাতে ধরেছিলেন, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...।’ আমরা সবাই কেঁদে ফেলেছিলাম। ওই রাতে আর পুঁথি পাঠ হয়নি। একসময় খবর এলো পাকিস্তানি বাহিনী কাছাকাছি চলে এসেছে। ওই রাতে সব যোদ্ধা রাইফেল আর গ্রেনেড নিয়ে বাংকারে চলে যাই। বৃষ্টির মতো গুলি চলে কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীকে ঠেকানো যায়নি। আমরা পিছু হটলাম। পরে রৌমারী থেকে এক শর মতো মুক্তিযোদ্ধা আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। কিন্তু ততক্ষণে পাকিস্তানি বাহিনী শংকর মাদবপুর গ্রামে ঢুকে গণহত্যা শুরু করে। একপর্যায়ে সুবেদার সাহেবের নেতৃত্বে প্রায় ২০০ মুক্তিযোদ্ধা তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেন পাকিস্তানিদের। তিন দিন যুদ্ধ চলেছিল। নাওয়া-খাওয়া সব বন্ধ। শেষে পাকিস্তানিরা পিছু হটেছিল। তারপর আমার ডাক পড়েছিল। সুবেদার সাহেব সবার সঙ্গে বসে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘রিয়াজুল, তোমার পুঁথি পাঠ আমি শুনব।’ প্রায় দুই ঘণ্টা বসে থেকে তিনি তা শোনেন।

 

আদর ছিল সন্ন্যাসীকান্দি চরেও

সবাই আমার গল্পগুজবে আনন্দ পেত। সন্ন্যাসীকান্দি ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারাও আমাকে ছাড়তে চাইতেন না। সময় পেলেই তাঁরা আমাকে ঘিরে ধরতেন। একদিন আমার দেখাদেখি আরেকজন পুঁথি পাঠ শুরু করেন। তবে আমার মতো বলতে না পারায় অন্যরা হাসাহাসি শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারী আর আব্দুল হামিদ শুধু দেশের গান শুনতে চাইতেন। কিন্তু আমি তো ভালো গান গাইতে পারতাম না। যাহোক কিছুদিন পর তো দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছু দিন গ্রামে পুঁথি পাঠের আসর বসাইছিলাম। পরে সে রকম আর পারিনি। পরে ফেরি করে বই বিক্রি শুরু করি।

 

আমি এখন জ্ঞান ফেরি করি

বই পড়লে হিংসা-বিদ্বেষ কমে যায়। ৪০ বছর ধরে বই বিক্রি করছি। খুব বেশি রোজগার হয় না, কিন্তু আনন্দ হয়। বাজার, বাসস্ট্যান্ড, মেলা, রেলস্টেশনে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করি। মফস্বল এলাকায় মানুষ দোকান থেকে বেশি বই কেনে না। কিন্তু হাতের কাছে পেলে ‘এই একটা দেখি তো’। তবে তাও আগের মতো নাই। শিশু-কিশোরদের ছড়া, কবিতা, গল্পের বই আমার কাছে পাবেন। উপন্যাস আর ধর্মীয় বইও আছে। আগে আগে দূরে গেছি। এখন বই কাঁধে ঘুরতে কষ্ট হয়।

 

একজন রিয়াজুল হক

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার টালুয়ারচর গ্রামে রিয়াজুল হকের বাড়ি। চার ছেলে-মেয়ে তাঁর। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। জমিজমা বলতে শুধু বাড়ির ভিটা। স্ত্রী জরিনা খাতুন দীর্ঘদিন থেকে প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে রিয়াজুল হকের একাধিক অপারেশনে অংশ নেওয়ার কথা আবতাফ আলী স্বাক্ষরিত সনদপত্রে পাওয়া যায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাঁর নাম নেই।

                                                          ছবি: লেখক

 পুঁথিযোদ্ধা রিয়াজুল হক



মন্তব্য