kalerkantho


ইমাম উদ্দিন মুক্তিবাহিনী

২৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ইমাম উদ্দিন মুক্তিবাহিনী

ইমাম উদ্দিনকে আদর করে কমান্ডার ডাকত গণ্ডার

রিকশা চালিয়ে জীবন চালিয়েছেন। কিন্তু মনে কষ্ট রাখেননি ইমাম উদ্দিন। যুদ্ধ যে দেশের জন্য করেছেন! শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন আলম ফরাজী

ময়মনসিংহের একটি উপজেলা ঈশ্বরগঞ্জ। উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে রাজীবপুর ইউনিয়নের উজানচর। কয়েকজন সবজি বিক্রেতার সঙ্গে দেখা হলো। মাসুম নামের একজন বললেন, ‘হেই রিকশাওয়ালা মুক্তিবাহিনী? হেইল্যার বাড়ি তো ওই বাঁশঝাড়টার কাছে।’ আরেকটু এগোনোর পর দেখা হলো আবুল হাসেম নামের এক বৃদ্ধের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘মুক্তি বাহিনী (মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উদ্দিন) বাড়িত নাই, তয় একটু বইন (বসুন), অহনই আইয়া পড়ব। হেইল্যার বউ বাড়িত আছে।’

এখনো কোনো কোনো দিন রিকশা চালান

 

ইমাম উদ্দিনের সংসার

ইমাম উদ্দিনের স্ত্রীর নাম আছিয়া বেগম। ইমাম উদ্দিনের দুই ছেলে অটোরিকশা চালায়, একজন ঢাকায় রড মিস্ত্রির কাজ করে, আরেকজন গার্মেন্টে। আছিয়া বেগম চেয়ার এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘দেখখাইন এই ঘরটার মধ্যে (টিনের দোচালা) ৮-৯ জন থাহি। আতো দিন বাপের বাড়িত একটা ছনের ঘরো আছলাম। চার বছর আগে এক অফিস (এনজিও) থাইক্যা ঋণ লইয়া ৭৫ হাজার টেহা দিয়া চার শতক জমি কিনছি। আর এর মধ্যে এই ঘর বাইন্দা থাকতাছি।’ ইমাম উদ্দিন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি একটু হেসে ফেলেন। বলেন, ‘হেইলা আমার ফুফাতো ভাই লাগে। মা-বাবা হেইলারে খুব পছন্দ করত। এর লাইগ্যা বিয়া অইছে। কিন্তু এই বিয়ার অনেক কাহিনি আছে। হেই দিন আছিন বিষ্যুদবার। গোসল করার পর হাতে মেন্দি (মেহেদি) দিয়া অপেক্ষা করতাছিলাম নতুন কাপড় পড়বাম। এই সময় হেইলা (হবু স্বামী ইমাম) উধাও অইয়া গেছিন।’ এর মধ্যে ইমাম উদ্দিন আসেন। তিনি কথা টেনে নিয়ে বলেন, ‘আমি তহন বিয়া করতে রাজি আছিলাম না। কারণ চাইরমুখ দিয়া পাকিস্তানিরা এলাকায় ঢুকতাছে। ঘরবাড়ি জ্বালাইতাছে, মানুষ মারতাছে। এই নিয়াই চিন্তায় আছিলাম। আমার খালি চিন্তা যুদ্ধে যাইয়াম। তাই বিয়ার দিন হঠাৎ একটা ভাব ধরলাম। আলগা রাগ দেখাইয়া বিয়ার আসর থাইকা বাইর হইয়া চইলা গেলাম ইন্ডিয়ার বাঘমারায়। ওইখানে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল। আমার বয়স তখন চল্লিশের বেশি।’

ইমাম উদ্দিনের বাড়ি

 

যুদ্ধের দিনগুলো

ট্রেনিং নিয়েছেন ২৫ দিন। তারপর তাঁকে কাজী আলম কম্পানির অধীনে দেশের ভেতরে যুদ্ধে পাঠানো হয়। কম্পানিতে ছিল ১৮৭ জন যোদ্ধা। ইমাম উদ্দিনের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন হাবিবুর রহমান হলুদ। যুদ্ধ শুরু মদনপুর দিয়ে। তিনি মদনপুর, ধরমপাশা, গোবিন্দশ্রী, ঈশ্বরগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, তাড়াইল ও কেন্দুয়ার সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কিশোরগঞ্জে যুদ্ধের সময় গুলিবিদ্ধ হন। চিকিৎসা নিয়ে ফের যান মহেশখলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। আড়াই মাস সেখানে থেকে আবার আসেন নেত্রকোনার মদনে। সেখানে সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের ঘায়েল করে সিলেট রওনা হন। ধরমপাশা থানায় গিয়ে অবস্থান নেন। পরদিন সন্ধ্যা নাগাদ পাকিস্তানি সেনারা ধেয়ে আসে। ‘আমি  বেরাশ (ব্রাশ) ফায়ার শুরু করি। তহন পাকসেনারা মাডিতে লুডাইয়া পড়ে। পরে গাঙ পার হইয়া লগের একটি বাড়িতে গিয়া আমরা আশ্রয় নিই। তহন জানতাম পারি, ওই গাঙেই (গোবিন্দশ্রী ধেনু নদী) পাকসেনারা পাহারা দিতাছে। একটা মাটির কলসি লইয়া পলাইয়া গাঙে নামি। মাইঝে-মাইঝে মাতাডা একটু ভাসাইয়া উহি (উঁকি) দিয়া দেখতাম। আমার আতো (হাতে) থাকা এলএমজি দিয়া ২৫ পাক সেনারে এক্করে খতম করি। ডরাইয়া পাকসেনারা লঞ্চ দিয়া পলাইয়া যায় গা। এরপর আমরার লগের মুক্তিযোদ্ধারারে লইয়া মহেশখলা ক্যাম্পে যাই। ’

মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উদ্দিন বলেন, ‘এরা (পাকিস্তানি বাহিনী) আমরার দেশে ঢুকছে এই জিদে, হেরারে দেহামাত্রই মাথা গরম হইয়া যাইত। খতম না করলে ভালা লাগত না। এর লাইগ্যা ক্যাম্পে থাকতেই কমান্ডাররা আমারে ‘গণ্ডার’ কইয়া ডাকত। কারণ এরারে দেখলে আমার হুঁশ থাকত না। নিজের শইলো (শরীরে) কয়ডা গুলি লাগল হেইডা কুনো বুঝতাম পারতাম না। খালি চিন্তা করতাম আমার দ্যাশটারে কিবায় বাচাইয়াম।’

 

যুদ্ধ থেকে ফেরার পর

আছিয়াকেই বিয়ে করেন যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে। কিন্তু সহায়সম্বল তো কিছুই নেই। এই অবস্থায় রিকশা চালাতে শুরু করেন। চার ছেলে ও এক মেয়ে হয়। অভাবের সংসার। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বেশিদূর করাতে পারেননি। রিকশা চালিয়েছেন ৩৫ বছর। এখন বয়সের কারণে কোনো দিন চালান, কোনো দিন চালান না। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। তাতে চলে যাচ্ছে একরকম।                          

ছবি: লেখক


মন্তব্য