kalerkantho


ভিনদেশির বঙ্গদর্শন

ভিতাসের ১০১

বাংলাদেশ ভিতাসের ১০১ নম্বর দেশ। এর আগে লিথুয়ানিয়ার ছেলেটির ১০০টি দেশ ঘোরা হয়ে গেছে। ঢাকা বেড়ানোয় তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন সরফরাজ খান

১০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ভিতাসের ১০১

জানুয়ারির শেষ ছিল। শীত ছিল মৃদু। বকশীবাজার থেকে কিছু ডানে হোসেনি দালান। সকাল সাড়ে ৮টায় আমি হাজিরা দিলাম। ভিতাস এলেন চার মিনিট পরে। হ্যান্ডশেক করার পর জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর পুরো নাম ভিতাওতাস পেট্রোনিস। জন্ম লিথুয়ানিয়ায়। সহজ করে ভিতাস ডাকি আমরা।

 

ভিতাস অবাক হলেন

শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে আমরা দালানের ভেতর ঢুকে পড়লাম। ১৬৪২ সালের স্থাপনা হোসেনি দালান। ১৮ শতকের শেষ দিকে টর্নেডোর আঘাতে এর উপরিভাগ ধসে যায়। নওয়াব আহসানউল্লা পরে সংস্কার করেন। দালান ঘোরা শেষ করে ধরলাম বড়কাটারার পথ। মাঝখানে পড়ল কেন্দ্রীয় কারাগার। পুরান কেল্লা নামে এর পরিচয়। কারাগার হওয়ার অনেক আগে থেকেই এটিকে আফগানরা প্রশাসনিক কেল্লা হিসেবে ব্যবহার করত। পুরনো কারাগারের পাশ দিয়ে আমরা গেলাম চকবাজার। প্রথমেই দেখলাম শাহি মসজিদ। ১৬৪০ সালের দিকে শায়েস্তা খাঁ এটি নির্মাণ করেন। শায়েস্তা খাঁর গল্প আমাদের জানা। তাঁর আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। ভিতাসকে গল্পটি বলতে তিনি বেশ অবাক হলেন। জানতে চাইলেন, এ-ও কি সম্ভব? তাঁকে বিশ্বাস করাতে একটু বেগ পেতে হলো। যা হোক বড়কাটারা দেখতে দেখতে ভেতরবাড়ি দিয়েই ছোটকাটারার দিকে গেলাম। বড়কাটারার চেয়ে এটি ছোট। চার কোণার এই স্থাপনা তৈরি হয় ১৬৬৪ সালে। তখনো শায়েস্তা খাঁর শাসন ছিল বাংলায়। ছোটকাটারা তৈরি শেষ হওয়ার আগেই মারা যান চম্পা বিবি। কেউ বলেন চম্পা ছিলেন শায়েস্তা খাঁর কন্যা। কেউ বলেন দাসী। ছোটকাটারায় তাঁর কবর রয়েছে। এরপর চললাম আরমানীটোলায়।

 

আজান শুনতে ভালোবাসি

সূর্য তখন মাথায় চড়তে বসেছে। পুরান ঢাকা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। সলিমুল্লাহ হাসপাতাল ঘেঁষে বাঁ দিকে কিছু দূর গেলেই আর্মেনিয়ান গির্জা। ঢোকার মুখেই শংকর কাকাকে দেখলাম। গির্জার দেখভাল করেন শংকর কাকা। আমি এর মধ্যে পেছন ফিরে দেখি, ভিতাস নেই। তিনি যে আগেই গির্জার দরজা পেরিয়ে গেছেন বুঝতে পারিনি।  এটা-সেটা দেখছেন আর ছবি তুলছেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘ইউ নো সানি, লিথুয়ানিয়ায় আমার পাশের বাড়িতেই একজন আর্মেনীয় থাকেন। তিনি আমার খুব ভালো বন্ধু। প্রতিবছর ক্রিসমাসে কিছু না কিছু রান্না করে পাঠান। এখন যে আমি দুবাই থাকি, এখানেও তিনি উপহার পাঠাতে ভোলেন না।’ আমি শুনছিলাম মনোযোগ দিয়ে। এমন গল্প যে আমাদেরও আছে! এমন সময় মসজিদ থেকে আজান ভেসে এলো। ভিতাস সে সূত্র ধরে বললেন, আমি আজান শুনতে ভালোবাসি। দুবাইয়ে আমার বাসার কাছেই একটি সুন্দর মসজিদ আছে। জানো আমার ঘড়িতে অ্যালার্ম দিতে হয় না। আজানই আমার ওয়েক-আপ কল।’ ছেলেটি আসলেই ভালো গল্প জানেন। বলতেও ভালোবাসেন।

 

সোনারগাঁ যাওয়া যাবে আজ?

ভিতাসের আইফোনটি ছবি তুলেই চলেছে। বিরামহীন বলা যায়। ক্ষণে ক্ষণেই বলছেন ভিতাস, ‘বাহ! ওয়ান্ডারফুল, অ্যামেজিং।’ পুরান ঢাকা দেখে তিনি সত্যিই মুগ্ধ হচ্ছেন, মুখ দেখেও বোঝা যাচ্ছে। ওদিকে জুমার নামাজের সময় হয়ে এলো। ভিতাসকে একটু জিরিয়ে নিতে বলে আমি মসজিদে গেলাম। ততক্ষণে নামাজের আর বাকি নেই। ফিরে এসে ভিতাসকে দেখলাম সলিমুল্লাহ হাসপাতালের দক্ষিণ দিকের একটি দেয়ালে হেলান দিয়ে চিপস খাচ্ছেন। আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন আরেকটি প্যাকেট আর এক বোতল পেপসি। তারপর জানতে চাইলেন, সোনারগাঁ কত দূর? আজকে যেতে পারব?  আমি হ্যাঁ বলতে খুশি হয়ে গেলেন। আমরা আর দেরি না করে সিএনজিতে চড়ে বসলাম।

সেঞ্চুরিয়ান ভিতাস

লিথুয়ানিয়ায় স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে ভিতাস প্রথম যান আফ্রিকায়। তারপর যান ইউরোপে। বেড়ানোই তাঁর শখ। এখন তিনি ড্যানিশ ডেইরি কম্পানির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে দুবাইয়ে চাকরি করছেন। এ পর্যন্ত তাঁর ১০০টি দেশ ঘোরা হয়ে গেছে। গুগল ম্যাপসে দেখতে দেখতে সে গল্পই তিনি বলছিলেন, ‘আমার ইচ্ছা আরো ১০০টি দেশ ঘোরার। বাংলাদেশ এ পর্বের প্রথম দেশ। বাংলাদেশ নিয়ে আমার বেড়ানো দেশের সংখ্যা ১০১টি হলো।’ এ পর্যায়ে সিএনজি থামল এসে নদীর ঘাটে। ১৫ মিনিট নৌকায় দুলে দুলে আমরা গেলাম বৈদ্যের বাজার। সেখান থেকে অটোরিকশায় পৌঁছলাম সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরে। টিকিট কিনে ভেতরে ঢুকে আমাদের গ্রামীণ জীবনের নানা উপকরণ দেখলাম। যেমন—মাছ ধরার পলো, তরকারি রাখার ডুলা, বাতাস খাওয়ার হাতপাখা ইত্যাদি। ভিতাসকে দেখলাম একটি ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। পানামনগরে বেশিক্ষণ ঘোরার সুযোগ আমরা পেলাম না। কারণ সূর্য বেশিক্ষণ থাকবে না বলে জানান দিচ্ছিল। ভিতাস বললেন, চলো বাস ধরি।                

 

এই আমার দিকে সবাই তাকাচ্ছে কেন?

ভিতাস উঠতেই বাসের পরিবেশ মনে হয় বদলে গেল। সবাই ঘুরে ঘুরে তাঁকেই দেখছিল। ভিতাস জানতে চাইলেন, এই সবাই আমাকেই কেন দেখছে? দ্যাখো তো আমার চুল এলোমেলো হয়ে আছে কি না। আমি বললাম, ‘না, তোমার সব ঠিকই আছে। আসলে লোকাল বাসে বিদেশিরা চড়ে না তো, তাই ওরা একটু অবাক হয়েছে।’  যা হোক সন্ধ্যা লাগে লাগে সময়ে আমাদের বাস এসে দয়াগঞ্জ মোড়ে থামল। একটি রিকশা নিয়ে ফরাশগঞ্জ গেলাম। ভিতাস নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছবি তুললেন কিছু। লঞ্চগুলোয় ততক্ষণে আলো জ্বলে উঠেছে।


মন্তব্য