kalerkantho


সরেজমিন

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)

শেরেবাংলানগরে অবস্থান। নাম জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)। সবাই চেনে পঙ্গু হাসপাতাল নামে। জুবায়ের আহম্মেদ এক দিন দেখে এসেছেন

১০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

সকাল ১০টা তখন। সদর দরজা পেরিয়ে অল্প পরেই জরুরি বিভাগ। নিবন্ধন ঘর এক পাশে। দুজন লোক ধরে একটি ছেলেকে নিয়ে এলেন। ছেলেটির হাত মেশিনে ঢুকে ক্ষতবিক্ষত। নিবন্ধন বুথে গিয়ে লোকটি ছেলেটির নাম বলল আমীর হোসেন। ডাক্তার এসে তাকে বেডে শুইয়ে দিলেন। দুই-তিনজন নার্স তাঁকে সাহায্য করলেন। আমীরের মতো আরো লোক আসছে জরুরি বিভাগে। কারোর হাত ভেঙেছে তো কারোর পা। নার্স পঙ্কজ বললেন, ‘প্রতি শিফটে প্রায় ৮০-৯০ জন রোগী জরুরি বিভাগে আসে।’ কথা হলো মো. আবুল হাসানের সঙ্গে। তিনি এসেছেন ঢাকার ওয়ারী থেকে। তাঁর হাতের কবজির হাড় ভেঙে গিয়েছিল। অপারেশন করেছেন। এখন এসেছেন চেক করাতে। বললেন, ‘রিপোর্ট ভালো। আর এখানে চিকিৎসা ভালোই হয়।’

 

আর সহ্য হয় না

পুরুষ ওয়ার্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শুনলাম কয়টি কথা—‘ও কাকা! আমারে একটা বেথার ইনজেশন দিতে কন। আর সহ্য হয় না।’ ব্যথাকাতর মানুষটির নাম জানলাম মো. আব্বাস। তিনি রাজবাড়ীর মানুষ। কৃষিকাজ করেন। শনিবার রাতে মালবোঝাই ট্রাক নিয়ে আসছিলেন ঢাকায়। ভোরে ট্রাক অ্যাকসিডেন্ট করে। আব্বাস চোট পান কোমর ও দুই পায়ে। লোকেরা তাঁকে ধরাধরি করে এখানে নিয়ে আসে। পরে খবর পেয়ে গ্রাম থেকে তাঁর কাকা ও স্ত্রী এসেছেন। ইন্টার্নি নার্স শরীফ আহম্মেদ ও নাজিল মিয়াকে দেখলাম খোঁজখবর নিচ্ছেন। তাঁরা দুজনেই মিরপুর ইনস্টিটিউট অব নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী। শরীফ বললেন, ‘রোগীদের খোঁজখবর নিচ্ছি। তাদের সেবা দিতে ভালো লাগছে। এখান থেকে অনেক কিছু শিখছি।’

একটি ওয়ার্ডেই বুঝি গোটা দেশ

জরুরি বিভাগের একটি ওয়ার্ড মনে হয় গোটা দেশ! কেউ এসেছেন লালমনিরহাট থেকে, কেউ পঞ্চগড়, কেউ আবার সুনামগঞ্জ থেকে। চাঁদপুরের বাকরা গ্রাম থেকে সাইফুল ইসলাম এসেছেন তাঁর মেয়েকে নিয়ে। মেয়ের নাম সামিয়া। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বাড়িতে একটা গাছ আছে। উঠতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল। কনুইয়ের জয়েন্টে আঘাত পায়। সাইফুল বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগের ঘটনা। ওর জয়েন্টের হাড় ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছি। তিনিই এখানে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। এখন মোটামুটি সেরে উঠেছে। আশা করি দু-এক দিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরতে পারব।’ পাশের এক বেডে একজন বৃদ্ধকে শুয়ে থাকতে দেখলাম। তাঁর স্ত্রী তাঁকে কিছু খাইয়ে দিচ্ছিলেন। বৃদ্ধের পুরো হাত ব্যান্ডেজ করা।

 

সাব্বিররা আছে বলে রক্ষা 

মো. সাব্বির হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। গত শনিবার কুড়িল বিশ্বরোডে একটি অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরছিলেন। হঠাৎ দেখলেন ট্রাকের ধাক্কায় একজন রিকশাওয়ালা ছিটকে পড়েছে। সাব্বির এগিয়ে গেলেন। লোকজনের সহায়তায় রিকশাওয়ালাকে নিয়ে গেলেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। ওখানের ডাক্তাররাই পাঠিয়েছে এখানে। সাব্বিরই নিয়ে এসেছেন। ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখেছেন রিকশাওয়ালার ঘাড়ের হাড় ভেঙে গিয়েছে। সাব্বিরের আর বাসায় যাওয়া হয়নি। রবিবার দেখা হওয়ার পর বললেন, ‘রকু মিয়ার পরিবারে কেউ নেই। তার এক আত্মীয়ের ঠিকানা নিয়ে আমার এক বন্ধুকে পাঠিয়েছিলাম। তাঁরা এসেছেন। এখন ডাক্তার এলে, কথা বলে আমি চলে যাব।’

 

১০ টাকা টিকিট

ঘুরতে ঘুরতে গেলাম বহির্বিভাগে। সকাল সাড়ে ১১টা হবে। রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। বসার জায়গা নেই। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বহির্বিভাগ খোলা থাকে। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। টিকিটের মূল্য ১০ টাকা। শরীয়তপুরের আব্দুল জলিলের সঙ্গে কথা হলো এখানে। কোমরের ব্যথা নিয়ে এসেছেন। বললেন, ‘সরকারি হাসপাতাল। বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যায়। তাই এসেছি।’       



মন্তব্য