kalerkantho


অদম্য মানুষ

লালচান বামন

লালচান প্রামাণিক বামন মানুষ। কষ্টের জীবন। তবু স্বপ্ন দেখেন। ছেলেরা একদিন বড় হবে। তাই লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। ফরিদুল করিম দেখা করে এসেছেন

১০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



লালচান বামন

দুই ছেলের সঙ্গে লালচান ছবি : লেখক

একাত্তরে লালচানের বয়স ছিল এক বছর। তাঁদের বাড়ির কিছু দূরে একটি বাঁশঝাড়ের মধ্যে ছিল একটি কবরস্থান। পাকিস্তানিদের ভয়ে তাঁর মা মফিজান মাঝেমধ্যে সেখানে আশ্রয় নিতেন। লুকাতেন গিয়ে একটি পুরনো কবরে।

যুদ্ধ শেষ হলো। দুই বছর বয়স হলো লালচানের। কিন্তু শরীরটা তাঁর গুটিয়ে থাকল। তারপর একদিন স্কুলে গেলেন। শরীরটা সেই ছোটমোটোই। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেন টেনেটুনে। তারপর স্কুল ছেড়ে দিলেন। সহপাঠীরা হাসি-ঠাট্টা করত তাঁকে নিয়ে। সংসারে অভাবও ছিল। লালচানের আর পড়া হয়ে উঠল না।

 

ফিরোজা চলে গেলেন

তখন ২৭ বছর বয়স তাঁর। লছের প্রামাণিক তাঁদের পাশের বাড়ির মানুষ। তাঁরই মেয়ে ফিরোজা। সেই ফিরোজাকে বিয়ে করলেন লালচান। তখন পাকুড়িয়া শহীদ বাজারে একটি পান-বিড়ির দোকান ছিল লালচানের। চলছিল খারাপ না। কিন্তু হঠাৎই ফিরোজা দুই ছেলে আর স্বামীকে রেখে আরেকটা বিয়ে করে চলে গেলেন নতুন স্বামীর কাছে। সাত বছর হয়ে গেল সে ঘটনার।

 

মানুষটাকে নিয়ে সবার আগ্রহ

লালচান মাত্রই ৩৮ ইঞ্চি লম্বা। মানুষের আগ্রহের শেষ নেই লালচানকে নিয়ে। কত যে হাসি-ঠাট্টা-তামাশা। কিন্তু তাঁরও যে সংসার আছে, সন্তান আছে, তাঁকেও খেয়ে-পরে বাঁচতে হয়! মানুষের সেই দিকে কোনো খেয়াল নেই। এলাকার লোকের কাছে তিনি বনমানুষ। ৪৭ বছর বয়স এখন মানুষটির।

 

তবু মানুষটি স্বপ্ন দেখেন 

মানুষের কাছে চেয়ে-চিন্তে তাঁর সংসার চলে। চালান দুই সন্তানের লেখাপড়াও। বড় ছেলেটি এখন কলেজে পড়ে। নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশো ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের মানুষ লালচান। তারা মোল্লার সাত সন্তানের মধ্যে শুধু লালচানই ছোটমোটো। দুই শতক জমির ওপর একটি ভাঙা ঘর ছাড়া আর কিছুই নেই লালচানের।

 

নওহাটা বাসস্ট্যান্ডে দেখা

নওগাঁর নওহাটা মোড় (চৌমাশিয়া) বাসস্ট্যান্ডেই দিন কাটে লালচানের। বাসযাত্রীদের কাছে হাত পেতে দিন পার হয়। বলেন, ‘আমি বেঁটে বলে গেরস্তরা কাজে নেয় না। তবে সার্কাস পার্টি আমাকে জোকার বানাতে চাইছিল। কিন্তু আমি লোক হাসাতে পারি না। পাকুড়িয়া বাজারে আমার দোকান ছিল। তবে বাকি নিতে নিতে লোকেরা দোকানটাকে সর্বস্বান্ত করে ফেলল। চাইলে উল্টো ধমক দিত। তাই নামতে হলো পথে। আমি জানি ভিক্ষা করা ভালো না। আমি তো খেটেই খেতে চাইছিলাম। কিন্তু আমাকে মানুষই পথে নামিয়ে দিল। দিনে আড়াই-তিন শ টাকা ভিক্ষা পাই। এ দিয়েই খাওয়া আর পোলাপানের পড়াশোনা। ফিরোজা যাওয়ার পর আমি দিশাহারা হয়ে যাই। কিন্তু মন শক্ত করি। স্বপ্ন দেখি, লেখাপড়া শিখিয়ে সন্তানদের সরকারি চাকরিতে ঢোকাব। তখন আর হাত পাতব না। সন্তানরা দিনমজুরিতে ঢুকতে চেয়েছিল। আমি দিইনি। আমি চাই ওরা লেখাপড়া করুক। আমার বড় ছেলে ফিরোজ হোসেন, বয়স ১৮, মান্দা মোমিন শাহানা সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র আর ছোট ছেলে ফরহাদ হোসেন ক্লাস থ্রিতে পড়ে।’ 

 


মন্তব্য