kalerkantho


সরেজমিন

কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল

স্ট্রেচারে শুইয়ে বিড়ালকে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে

 ফুলবাড়িয়ার ৪৮ নম্বর কাজী আলাউদ্দিন রোড। বঙ্গবাজারের উল্টোদিকে কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতাল। আসা-যাওয়ার পথে বাইরে থেকে আগেও দেখেছেন আর গত রবিবার ভেতরটাও দেখে এসেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

দুপুর মাত্র গড়িয়েছে। ভেবেছিলাম ভিড় বেশি থাকবে না, চিকিৎসকদেরও ফ্রি পাওয়া যাবে। কিন্তু ভুল ভাঙল অল্পেই। সদর দরজার সিঁড়িঘরেও বসা দুজন। একজন একটি ছাগল ধরে রেখেছেন। অন্যজনের গালে হাত। তবে দুজনেরই কপালে চিন্তার রেখা। বললেন, ‘কেরানীগঞ্জ থেকে এসেছি। কয়েক দিন ধরে ছাগলটা কিছুই খাচ্ছে না। ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। দেখি কী হয়!’ 

তারপর নিবন্ধন রুম। দরজার কাছে মধ্য বয়সী এক নারী কোলে বিড়াল নিয়ে কাঁদছেন। কেঁদে কেঁদেই মুঠোফোনে কাউকে বলছেন, ‘তুমি আইয়া দেইখ্যা গেলা না। আমার বিড়ালটা মইরা যাইতাছে। জ্বরে গা পুইড়া যাইতাছে। তুমি আইলা না।’

ভেতর থেকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী নাম আপা?’

—সাহানা

—বাসা কই?

—বাবুবাজার।

একটি স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে দিল লোকটি। বলল, দ্রুত সাত নম্বর রুমে যান।

আমিও গেলাম পিছু পিছু। কর্তব্যরত চিকিৎসক বিড়ালটি ভালো করে দেখলেন। থার্মোমিটারে জ্বর মেপে বললেন, ‘জ্বর তো ১০৭ ডিগ্রি। আচ্ছা, করিডরে গিয়ে বসেন। পানি দিয়ে গা মুছে দেন। জ্বরটা একটু কমুক।’ 

মনে পড়ল

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কথা মনে করিয়ে দিল করিডরটি। করিডরের দুই ধারে ভেটেরিনারি সার্জনদের ঘর। অনেক জায়গা থেকে লোক এসেছে। বসে আছে অনেক, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও কেউ কেউ অপেক্ষা করছে। কারো সঙ্গে কবুতর, তো কারো সঙ্গে কুকুর। বিড়াল, ভেড়া কিংবা মুরগিও আছে অনেকের সঙ্গে। ময়না বা টিয়ার মতো পোষা পাখিও দেখা যাচ্ছে। একে একে ভেতরে ডাক পড়ছে। কেউ বের হচ্ছেন খুশিমনে, কারোর বা মুখ কালো। কথা হলো সাহানা বেগমের সঙ্গে, ‘আমার বিড়ালটা নাদুসনুদুস আছিল। এখন দ্যাখেন শুকাইয়া কেমুন হইছে। আমার অসুখের সময় মাথার পাশে  বইসা থাকত। এহন ওরই অসুখ।’ বলতে বলতে চোখ মুছলেন। সাহানার পাশের চেয়ারে রানা নামের একজন বসা। যাত্রাবাড়ী থেকে এসেছেন। বললেন, ‘কুকুরটার মনে হয় অ্যালার্জি হইছে। কিছু খাইতে চায় না। এই নিয়া দুইবার আইলাম। খুব খারাপ লাগতেছে। যে যেইটা পালে হের হেইডার লাইগা মায়া লাগে।’ অপেক্ষমাণদের আরেকজন চিন্ময় গোস্বামী। বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। বললেন, ‘এখানে ভালো চিকিৎসা হয়। ভিজিট লাগে না, বিনা ফিতে ভালো চিকিৎসা মেলে। ডাক্তাররাও অনেক সময় নিয়ে কথা শোনেন। পরামর্শ দেন।’

আর্তচিৎকার শুনলাম

হাসপাতালের চিফ ভেটেরিনারি অফিসার ডা. ফরহাদ হোসেন। ঘরের সামনে গিয়ে দেখি বন্ধ। এনিম্যাল অ্যাটেনডেন্ট মজনু খান জানালেন, স্যার আইজ ছুটিতে আছেন। এই সময় পাশের ঘর থেকে আর্তচিৎকার ভেসে এলো। গিয়ে দেখি, স্ট্রেচারে শোয়ানো একটি কুকুর ধরে আছেন দু-তিনজন। কুকুরটাকে ইনজেকশন পুশ করা হচ্ছে।

কুকুরটার  পাশেই আরেকটি স্ট্রেচার। তাতে একটি বিড়ালকে শুইয়ে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। ওখান থেকে বের হয়ে আবার করিডরে গিয়ে বসলাম। করিডরের প্রায় শেষ দিকের একটি ঘর থেকে ১৫-১৬ জনের একটি দল বেরোল। সবার পরনে সাদা অ্যাপ্রন। সবাই শিক্ষার্থী। একজনের নাম শামীম মিঞা। দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ভেটেরিনারি মেডিসিন পড়ছেন। বললেন, ‘আমাদের ১১ ব্যাচের মোট ১৭ জন এখানে ইন্টার্ন। এখানে আমরা হাতে-কলমে শিখছি। চার দিন হলো এসেছি। প্রতিদিনই নতুন কিছু শিখছি।’

চারটার আগে ফুরসত মেলে না

ডা. মাকসুদুল হাসান হাওলাদার। হাসপাতালটির ভেটেরিনারি অফিসার। এতক্ষণ ইন্টার্নদের ক্লাস নিচ্ছিলেন। তাঁর ঘরে বসে কথা হচ্ছিল। বললেন, ভিড় লেগেই থাকে। চারটার আগে লাঞ্চ করতে পারি না। একসময় গবাদি পশু নিয়ে বেশি আসত। এখন বেশি আসে পোষা প্রাণী নিয়ে। আমরা জাতীয় চিড়িয়াখানায় গিয়েও পশুপাখির চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি। বিদেশি দূতাবাসগুলো থেকেও ডাক আসে। ভারতীয় হাইকমিশন আমাদের আধুনিক এক্সরে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’ তাঁর কাছেই জানলাম, কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালের যাত্রা শুরু ১৯২০ সালে। ৩ দশমিক ৪ একর জায়গা নিয়ে হাসপাতালটি। জমি দিয়েছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। মূলত ঘোড়ার চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমিটি দান করেছিলেন। স্বাধীনতার পর এটি সরকারি হয়। এখন  হাসপাতালে সব ধরনের পশুপাখির চিকিৎসা হয়। দুই শিফটে  ১০ জন চিকিৎসক সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করেন। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। আর শুক্রবার দুপুর ১২টা ও শনিবার বেলা ২টা পর্যন্ত হাসপাতাল খোলা থাকে। অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে এখানকার সব সেবাই পাওয়া যায় বিনা মূল্যে। গত মাসে এখানে ৮৬টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। আর সেবা পেয়েছে প্রায় ২৮ হাজার পশুপাখি। কিছু সমস্যার কথাও বললেন ডা. মাকসুদ, আমাদের প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও অভাব আছে। মোবাইল ভেটেরিনারি সার্ভিস নেই। মানুষের মতো পশুপাখিরও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী বিশেষ যত্ন দরকার, সেটাও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ওষুধের বরাদ্দও প্রয়োজনের তুলনায় কম।                                   

                                      ছবি: মোহাম্মদ আসাদ

সিঁড়িঘরে ছাগল নিয়ে অপেক্ষারত দুজন

 

হাসপাতালের করিডর

 

  সাহানা বেগমের বিড়ালটা শুকিয়ে গেছে


মন্তব্য