kalerkantho


বাঙালির বিশ্বদর্শন

টাইটানিক কোয়ার্টার ও ক্রামলিন কারাগার

রাইসুল সৌরভ   

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



টাইটানিক কোয়ার্টার ও ক্রামলিন কারাগার

টাইটানিক কোয়ার্টারে লেখক

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্ট। ছোট পরিপাটি শহর। বেলফাস্ট সিটি হল ডোনেগাল স্কয়ারে। শহরের মধ্যখানে। ১৮৮৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া বেলফাস্টকে শহরের মর্যাদা দিলে হলটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। আর একে ঘিরেই নগরীর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার।

 

হিমেল এক সন্ধ্যা

এই ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যা। হিম হিম ভাব। গ্লাসগো থেকে বিমানে চলেছি বেলফাস্ট। আবহাওয়া গোলমেলে বলে একচোট ঝাঁকুনি খেয়ে নিল। বিমানবন্দরে নামার পর বৃষ্টিতে ধরল। সব সামলেসুমলে হোটেলে পৌঁছে একচোট ঘুম দিয়ে দিলাম। পরের দিনই গিয়েছিলাম বেলফাস্ট টাইটানিক কোয়ার্টারে। এটি আস্ত একটি দ্বীপমতো জায়গা। ১৯৯৫ সালের আগে পর্যন্ত কুইন্স আইল্যান্ড নামে পরিচিত ছিল। আয়তন ১৮৫ হেক্টর। ৯৭ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা হয়েছে টাইটানিক কোয়ার্টার গড়ে তুলতে। এখানে হোটেল আছে, কলেজ আছে, সায়েন্স পার্ক আছে। গেম অব থ্রোনসের সেট আছে। তবে সব ছাপিয়ে বড় পরিচয়, এটি টাইটানিক জাহাজের জন্মস্থান। ২০১২ সালে উদ্বোধন করা হয়। আমার মন জাদুঘরের দিকেই গেল। ২০ শতকের গোড়ার দিক ছিল সেটা। ১৯০৮ সালে জাহাজটি তৈরি শুরু হয়। চার বছর ধরে নির্মাণকাজ চলে। পেল্লায় সে জাহাজ কিভাবে তৈরি হয়েছিল তার বিশদ বর্ণনা দেয় এই জাদুঘর। স্টিলে নির্মিত ৮৮২ ফুট দীর্ঘ ছিল জাহাজটি। সাড়ে তিন হাজার লোক ধরার ক্ষমতা ছিল। স্টার লাইনের উইলিয়াম পেরি জেদ করেই সে সময়ের সবচেয়ে বড় জাহাজটি তৈরি করিয়েছিলেন। গ্রিক পুরানের টাইটান থেকে টাইটানিক, যার অর্থ দৈত্যাকার। প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি, বলরুম, ইঞ্জিন ঘর, ঘড়ি, চেয়ার, থালা-বাসন সব কিছুরই নমুনা রাখা আছে এখানে। বলা হয়ে থাকে সিটি হল দেখেই টাইটানিকের ইন্টেরিয়র নকশা করা হয়েছিল। জাদুঘরে জাহাজ তৈরির নকশাপত্রও দেখার সুযোগ আছে। শুধু কারে চড়ে জাহাজের জন্মকথা জানতে গিয়ে টের পেলাম—কী অমানুষিক পরিশ্রমই না করেছে শ্রমিকরা। আর এক-দুজন তো নয়, ১৫ হাজার শ্রমিক খেটেছে।

জাহাজ দেখা শেষ করে গেলাম বেলফাস্ট ক্যাসেলে। সমুদ্রতট থেকে ৪০০ ফুট উঁচুতে এর অবস্থান। ১২ শতকে নর্মানরা এটি তৈরি করেছে। নর্মানরা ভাইকিংদের উত্তরসূরি। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি নাম নর্মানদের থেকেই হয়েছে। ক্যাসেল শেষ করে শহরতলির দিকে রওনা দিলাম। এখানে আছে ক্রামলিন রোড। আছে পুরনো কারাগার। এখন আর কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয় না বরং দর্শনীয় স্থান। ভাগ্য ভালো, পৌঁছানোর অল্পক্ষণ পরেই গাইডেড ট্যুর শুরু হয়েছিল।

পুরনো কারাগার

কয়েদিদের পোশাক পরিবর্তন ঘর দেখানোর পর গাইড নিয়ে চললেন এক শীতল গুহাপথের ভেতর। এই পথ দিয়ে বন্দিদের কোর্ট ভবনে আনা-নেওয়া করা হতো। তারপর গেলাম জেল গভর্নরের ঘরে। সম্ভবত এটিই কারাগারের উষ্ণতম স্থান। এরপর গেলাম মূল কারাগারে। গাইড জানালেন, এখানে কুখ্যাতরা যেমন ছিলেন, ছিলেন বিখ্যাতরাও। যাঁরা লড়াই করেছেন অধিকার আদায়ের জন্য। যেমন—নারীদের ভোটাধিকারের জন্য যাঁরা সংগ্রাম করেছিলেন তাঁদের অনেককেই এখানে রাখা হয়েছিল। পাথর ভাঙার মতো পরিশ্রমী কাজও করতে হয়েছে তাঁদের। অনেকেরই মুখ ঢেকে রাখা হতো। যেন তাঁরা চোখ দিয়েও ভাষা বিনিময় করতে না পারেন। এর ফলে অনেকেরই মানসিক রোগ দেখা দেয়। তাই পরে বিধান পরিবর্তিত হয়। বন্দিরা পরস্পরের মুখ দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। শেষমেশ গাইডের পেছন পেছন চললাম কনডেম সেল দেখতে। এখানে শুধু ফাঁসির আসামিদের রাখা হতো। ফাঁসি কার্যকরের মঞ্চটিও কাছেই। সাধারণত ফাঁসি দেওয়া হতো সকাল ৮টায়। ফাঁসি কার্যকরের আগে কয়েদিকে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হতো। পছন্দের খাবারও দেওয়া হতো শেষবেলায়।


মন্তব্য