kalerkantho


আরো জীবন

বীরেন্দ্রনাথ সেলুনওয়ালা

প্রায় ৫৫ বছর ধরে বীরেন্দ্রনাথ শীল ঘুরে ঘুরে চুল-দাড়ি কাটেন। তিনি নিজেই একটি ভ্রাম্যমাণ সেলুন। সান্তাহার শহরে তাঁকে খুঁজে পেয়েছেন মাসুদ রানা আশিক

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বীরেন্দ্রনাথ সেলুনওয়ালা

প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায়। বগলে একটি টুল, হাতে আরেকটি। আরেক হাতে একটি ব্যাগ। বীরেন্দ্রনাথ বাড়ি থেকে বের হন সকাল ৮টায়। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন সান্তাহার শহরে। তাঁর বাবার নাম পুলিন্দ্রনাথ শীল। পেশায় বীরেন্দ্রনাথ নরসুন্দর। সান্তাহার ইউনিয়নের সান্দিরা গ্রামের কালিতলায় তাঁর বাড়ি। দেখে যদিও মনে হয় না, কিন্তু বয়স ৭০ হয়ে গেছে।  চুলগুলো  সাদা। গলায় পরেন রুদ্রাক্ষের মালা।

 

শুরু ১৩ বছর বয়সে

চাচা শচিন্দ্রনাথ শীল কাজ শিখিয়েছেন বীরেন্দ্রকে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৩।  প্রথম প্রথম কিছু দোকানে কাজ করেছেন। কিন্তু নিজে দোকান দেননি। গ্রামের রাস্তার ধারে অনেক দিন বসেছেন। এখন ঘুরে বেড়ান সান্তাহার শহরে। তিনি শহরের একজন পরিচিত মুখ। শহর চক্কর দেওয়ার সময় বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়েও অনেকে চুল-দাড়ি কাটান। চক্কর শেষ হলে সান্তাহার রেল ইয়ার্ড কলোনির পাশে ছোট্ট একটি গুমটিঘরের ধারে গিয়ে বসেন। দিনের অনেকটা সময় তাঁর এখানেই কাটে। তারপর সূর্য পশ্চিমে হেললে আবার শহরমুখো হন। রেললাইনের ধারে এক জায়গায় বসেন। সন্ধ্যার মুখে মুখে ভ্যান বা অটোরিকশায় চেপে বাড়ির পথ ধরেন।

হাটও করেন

শনি ও মঙ্গলবার সান্তাহার হাট। বুধবার যান পাশের হালালিয়া হাটে। হাটের দিন ভোরবেলায় বের হন। হাটের একটি নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে বসেন। হাটবারে উপার্জন কিছু বেশি হয়।

‘আধুনিক যুগ। এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেলুনও অনেক। আপনার কাছে কাস্টমার আসে?’

উত্তরে মুচকি হাসেন। বলেন, ‘আসে, আমি যেমন ভ্রাম্যমাণ, আমার কাছে আসেও সব ভ্রাম্যমাণ লোক। সম্ভ্রান্ত লোকেরা কমই আসে। তবে অনেকের বাড়িতে প্রতিবন্ধী লোক আছে। তারা সেলুনে যেতে পাারে না। তাদের চুল কাটাতে আমাকে বাড়িতে ডাকা হয়। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ের চুল কাটাতেও অনেক সময় বাড়িতে যাই।’ আগে কিন্তু ওই ইয়ার্ড কলোনির কর্মচারীরা তাঁর কাছেই চুল কাটাত। এখনো কেউ কেউ কাটে, তবে আগের মতো নয়। তাঁর কাছে ছোটবেলায় চুল কাটিয়েছেন এমন লোক এখন বড় বড় শহরে বড় কর্মকর্তা। তাঁরা সান্তাহারে এলে বীরেনকে দেখে খুশি হন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘চাচা আপনি এখনো আছেন?’

 

সেই দিনগুলো

তখন চুল কাটা আর দাড়ি কামানোর মজুরি ছিল ১ আনা। মানে সেই তখন, যখন তিনি কাজ শুরু করেছিলেন। তখন জিনিসপত্রের দাম ছিল খুবই কম। যা উপার্জন হতো, তা দিয়েই চলে যেত। তাই বীরেন বললেন, ‘তখনই ভালো ছিল। এখন সংসার চালানো খুব কঠিন। চুল কাটার জন্য এখন পাই ১৫ টাকা। দিনে ২০০ বা আড়াই শ টাকা উপার্জন হয়। তবু টেনেটুনে চলে সংসার।’

 

নিজে পড়ালেখা শেখেননি

একটি আয়না থাকে তাঁর ব্যাগের ভেতর। চুল কাটা বা দাড়ি কামানোর সময় আয়নাটা সামনে ধরেন। যদি সমস্যা থাকে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে দেন। চাচা লেখাপড়া খুব একটা করেননি। সংসারে তাঁর তিন মেয়ে, এক ছেলে। সবাইকে কিছু না কিছু লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ছেলেটা এই কাজ করে না। সে মালয়েশিয়া গেছে চার মাস হয়। আশা করছেন ছেলেটা টাকা পাঠালে সংসারে অভাব থাকবে না।

তখন কি এই কাজ ছেড়ে দেবেন? প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ ভাবেন বীরেন শীল। তারপর বলেন, ‘না বাবা, আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই কাজ করতে চাই। একটা নেশা হয়ে গেছে। কাজটা ছাড়লে আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে।’

 

আগে সান্তাহার যেমন দেখেছেন

‘তখন তো এত রাস্তাঘাট ছিল না। শুধু ব্রিটিশ আমলে তৈরি রেলের এই বাড়িগুলো ছিল। তখন সান্তাহার আসতাম জমির আইল ধরে হেঁটে। গাড়ি তো ছিল না এত।  রিকশা চলত কিছু। আর ছিল ঘোড়ার গাড়ি।  গাড়িগুলো যেত নওগাঁ, হেলালিয়া হাট বা ছাতনিতে। ওই ঘোড়ার গাড়ির কারণেই সান্তাহার দুই নম্বর রেলগেটের নাম হয় ঘোড়াঘাট। এখনো অনেকে ঘোড়াঘাট নামেই ডাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও একবার এসেছিলেন সান্তাহারে। কিন্তু  কত সালে মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে, সেটা মুক্তিযুদ্ধের আগে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা এখানে ছিলাম না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই মাস পর পরিবারের সবাই ইন্ডিয়া চলে যাই। সেখানেই ছিলাম যুদ্ধের পুরোটা সময়। দেশ স্বাধীন হলে আবার দেশে আসি।’ বলছিলেন বীরেন শীল।

 

মনে হবে জেলে আছি

প্রশ্নটা করেই ফেললাম, দোকান তো নিতে পারেন?   কিছুক্ষণ ভেবে বলেন, ‘পুঁজি তো দরকার। আমার তো পুঁজি তেমন নাই। আর অনেক দিন ধরে এমনটাই চলছে। অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন দোকান দিলে মনে হবে জেলে আছি। বদ্ধ কোনো ঘরে কাজ করছি। আমার এভাবে হেঁটে হেঁটে কাজ করতেই ভালো লাগে। অনেক কিছু দেখা যায়, শোনা যায়।’    

                                        ছবি : লেখক


মন্তব্য