kalerkantho


বইবাড়ি

উত্তরের বাতিঘর

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উত্তরের বাতিঘর

বরেন্দ্র গ্রন্থাগারের বাংলা পুঁথির তালিকা

দয়ারামপুরের জমিদার শরত্কুমার রায় জোট বেঁধেছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় আর রমাপ্রসাদ চন্দের সঙ্গে। প্রথমজন ছিলেন ঐতিহাসিক, আর দ্বিতীয়জন প্রত্নতাত্ত্বিক। তিনে মিলে গড়ে তোলেন বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি। বরেন্দ্র জাদুঘর গ্রন্থাগার তারই ফসল। ঘুরে এসেছেন উদয়শংকর বিশ্বাস

 

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরের সহকারী অধ্যক্ষ। ১৯১০ সালে তাঁর নেতৃত্বে রাজশাহীর খেতুর, পালপাড়া, মান্দইলসহ আরো অনেক জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালানো হয়। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির সদস্যরাও তাতে যোগ দেন। সমিতির আনুষ্ঠানিক যাত্রাও শুরু হয় ওই বছর। তারপর ১৯১৪ সালে সমিতি বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। লর্ড কারমাইকেল এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ১৯১৬ সালের ১৩ নভেম্বর। শরত্কুমার প্রত্নবস্তু সংগ্রহ ও প্রদর্শনেই শুধু থেমে থাকতে চাননি, তিনি গবেষণা ধরে রাখতে গ্রন্থাগার করার কথাও ভাবেন। সে মতো তিনি ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম ইত্যাদি অনেক বিষয়ের অনেক বই ও সাময়িকী সংগ্রহ করেন। একই সঙ্গে পুস্তক প্রকাশের কথাও ভেবেছিলেন। একপর্যায়ে তাই বরেন্দ্র জাদুঘর প্রকাশ করে গৌড়লেখমালা (১৯১২), গৌড়রাজমালা (১৯১২), তারাতন্ত্রম (১৯১৪),  ভাষাবৃত্তি (১৯১৮) ইত্যাদি। পাশাপাশি জার্নাল অব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম নামের একটি সমৃদ্ধ সাময়িকীও প্রকাশ করে। এটি শেষবার প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ সালে।

 

অমূল্য রতন

প্রায় পাঁচ হাজার প্রাচীন পুঁথি আছে গ্রন্থাগারে। এগুলোর কয়েকটি প্রাচীন বাংলা ও নাগরি লিপিতে লেখা। পুঁথিগুলোর বিষয় রামায়ণ, মহাভারত, মঙ্গলকাব্য, পীরসাহিত্য, ব্রতকথা, বৈষ্ণব পদাবলি ইত্যাদি। আছে বেদান্ত, স্মৃতি, অভিধান, বৌদ্ধ, তন্ত্র, অলংকারশাস্ত্রের পুঁথিও। পুঁথি জোগাড় করতে শরত্কুমার পুরী, ভুবনেশ্বর, কোনারক, বুদ্ধগয়া, কাশী, সারনাথ, কানপুর বা এলাহাবাদ গিয়েছিলেন। গ্রন্থাগারের সচিত্র অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা নামের পুঁথিটি তো খুব নামকরা। দ্বাদশ শতকে বৌদ্ধ তান্ত্রিকরা এটি রচনা করে থাকবেন। এমনি আরেকটি বিখ্যাত পুঁথি হলো ‘তন্ত্রগ্রন্থ’। এটিও দ্বাদশ শতকে লেখা বলে অনুমান করা হয়। এতে বহু হস্ত-বহু পদবিশিষ্ট দেবতাদের ছবি আছে। জাদুঘর শুধু সংস্কৃত পুঁথিগুলোরই তিনটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় আছে অদ্ভুত শান্তিঃ, কঠোপনিষদ্, ছান্দোগ্য মন্ত্রভাষ্য, তত্ত্বমুক্তাবলী, তৈত্তিরীয়োপনিষৎ ইত্যাদি। আর ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় বাংলা পুঁথির তালিকাটি। এক হাজার ৫৫৩টি পুঁথির নাম আছে এতে। যেমন—পদ্মাবতী, লাইলি-মজনু, লালমতী ছয়ফুল মুলুক, নলদময়ন্তীর উপাখ্যান, হরগৌরী সংবাদ ইত্যাদি। গবেষকদের পুঁথি গবেষণায় সাহায্য করেন জাদুঘরের উপ-প্রধান সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আবদুল কুদ্দুস। তাঁর কাছে জানা গেল, দেশি-বিদেশি অনেকেই এখানে পুঁথি নিয়ে গবেষণা করতে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপক রবার্ট ইয়েল, জাপানের কিয়োটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিমিআকি তানাকা, ব্রাজিলিয়ান গবেষক ডেমিয়ান জি. মার্টিনস প্রমুখ এখানে কাজ করেছেন।

 

গ্রন্থরত্ন

গ্রন্থাগার ভবনটি তিন তলাবিশিষ্ট। দ্বিতীয় তলায় আছে সারি সারি সেগুন কাঠের আলমারি। এর সবই বইয়ে ভরতি। প্রায় ১৪ হাজার। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ব্রজাঙ্গনা কাব্য, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী, দেবী চৌধুরাণী, রাজসিংহ, গোবিন্দমোহন রায় বিদ্যাবিনোদের লীলাবতী, প্রমথনাথ মিত্রের তর্কতত্ত্ব, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের হিত-প্রভাকর, কবি বনমালী দাসের বৈষ্ণব পদাবলি, ভুবনমোহন দত্তের পদ্যপাদব, নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মীন-চেতন, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের শ্রীকৃষ্ণবিলাস ইত্যাদি গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ আছে এ গ্রন্থাগারে। পুরনো বাংলা সাময়িক পত্রেরও বিশাল সম্ভার আছে গ্রন্থাগারে। বিশেষত রাজশাহী থেকে প্রকাশিত গোঁড়া হিন্দুদের মুখপত্র হিন্দু-রঞ্জিকার বেশ কিছু সংখ্যা আছে এখানে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাহিত্য-পরিষদ পত্রিকার প্রথম দিককার সব কয়টি সংখ্যাই আছে। পূর্বানুমতি নিয়ে গবেষক-পাঠকরা এখানে বই পড়তে পারেন। তবে বই বাসায় নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।



মন্তব্য