kalerkantho


আরো বই

রেলস্টেশনের বুক স্টল

সান্তাহার জংশন স্টেশনের এক আর দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে আছে একটি বুক স্টল। ৩০ বছর ধরে দোকানটি চালায় আশুতোষ সেনের পরিবার। আশুতোষের দেখা পেয়েছিলেন মাসুদ রানা আশিক

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রেলস্টেশনের বুক স্টল

সান্তাহার জংশনের বুকস্টল

আশুতোষ সেনের আদি বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার বাজালিয়া গ্রামে। এখন সান্তাহার পৌরসভার হাউজিং কলোনিতে ভাড়া থাকেন। বাবার নাম গোপালচন্দ্র সেন। চার ভাই, তিন বোনের মধ্যে আশুতোষ পঞ্চম। একাত্তরে জন্ম তাঁর। এখন বয়স ৪৭। তাঁর মধ্যে ২১ বছরই গেছে বইয়ের সঙ্গে থেকে। সেই ১৯৯৭ সালে বই বিক্রিতে লাগেন। কেমন লাগে? প্রশ্নটা শুনে একটু হাসেন। বলেন, ‘ভালোই তো লাগে। যৌবন পার করে, এখন মধ্যবয়স পার করছি বইয়ের সঙ্গে। একটা মায়া হয়ে গেছে।’

 

বইয়ের সঙ্গে যোগ

বুক স্টলের বয়স কত জানেন না আশুতোষ সেন। তবে তাঁদের আগে এটা চালাত ইয়াকুব আলী নামে একজন। তিনি মারা যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে আশুতোষের সেজ ভাই কালিপদ সেন দোকানটায় বসেন। কালিপদ ছিলেন প্রায় পাঁচ বছর। তারপর থেকেই আছেন আশুতোষ। মামা অনিলকান্তি দাস স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের ম্যানেজার ছিলেন। ঢাকার বাংলাবাজারের পাবলিশার স্ট্যান্ডার্ড। তাদের এজেন্ট ছিল দেশের অনেক জায়গায়। আশুতোষের বড় ভাই বিষ্ণুপদ সেনও ছিলেন একজন এজেন্ট। বিষ্ণুপদ ঈশ্বরদী রেলওয়ে স্টেশনের দোকানে বই দিতেন। সেটা ১৯৮৫ সাল হবে। পরে বিষ্ণুপদের ব্যবসা বেশ বড় হয়েছিল। রেলওয়ে স্টেশনকেন্দ্রিকই ছিল তাঁর ব্যবসা। ঈশ্বরদী, সান্তাহার, নাটোর, জয়পুরহাট, পার্বতীপুর, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা ও খুলনা স্টেশনে দোকান ছিল বিষ্ণুপদের। এখন সেন পরিবারের শুধু ঈশ্বরদী, সান্তাহার আর নাটোরে দোকান আছে।

 

আশুতোষের কিছু কথা

চট্টগ্রামে নিজের গ্রামেই থাকতেন আশুতোষ। এসএসসি পাস করেছেন বাজালিয়ার শেরেবাংলা হাই স্কুল থেকে। তারপর আর পড়াশোনা এগোয়নি। বেকারই বসেছিলেন। বিষ্ণুপদের ব্যবসা বড় হলে অন্য তিন ভাইকে ডেকে পাঠান। তারপর থেকে আশুতোষও আছেন বইয়ের ব্যবসায়। আশুতোষের সেজ ভাই কালিপদ সেন ও ছোট ভাই পঙ্কজ সেন বগুড়ায় থাকেন। সেখানে তাঁদের নিউজ কর্নার পাবলিকেশনস নামে একটা প্রকাশনী আছে। সেই প্রকাশনী থেকে অনেক বই প্রকাশ হয়। পুরো উত্তরবঙ্গে তাঁদের বই যায়।

আশুতোষের বিক্রি মোটামুটি ভালো। আগে অবশ্য আরো ভালো ছিল। পাইকারি বিক্রি করেন শিশুতোষ বই, রান্নার বই, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, যাত্রার বই, জীবনী, নাটকের বই, লালন ফকিরের গানের বই ইত্যাদি। মূলত স্থানীয় হকার ও পার্শ্ববর্তী দোকানগুলোতে পাইকারি বিক্রি করেন। খুচরা বিক্রি করেন উপন্যাস, অভিধান, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সও। দিনে তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকার বই বিক্রি হয়। কোনো কোনো দিন অবশ্য অনেক কমও হয়। লাভ থাকে ৫০০-৬০০ টাকা।

 

আগেই ভালো ছিল

এখন মোবাইল আর ইন্টারনেট বইয়ের জায়গা কিছুটা দখল করে নিয়েছে। আগে বেশি বিক্রি হতো সেবা প্রকাশনীর ‘তিন গোয়েন্দা’, ‘মাসুদ রানা’, ‘ওয়েস্টার্ন’সহ অন্য সব বই। ‘দস্যু বনহুর’ও ভালো বিক্রি হতো। হুমায়ূন আহমেদ, মুহাম্মদ জাফর ইকবালসহ আরো অনেক লেখকের বইও বিক্রি হতো। কিশোর পত্রিকা, ছোটদের কাগজ, রহস্য পত্রিকাও ভালো বিক্রি হতো আগে।

 

এখন স্টলে আছে

অনেক লেখকেরই বই আছে আশুতোষের দোকানে। সত্যজিৎ রায়, হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, শামসুর রাহমানের বই আছে। আছে ডেল কর্নেগি, জুল ভার্ন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকুমার রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, কাজী আনোয়ার হোসেন, রকিব হাসানের বইও। কিছু স্থানীয় লেখকের বইও আছে।

 

কারা কেনে

যুবক বয়সের ছেলে-মেয়েরাই আউট বই বা গল্পের বই কেনে বেশি। তারা বেশি কেনে উপন্যাস। আর চাকরিপ্রার্থীরা খোঁজে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, কারেন্ট ওয়ার্ল্ডজাতীয় বই। ভাসমান ক্রেতাও আছে। ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে একটা-দুইটা বই কিনে ফেলে। ট্রেন থেকে নেমেও অনেকে বই কেনে। শিশুতোষ বইও কিন্তু অনেক বিক্রি হয়।

 

আশুতোষের ভালো লাগে

তাঁর ২১ বছরের বই বিক্রির জীবনে অনেকে তাঁর কাছ থেকে বই কিনেছেন। কেউ কেউ ভালো ভালো চাকরিও পেয়েছেন। ব্যবসা করে বড়লোক হয়েছেন অনেকে। লেখালেখিকেও পেশা হিসেবে নিয়েছেন কয়েকজন। সান্তাহারে এলে তাঁর সঙ্গে একবার হলেও সবাই দেখা করে। এটা আশুতোষের খুব ভালো লাগে। আশুতোষ বলেন, ‘বই মানুষের চোখ খুলে দেয়, মনুষ্যত্ব জাগ্রত করে, জ্ঞান বাড়ায়। যাঁরা লেখক হতে চান, তাঁদের বেশি বেশি বই পড়া উচিত। বইয়ের ব্যবসা একটি আনন্দদায়ক ব্যবসা।’      

 

ছবি : লেখক



মন্তব্য