kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

ইচ্ছা হয় সব পুড়িয়ে ফেলি

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইচ্ছা হয় সব পুড়িয়ে ফেলি

ব্র্যাকের স্কুল প্রজেক্টের একটি স্কুল থেকে আমি আমার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষ করেছিলাম। মজায় মজায় পড়তাম, শিখতাম। বেশ ভালোই ছিল সেই দিনগুলো। হঠাৎ একদিন বেশ লম্বা, সুঠামদেহী একজন মনিটর এলেন আমাদের স্কুল পরিদর্শনে। তাঁর অমায়িক ব্যবহারে অল্প সময়েই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মানুষের কথা বলার ভঙ্গি এত হৃদয়গ্রাহী হতে পারে! বিষয়টা এখনো আমাকে ভাবায়। একপর্যায়ে তিনি সব ছাত্র-ছাত্রীর কাছে জানতে চাইলেন, লেখাপড়া শিখে কে কী হতে চাও? কেউ বলল ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ব্যবসায়ী ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কিছু বলছি না দেখে তিনি সহসা আমার কাছে এসে বললেন, তুমি কিছু হতে চাও না ওদের মতো? আমি কী ভেবে অকপটে বলে ফেললাম, আমিও হতে চাই, আমি কবি হতে চাই, একজন ভালো মানুষ হতে চাই। মুহূর্তেই পিনপতন নীরবতা। তিনি তাঁর দৈত্যের মতো দুই হাত আমার ছোট দুই কাঁধের ওপর রাখলেন। আচমকা তাঁর বিশাল বুকে জড়িয়ে নিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমার গাল বেয়ে জল ঝরে বুক ভেসে যাওয়ার উপক্রম। ভয়ে না, ভালো লাগায়, তা কোনো দিনই আমার জানা হবে না।

তারপর জীবনের গতিপথে বয়ে গেছে অনেকটা পথ। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ওই স্কুল পেরোনো ছাত্রদের মাঝে আমিই একমাত্র গ্র্যাজুয়েট! অনেকের কাছে গর্ব করার মতো হলেও বিষয়টা আমার কাছে নেহাতই মামুলি। কারণ এর ভেতরের সময়গুলোতে আমি জীবনের নিগূঢ় বাস্তবতা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে ফেলেছি।

সৃষ্টিশীলতা খুব ছোটবেলা থেকেই আমার গভীরে আছে। ক্লাস এইটে থাকার সময় ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘সুকন্যা’ নামক পত্রিকায় পরপর দুটি কবিতা প্রকাশিত হয়। স্থানীয় ‘ফুলখড়ি’ পত্রিকায় নিয়মিতই লিখতাম। আমার এলাকায় ‘কবি’ হিসেবে একটা আলাদা পরিচিতি আগে থেকেই আছে। অতঃপর এইচএসসি পাস করে একরাশ স্বপ্ন ব্যাগে পুরে ঢাকায় এলাম। লেখালেখির হাতটা আরো পাকানোর জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় ট্রাই করলাম; কিন্তু কিছুতেই কিছু না হওয়ায় একসময় মন আর সায় দিল না। কবিতা প্রকাশের জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতে লাগলাম, তাও হলো না। দুই বছর ধরে পাঠিয়েও কোনো জাতীয় পত্রিকায় একটা কবিতাও ছাপা হলো না। আমি একদম বাজে লিখি, তা ছাপার অযোগ্য—বিষয়টা এমনও নয়। অথচ বন্ধুমহলে আমি ভালো লিখি বলে প্রচার আছে। যা হোক, একসময় পত্রিকায় লেখা ছাপানোর চেষ্টা বাদ দিলাম। একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে গেলাম মোটামুটি ভালো মানের একটা প্রকাশনীতে। আমার অবাক হওয়া বাকি ছিল। প্রকাশক সাহেব নিতান্তই বাধ্য হয়ে বারবার মুখ সিটকিয়ে বহু কষ্টে দু-চারটি কবিতা পড়ে এমন ভাব করলেন যেন এর চেয়ে বাজে জিনিস পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। অতঃপর নানা বিষয়-ভঙ্গিমায় পাণ্ডুলিপি উল্টাতে উল্টাতে যা বললেন তার সারবস্তু হলো—আসলে আজকাল কবিতা কেউ খায় না ভাই। পারলে এসব ছেড়ে গল্প-উপন্যাস লেখেন, একটু হলেও খাওয়ানো যাবে। তার পরও তাঁকে অনেক রিকোয়েস্ট করলাম। কারণ গ্রন্থবদ্ধ নিজের লেখা কবিতার একটা বই তো আমার আমৃত্যু আরাধ্য। শেষমেশ প্রকাশক সাহেব এই ফর্মা সেই ফর্মা, এই কাগজ সেই কাগজ করে এমন একটি অঙ্ক ধরিয়ে দিলেন যে ৫০০ বই বের করতেই আমার কেল্লা ফতে। তার মানে নিজের বই নিজের টাকায় বের করে তারপর পাঠকের উদরপূর্তি করতে হবে, যার সামর্থ্য আমার একদমই নেই। যা হোক দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ফিরে এলাম।

আজ জীবনের ২৬তম বর্ষার জলে নিজেকে সময়ের চাহিদামাফিক আবারও ভিজিয়ে নিচ্ছি। এতটি বছর যে স্বপ্ন হৃদগভীরে স্বযত্নে লালন করেছি, তার কি কোনোই স্বাদ-গন্ধময় বাস্তবতা নেই? নাকি একজন কবি ও ভালো মানুষ হতে চাওয়া মানুষের বাস্তবতাই হলো বিভিন্ন জায়গা থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়া? একবার ভাবি, সব কবিতা একসঙ্গে করে পুড়িয়ে ফেলি। কিন্তু কোথায় যেন মায়া লাগে! একজন শুধু কবি হতে চাওয়া বেকার যুবকের স্বপ্ন ভাঙার মর্মপীড়া কেউ কি কখনো বোঝে? মাঝেমধ্যে ওই স্কুল মনিটর স্যারের কথা মনে পড়ে খুব। চিৎকার করে তখন বলতে ইচ্ছা করে, স্যার, আমাকে বুকে জড়িয়ে আপনি কি আমার ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরেছিলেন? যদি পেরেছিলেন, তবে আমাকে বলেননি কেন?

 

সুমন্ত প্রামাণিক



মন্তব্য