kalerkantho


প্রাণের কথা

চাই দীর্ঘ পরমায়ু

অন্য অনেক ইতর প্রাণী যেখানে দুই-চার শতাব্দী হেসে-খেলে পার করছে, মানুষ সেখানে সত্তরেই হাঁপিয়ে উঠছে। মেডিক্যাল ডক্টর অ্যাট ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেস ইউকের সিরাজ ইসলাম কারণ খুঁজেছেন। শুনিয়েছেন আশার কথাও

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



চাই দীর্ঘ পরমায়ু

কাশ্মীরে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি

দীর্ঘ কচলানিতে তেতো হওয়ার ভয়েই নাকি জীবন সংক্ষিপ্ত। কথাটি বিশেষভাবে জানে সম্ভবত এফেমিরা নামক পোকা, যা বাঁচে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তবু আমাদের আইনত কত বছর বাঁচা উচিত এবং এর পরে আরো কতকাল চুপে চুপে বেআইনিও বেঁচে নেওয়া যায়, বিজ্ঞানে সে মীমাংসা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে তার আগে না হয় দেখি আমাদের আত্মীয় মানবেতর জীবেরা কে কেমন বাঁচছে? কাকাতুয়া, শকুন বাঁচে এক শতাব্দী। ফ্যালকন দুই শতাব্দী। সামুদ্রিক কাছিম বাঁচে তিন শ বছর। কুমির চার শ, নিউজিল্যান্ডের গিরগিটি সাড়ে চার শ এবং নীল তিমি হেসে-খেলে পাঁচ শ বছর বাঁচে।

আরো লম্বা পরমায়ুর খোঁজ মেলে উদ্ভিদ সম্প্রদায়ে। সেকোয়া জাতের গাছ বাঁচে দুই হাজার বছর। জেরুজালেমের উদ্যানে যে ডুমুরতলায় যিশুর শেষ রজনী কাটে, সেটি আজও জীবিত। তার বয়স এখন তিন হাজার বছর। তেনেরিফের (স্পেনের দ্বীপ) বিখ্যাত বাওবাব বৃক্ষ বাঁচে পাঁচ হাজার বছর এবং ক্যালিফোর্নিয়ার পাইনগাছ ছয় হাজার বছর। যেখানে এই যে কত ইতর জীব, কারো তাবিজ-কবচ, ডাক্তার-কবিরাজের তোয়াক্কা না করে এত বেশিদিন বেঁচে যাচ্ছে, সেখানে শ্রেষ্ঠ জীবের পক্ষে আদৌ কি ঠিক হয় এত তড়িঘড়ি কৈবল্যপ্রাপ্তি?

 

হাসিখুশি মানুষ বেশিদিন

আধুনিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ১৬০ বছর পর্যন্ত মানবদেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অটুট থাকে, তাই একেবারে ফেলেঝেলেও আমাদের ১৬০ বছর বাঁচার কথা। হ্যাঁ, যদি হৃৎপিণ্ড, রক্তনালি ও মস্তিষ্ক নীরোগ থাকে; ক্যান্সার ও সংক্রামক ব্যাধির মূলোচ্ছেদ হয়, পরিবেশদূষণ ও অপঘাত প্রতিরোধ করে সুষম আহার-বিহার-ব্যায়াম-বিশ্রামের নীতি মোটামুটিও মেনে চলা যায়, তবে আমাদের গড় আয়ু ১৬০ বছরই হওয়ার কথা।

হিপোক্রাতিস মানুষের যৌবন সত্তর বছর পর্যন্ত বলে মনে করতেন। কিন্তু সম্প্রতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন—না, যৌবনের মেয়াদ ঢের বেশি। নব্বইয়েরও পরে শুরু হয় প্রৌঢ়ত্ব এবং ১৩০-এর পর বার্ধক্য। এ জন্য দেড় শ বছরের আগে যেকোনো মৃত্যুকেই রাশিয়ার প্রাণিবিজ্ঞানী মেচনিকভ অপমৃত্যু আখ্যা দিয়েছেন। প্রাচীনকালের কয়েকজন বড় মনীষী বহু দিন বেঁচেছেন। যেমন—বুদ্ধ ৮০, প্লেটো ৮০, অ্যান্টিস্থিনিস ৮০, সফোক্লিস ৯০, জেনোফ্যানিস ৯০, পাইরো ৯৫ এবং জর্জিয়াস ১০৮ বছর। মধ্য যুগের তালিকা অবশ্য বেশ শোচনীয়। আরব মনীষীদের ভেতর আল-ফারাবি ছাড়া তেমন কাউকে আশির কোঠায় পাচ্ছিনে। সে তুলনায় আধুনিককালেই দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে মনীষীদেরও বয়স ক্রমে যেন বাড়ছে।

প্রচুর কারাবাসের পরও রজার বেকন ৮৪, ইনকুইজিশনের হয়রানি সত্ত্বেও গ্যালিলিও ৭৮ এবং অনেক নির্বাসন সত্ত্বেও ভলতেয়ার ৮৪ বছর বেঁচেছেন। নিউটন বেঁচেছেন ৮৫, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ৮৯ এবং হবস ৯১। কান্ট ৮০, ফ্রাংকলিন ৮৪, বেনথাম ৮৪, লিস্টার ৮৫, কার্লাইল ৮৬, তলস্তয় ৮২, হার্বার্ট স্পেন্সার ৮৩, হার্ডি ৮৮, এডিসন ৮৪, ফ্রয়েড ৮৩, পাভ্লভ ৮৭, সত্যেন বোস ৮০, রবীন্দ্রনাথ ৮০, ক্রিস্টোফার রেন ৮১, বার্নাড শ ৯৪, বার্ট্রান্ড রাসেল ৯৮ বছর। দেখা যাচ্ছে, হালকা-পাতলা ও মিতাচারী, সদাশয় ও হাসিখুশি, ধীরস্থির ও জ্ঞানী এবং কর্মব্যস্ত ও সম্মানিত লোকেরা বেশিদিন বেঁচেছেন।

 

মুক্ত হাওয়ায় দম

জীববিদ্যা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং অনেকাংশে জীবনমান বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীতে প্রায় সর্বত্র মানুষের গড় আয়ু ক্রমেই বাড়ছে, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে। যেমন—আমাদের পিতামহের আয়ু ছিল যেখানে অর্ধলাখ বছর আগে নিয়ান্ডারথাল স্তরে মাত্র আঠারো বছর এবং প্রাচীন ও মধ্য যুগে বড়জোর মাত্র পঁচিশ বছর, সেখানে দেখা যাচ্ছে ২০৫০ সালেই উন্নত বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু হবে অন্তত নব্বই বছর।

তবে আয়ু বেশির পেছনে আরো বিচিত্র কারণ থাকে। যেমন—শতায়ুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পৃথিবীর তিনটি উঁচু পাহাড়ি এলাকায়। আন্দিজ, কাশ্মীর ও মধ্য এশীয় জর্জিয়ায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৩০০ গুণ বেশি শতবর্ষজীবীর হার। এসব পার্বত্যাঞ্চলে দীর্ঘজীবী জনগোষ্ঠীর কিছু স্বাতন্ত্র্য আছে। উদ্ধত শৈলের মুক্ত হাওয়ায় এরা বুক ভরে দম নেয়। মদ, মাংস, তামাক—এই তিন বিষদ্রব্যের সেখানে সমাদর নেই। তাজা ফলমূল, টাটকা শাকসবজি ও খাঁটি দুধ খেয়ে তারা মানুষ। আধুনিক উচ্চ বেগের সঙ্গে প্রাণান্ত পাল্লায় তাদের নৈসর্গিক-স্বচ্ছন্দে দেহ-মন হাঁপিয়ে ওঠে না। যন্ত্রসভ্যতার ধাতব কোলাহল ও স্নায়ুচাপ কিংবা শহুরে আলগা ঠাট অথবা শ্বাসরোধী অতিসাধুতার অতিশিষ্টাচারও তাকে তলে তলে জীর্ণ করেনি। না অ্যালোপ্যাথির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, না স্নায়ু-কষাকষির সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা, না উদ্বেগের মোকাবেলায় আরেক উদ্বেগ!

কিন্তু আমরা আদৌ কেন বুড়ো হই, কেন বা আমাদের মরতেই হয়? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে যুগে যুগে গলদঘর্ম হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এরই মধ্যে এ বিষয়ে শ দুয়েক তত্ত্ব জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদিও অন্ধকার অনেকটাই সরেছে, তবু সম্পূর্ণ রহস্য এখনো ভেদ হয়নি।

বিজ্ঞানের বিশেষত ইমিউনোলজি, আণবিক প্রজননবিদ্যা ও প্রজনন-কৌশলের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বয়সের রহস্য যে আরো বেশি উন্মোচিত হতে থাকবে এবং বার্ধক্যকে অনেকটাই জয় করে মানুষ কমপক্ষে শ দেড়েক বছর বেঁচে থাকবে, তা বুঝি বলার সময় এসেছে।

এ কালের ডাক্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, মানুষের সত্যিকার বয়স লেখা থাকে পাসপোর্টে নয়, রক্তনালির গায়ে। খুব বৃদ্ধ বয়সেও কেউ-ই বার্ধক্যবশত মরে না, মরে রক্তনালির রোগে। রক্তনালিকে সুস্থ ও প্রসারিত রাখাই আপাতত দীর্ঘজীবনের প্রধান ও প্রায় একমাত্র শর্ত।...

রক্তনালিতে বীজ লুকিয়ে

দেহে রক্তনালি এত অসংখ্য যে পাশাপাশি জোড়া লাগালে তা এত লম্বা একটা দড়ি হবে, যা দিয়ে বিষুবরেখা বরাবর গোটা পৃথিবীকে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলা যাবে আড়াইবার। এই অজস্র রক্তনালি যেন সূক্ষ্ম নদ-নদী, যাতে রক্তরূপী প্রাণস্রোত প্রবাহিত হয়ে দেহের প্রত্যন্ত কোষে কোষে প্রাণের জ্বালানি পৌঁছে দিয়ে বর্জ্য পদার্থ ফিরিয়ে আনছে সারাক্ষণ। রক্তের এই নদীপ্রবাহ ক্ষীণ হওয়াই বার্ধক্য এবং প্রবাহটা বন্ধ হওয়ার নামই মৃত্যু। সুতরাং বার্ধক্যকে যদি যৌবন দ্বারা পর্যুদস্ত করতে চাওয়া হয়, তবে রক্তনালি সংকীর্ণ হতে দেওয়া যাবে না, তাকে প্রসারিত রাখতে হবে।

রক্তনালি সংকীর্ণ করে চারটি বিষয়—মদ-সিগারেট, লবণ-চিনি, চর্বি ও অতিভোজন। দৈহিক-মানসিক নিষ্ক্রিয়তা ও মন্দ আবেগ—হতাশা, বিষাদ, ঘৃণা, হিংসা, ভয়, দুশ্চিন্তা।

আর তাকে প্রশস্ত রাখে মিতাচার ও হ্যাঁবোধক বেঁচে থাকা। অর্থাৎ শরীরচর্চা, মনশ্চর্চা ও প্রফুল্ল ব্যস্ততা।

সুতরাং যিনি সরস ও সদানন্দ এবং ধনাত্মক ও কর্মময়, পাসপোর্টে তাঁর বয়স যত হোক, দেহের কোষে কোষে তাঁর চিরতারুণ্য। মৃত্যু তাঁকে দেখে দূর থেকে সালাম দিয়ে যায়। বার্ধক্যের ঘুণ তাকে ছুঁতে পারে না—বয়সটা যেন একখানে অচলাবস্থায় পড়ে স্থির হয়ে থাকে। যেভাবে উচ্চ বেগে চলা রকেটের ভেতরে সময়প্রবাহ ধীর হয়ে আসে।



মন্তব্য