kalerkantho


তোমায় সালাম

খালি পায়ের মানুষটা

আঁকিয়ে ছিলেন মকবুল ফিদা হুসেন। সিনেমা বানিয়েছেন, কবিতাও লিখেছেন। ২৪ জানুয়ারি ঢাকার গ্যালারি কায়া তাঁর ছবি নিয়ে এক প্রদর্শনীর আয়োজন করতে চলেছে। এ সুযোগে তাঁকে নিয়ে লেখার লোভ সামলাতে পারেননি তাহসিন চোকদার

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খালি পায়ের মানুষটা

মকবুল ফিদা হুসেন

খালি পায়েই তিনি বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন। পায়ে জুতা না থাকায় একবার মুম্বাইয়ের এক ক্লাবে ঢুকতে বেগ পেতে হয়েছিল। তাতে অবশ্য তাঁর কিছুই এসে-যায়নি। তিনি মাটির স্পর্শ পেতে চাইতেন। তাঁর অফুরান জীবনীশক্তির যে কয়টি উৎস ছিল, তার একটি এই পা খালি রাখা। নিজেই বলেছেন, এতে আমার যে কোনোখানে বসে যেতে সুবিধা হয়। একবার দিল্লির জনবহুল রাস্তায় বসে পড়ে ছবি এঁকেছেন। এক দিন নয়, কয়েক দিন। মানুষ ভিড় করত। বলেছেন, ‘তাতে আমার সমস্যা হতো না। আসলে ধ্যান তো ভেতরের জিনিস।’  মানুষ তাঁকে বলত হুসেনসাব। 

 

তখন তাঁর দেড় বছর বয়স

মাকে যখন হারিয়েছেন তখন তাঁর বয়স দেড় বছর। বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। ১৯১৫ সালে মহারাষ্ট্রের এক বোহরা পরিবারে  হুসেনের জন্ম। সৎমায়ের সঙ্গে হুসেনকেও যেতে হয়েছিল ইন্দোর। মহররমের তাজিয়া মিছিলের ঘোড়া তাঁকে খুব টানত। পরে তিনি ঘোড়া এঁকে অনেক নাম করেছিলেন।  চীনা, আরবি বা তুর্কি ঘোড়া সম্পর্কে জেনেওছিলেন অনেক। কিশোরবেলায় বরোদার মহারাজা হোলকার ও তাঁর রানির দুটি তেলচিত্র দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন হুসেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে দেখতেন ছবিগুলোর দিকে। একসময় বলেছিলেন, আমাকে দুই দিন সময় দিলে আমি এর চেয়ে ভালো আঁকতে পারব। ক্যালিগ্রাফি দিয়ে শুরু করেছিলেন হুসেন। তারপর সিনেমার বিলবোর্ড এঁকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ১৯৩৫ সালে তিনি মুম্বাইয়ের স্যার জে জে আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় সমমনা শিল্পীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রগ্রেসিভ আর্টিস্টস গ্রুপ। ১৯৫১ সালে ইউরোপ যান। জুরিখে তাঁর প্রদর্শনী হয়। ১৯৬৪ সালে তাঁর প্রদর্শনী হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৬৭ সালে হুসেনের চলচ্চিত্র নির্মাণে হাতেখড়ি। তাঁর থ্রু দ্য আইজ অব আ পেইন্টার বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে স্বল্প দৈর্ঘ্য শাখায় গোল্ডেন বিয়ার  পেয়েছিল।  হুসেন পদ্মভূষণ তকমা পেয়েছেন ১৯৭৩ সালে। পরে পদ্মবিভূষণ পেয়েছেন। রবি বর্মা অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। রাজীব গান্ধী তাঁকে রাজ্যসভায় সম্মানের আসন দিয়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে আলোচনা ছিল। বিতর্কও ছিল। তিনি দেবী সরস্বতীর নগ্ন ছবি এঁকেছিলেন। ২০০৬ সালে  ভারতমাতাও এঁকেছেন একই রকমে। কয়েকবারই ছবিটি নিলাম থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। শেষে অবশ্য ৮০ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়। ২০০৮ সালে তাঁর একটি ছবি ক্রিস্টিজ বিক্রি করে ১৬ লাখ ডলারে। এর আগে এত দামে ভারতীয় কোনো শিল্পীর ছবি বিক্রি হয়নি। হুসেনসাব ছিলেন আসলে সৌন্দর্যের পূজারি। মাধুরী দীক্ষিতের ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ ছবিটি দেখেছেন ১৮ বার। 

মাধুরীর পোস্টারের সামনে হুসেনসাব

ছায়াছবি তাঁকে ছাড়েনি

হুসেন কবিতাও লিখেছেন। মেক্সিকোতে তাঁর কবিতা নিয়ে অক্তাবিও পাস আসরও বসিয়েছিলেন। তিনি গানেরও ভক্ত ছিলেন। এ আর রহমানকে পছন্দ করতেন। তবে সব কিছুর ওপরে ছিল সিনেমা। তাঁর পছন্দের চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটক। পথের পাঁচালি তাঁর প্রিয় একটি ছবি। হুসেনসাব দিলীপ কুমারকে উঁচুমানের অভিনেতা মনে করতেন। মধুবালার হাসি তাঁর পছন্দ ছিল। মাধুরী দীক্ষিতের প্রতিভা আর সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন। বলেছেন, ‘দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা’ গানটিতে মাধুরীর খোলা পিঠ দেখা যায় প্রথম, তারপর সে ক্যামেরার দিকে পাঁচ পা পিছিয়ে আসে—আমি বলব অসাধারণ। এ জায়গাটাই ছবিটাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আসলে সিনেমা হলো বিরাট বড় শিল্পমাধ্যম। এখানে অভিনয়, আলোকচিত্র, সংগীত ইত্যাদি অনেক কিছুকে একসঙ্গে পাওয়া যায়।’ হুসেনসাব ২০০০ সালে মাধুরীকে নিয়ে ‘গজগামিনী’ বানিয়েছেন। ২০০৪ সালে টাবুকে নিয়ে বানিয়েছেন ‘মীনাক্ষি’। মীনাক্ষি তো কান চলচ্চিত্র উৎসবেও গিয়েছিল। যখন তিনি কাতারে নির্বাসনে ছিলেন, তখন আনুশকা শর্মা অভিনীত ‘ব্যান্ড বাজা বারাত’ ছবিটিও দেখেছেন কয়েকবার। উল্লেখ্য, ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে একবার ফিল্ম ডিভিশনে উচ্চপদও দিয়েছিলেন। 

 

আরো পছন্দ করতেন 

টেনিস আর ফুটবল খেলেছেন হুসেন। পেলে আর ম্যারাডোনার খেলা তাঁর পছন্দ ছিল। ক্রিকেটে টেন্ডুলকারের খেলা পছন্দ করতেন। সকালে চা খেতে পছন্দ করতেন। দিল্লিতে থাকার সময় নিজামউদ্দিন ধাবার চা আনিয়ে খেতেন। গোশত খেতে পছন্দ করতেন। ডাল-রুটিও ছিল তাঁর পছন্দের।

 

কাজের মানুষ ছিলেন

বলতে ভালোবাসতেন হুসেনসাব, ‘কর্মই আমার ধর্ম। সকালে ছয় ঘণ্টা আঁকি আর রাতে ছয় ঘণ্টা। বাকি সময় পড়ি। আল্লামা ইকবাল বলতেন, আমল সে জিন্দেগি বনতি হ্যায়। আমার জীবনকেও কাজেই খুঁজে পাওয়া যাবে। কাজই আমাকে শক্তি দেয়, শান্তিও।’ উল্লেখ করার মতো ব্যাপার, এম এফ হুসেন ৪০ হাজার সম্পূর্ণ (ফিনিশড) শিল্পকর্ম দিয়ে গেছেন পৃথিবীকে। ২০১১ সালে তিনি লন্ডনে মারা যান। তাঁর দুই মেয়ে ও চার ছেলে। তাঁর ছেলে ওয়াইস হুসেনও একজন নামকরা শিল্পী।



মন্তব্য