kalerkantho


ডিএসই আছে না!

ওষুধ বা আইনি সহায়তা চাই? কিংবা বিয়ে? ডিএসই আছে। মাঝরাতে রাস্তা হারিয়েছেন? ডিএসই খুঁজে দেবে। সব সমস্যার সমাধান ডিএসই (ডু সামথিং একসেপশনাল) একটি ফেসবুক গ্রুপ। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও ডিএসই। ফেসবুক গ্রুপে সদস্যসংখ্যা দুই লাখ ৯৩ হাজার। খবর নিয়েছেন মাহবুবর রহমান সুমন

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ডিএসই আছে না!

ছবি পরিচিতি : মাশরাফির সঙ্গে শিশিরের দেখা করিয়ে দিয়েছিল ডিএসই। পোস্ট দিয়েছিল শিশিরের বোন দোলন।

ডিএসই যেমন

ধরুন আপনি সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় এসেছেন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। ইন্টারভিউ হবে বসুন্ধরা এলাকায়। আপনি ঢাকা ভালো চেনেন না। আপনাকে এক রাত থাকতেও হবে। শ্যামলী বাসস্ট্যান্ডে নামার পর অচেনা শহরটা আপনাকে ভাবিয়ে তুলল। পুরনো নিয়মে ১০ থেকে ২০ জনকে জিজ্ঞেস করে আপনি বসুন্ধরা এলাকাটা হয়তো খুঁজে পাবেন। কিন্তু গুগল ম্যাপ জানা থাকলে আপনার কষ্ট কিছু কমত। আপনাকে গুগল লোকেশনটা দেখিয়ে দিত। কিন্তু কত খরচে কোন বাসে করে বসুন্ধরা পৌঁছাবেন তা জানাত না। আপনার বাজেটের মধ্যের হোটেলগুলোর তালিকাও ঠিকঠাক দিতে পারবে না। তবে এর জন্য ফেসবুকে আছে একটি গ্রুপ। ওখানে পোস্ট করে আপনি প্রয়োজনীয় সব খবর জেনে নিতে পারবেন। আরো ধরুন রাত গভীর। শরীরে খুব ব্যথা অনুভব করছেন। একজন ডাক্তার দরকার। আপনি পোস্ট দিন। এরপর ধরুন রক্ত দরকার, আইটি এক্সপার্ট দরকার বা দরকার পুলিশের সঙ্গে কথা বলা। অথবা আপনি কোনো অন্যায়ের প্রতিকার চান। পোস্ট দিন ডু সামথিং এক্সেপশনাল বা ডিএসইতে।   

 

যেভাবে সদস্য হবেন

প্রথমে ফেসবুকে লগইন করুন। সার্চ বক্সে গিয়ে ইংরেজিতে লিখুন Do Something Exceptional (DSE)। আপনি গ্রুপটি দেখতে পাবেন। ক্লিক করার পর পাবেন জয়েন গ্রুপ নামের একটি বাটন। বাটনে ক্লিক করার পর ডিএসইর নীতিমালাসংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন পাবেন। সেগুলো যথাযথ উত্তর দেওয়ার পর সেন্ড বাটন ক্লিক করুন। অল্প সময়ের মধ্যেই ডিএসই অ্যাডমিনের নোটিফিকেশন পাবেন, যার অর্থ আপনি এর সদস্য হলেন। এরপর আপনার সমস্যা বা প্রয়োজনীয় তথ্যের কথা লিখুন। অল্প সময়ের মধ্যেই সমাধান পাবেন। কারণ প্রায় তিন লাখ লোক এখানে আপনাকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। আপনি যে বিষয়ে সাহায্য চাইছেন সে বিষয়ে বিশেষ দক্ষ (এক্সপার্ট) লোকও পেয়ে যেতে পারেন। ডিএসই এমন একটি গ্রুপ, যেখানে আপনি আপনার একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যার কথাও বলতে পারেন। মতামত চাইতে পারেন। এমনকি কোনো অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে পারেন।

একটি উদাহরণ

দুই বছর আগের কথা। দোলন আক্তার নামের একজন গ্রুপে পোস্ট দিয়েছিলেন—‘আমার ভাই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন মাশরাফির খুব ভক্ত। সে মাশরাফির সঙ্গে দেখা করতে চায়। কিন্তু বড় সমস্যা হলো, আমার ভাই শিশির অন্যদের মতো স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারে না। সে হুইলচেয়ারে চলাচল করে।’ ডিএসই কিন্তু শিশিরের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়েছিল মাশরাফির।

ডিএসই আরো করে

অনলাইনের বাইরে একটি সামাজিক সংগঠন হিসেবেও কাজ করে ডিএসই। যেমন রিকশাচালকদের জন্য চিকিৎসাশিবির, রমজানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা, ভাষার মাসে বানান শুদ্ধিকরণ ক্যাম্পেইন ইত্যাদি। এ ছাড়া পথশিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম, চাকরি প্রার্থীদের জন্য ডিএসইর আছে ক্যারিয়ার ক্লাব। পাত্র-পাত্রীরও সন্ধান দেয় ডিএসই।

 

 

ডিএসই সবার

ইমন খান

মুখপাত্র, ডু সামথিং এক্সেপশনাল (ডিএসই)

শুরুর কথা বলুন।

গ্রুপের যাত্রা শুরু চার বছর আগে, ১৩ মার্চ। আশফাকুল ইসলাম নামের এক ছোট ভাই শুরু করেছিল। তখন সব গ্রুপই ছিল বলতে গেলে একই রকম। আশফাকুল ব্যতিক্রমী একটা কিছু করতে চেয়েছিল। গ্রুপের নাম রেখেছিল ডেসপারেটলি সিকিং এক্সপ্লিশিট। তখন গ্রুপটা খুব ছোট ছিল। আমি যুক্ত হই ২০১৫ সালে। আমার কাছে গ্রুপটাকে সম্ভাবনাময় মনে হয়েছিল। কারণ এখানকার সদস্যদের মধ্যে একটা কিছু করার আগ্রহ ছিল। এরপর সরকারিভাবে নিবন্ধিত হওয়ার কথা ভাবলাম। কিন্তু নিবন্ধন করাতে গিয়ে নাম নিয়ে ঝামেলা হলো। এক্সপ্লিশিট শব্দটি নিয়েই ছিল আপত্তি। তখন আমরা নাম রাখলাম ডু সামথিং এক্সেপশনাল (ডিএসই)।

 

আপনাদের লক্ষ্যের কথা বলুন। 

অনলাইন কমিউনিটি হিসেবেই আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু গ্রুপটি আকারে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি সদস্যরা বড় কিছু আশা করে। আর এটা শুধু ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। তখন আমরা সংগঠন হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার আবেদন করি। একটি উন্নত সমাজ গঠনে যতভাবে ভূমিকা রাখা যায়, তার সবটাই আমরা করার আগ্রহ রাখি। এক কথায় যদি বলি তো এ রকম বলা যায়—দেশে একটি সচেতন নাগরিক সমাজ গঠনের আগ্রহ রাখি।  আমাদের দেশে একজন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পিছিয়ে আসে এই ভেবে যে আমি গরিব বা আমার শক্তি কম ইত্যাদি। সে ক্ষেত্রে আমরা ভাবলাম, সবাই মিলে বললে  শক্তি বাড়বে। 

 

ডিএসই কিভাবে পরিচালিত হয়?  

ডিএসইর দুটি শাখা হলো গ্রুপ ডিএসই আর অফলাইন ডিএসই। ডিএসইর একটি নীতিনির্ধারণী প্যানেল আছে। প্যানেলের আওতায় কাজ করে একটি নির্বাহী কমিটি। এই কমিটিই অনলাইন প্লাটফর্ম ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন নির্বাচন করে। অ্যাডমিন পরিচালনা করে অনলাইনের কাজগুলো। আর টিম ডিএসই নামে আমাদের যে স্বেচ্ছাসেবক দল আছে, সেটি কাজ করে রক্তদানের মতো কর্মসূচিতে।

 

গ্রুপ ডিএসইর কাজগুলো আরেকটু বিস্তারিত বলুন।

গ্রুপ ডিএসইর সঙ্গে ২০ জন ডাক্তার আছেন। রোগবালাই সম্পর্কে তাঁরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কয়েকজন পুলিশ যুক্ত আছেন গ্রুপে। গ্রুপে কেউ কোনো অন্যায়-অপকর্মের প্রতিকার চাইলে আমরা সেটি তাঁদের নজরে আনি। আইনজীবীও আছেন কয়েকজন। আইনি সহায়তার ব্যাপারে তাঁরা পরামর্শ দেন। তাঁরা সবাই বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দান করেন। আমরা চাইছি সব পেশাগোষ্ঠীর মানুষকে গ্রুপে যুক্ত করতে।

 

গ্রুপে কী ধরনের পোস্ট পান?

ফেসবুকে ভিন্ন ভিন্ন কাজের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ আছে। কিন্তু আমাদের কোনো ক্যাটাগরি নেই। এখানে যেকোনো ধরনের তথ্য ও সাহায্য চাইতে পারেন। ধরুন রাত ১১টায় হতাশাগ্রস্ত একজন মানুষ আত্মহত্যা করতে চাইছে। তাঁর কষ্টের কথাগুলো লিখে সে পোস্ট দিল। গ্রুপের অন্যরা তখন তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করে। নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। ডিএসই তখন স্বপ্ন দেখানোর জায়গায় পরিণত হয়। আবার ধরুন, খুব সকালে নবজাতকের নাম চাইল মা। তখনই কিন্তু সদস্যরা ব্যস্ত হয়ে যায় বাচ্চার নাম দেওয়ার জন্য। ইদানীংকার একটি ঘটনা বলি—প্রবাসে একজন মারা যাওয়ার পর তাঁর লাশ দেশে আনা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তাঁর এক আত্মীয় এ বিষয়ে পোস্ট দেন, আজ আমার চাচা বিশেষ ব্যক্তি নয় বলে কি আমার পরিবার লাশ দেখতে পাবে না? প্রশ্নটি আমাদের গ্রুপের সদস্যদের মনে দাগ কাটে। ফেসবুকে ভাইরাল হয় ঘটনাটি। এতটাই যে শেষ পর্যন্ত সরকারি সহায়তা পাওয়া যায়। তাঁর লাশ দেশে আনার সুযোগ হয়। তাই আমরা বলি, আমরা সব মানুষের সঙ্গে আছি।

 

আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলুন।

নিকট পরিকল্পনা, সব ফেসবুক গ্রুপকে ডিএসইর সঙ্গে যুক্ত করা। আরো পরে দেশের সব ফেসবুক ব্যবহারকারীকে ডিএসইর সঙ্গে যুক্ত করতে চাই। আমরা নিজেরা সবাই একা; কিন্তু ফেসবুকে এই কমিউনিটির মাধ্যমে আমরা অনেক মানুষ একসঙ্গে। আর এই একসঙ্গে অনেক মানুষ চাইলে যেকোনো কিছু করতে পারে। ভূমিকা রাখতে পারে একটি সুন্দর দেশ গঠনে।



মন্তব্য