kalerkantho


লোক নায়ক

গরিবের ডাক্তার

ক্ষেতলালের লোক তাঁকে গরিবের ডাক্তার বলেই চেনে। শুধু চিকিৎসা-পরামর্শ নয়, ওষুধও দেন বিনা মূল্যে। তিনি নজরুল ইসলাম। আলমগীর চৌধুরী দেখা করে এসেছেন

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গরিবের ডাক্তার

হাসিখুশি মানুষটির বাড়ি জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা বজরবরাহী গ্রামে। মধ্যম আয়ের এক কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। গরিব-দুঃখীদের জন্য নিজের বাড়িতেই গড়েছেন সেবাকেন্দ্র। প্রতিদিন অনেক রোগী ভিড় করে। 

 

স্কুলে পড়ার সময়ই

মায়ের ছিল হাঁপানি রোগ। মায়ের কষ্ট দেখে নিজে খুব কষ্ট পেতেন। স্কুলবেলাতেই ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা তাঁর জেগেছিল। সেটা ১৯৮০ সাল। তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। মা মারা গেলেন রোগে ভুগে। নজরুল চাইলেন ডাক্তার হয়ে গরিব মানুষের সেবা করতে। ১৯৮৩ সালে এসএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাস করার পর তিন বছর বগুড়ায় মেডিক্যাল ডিপ্লোমা কোর্স করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি জয়পুরহাট সদরের আদমই ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগ দেন। এরপর কালাইয়ের পুনট ও আক্কেলপুরে কাজ করেছেন। এখন আছেন ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তিনি উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার।  হাসপাতালে যখন থাকেন, তখনো তাঁর ঘরে অনেক রোগী ভিড় করে। যখন নিজের গড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বসেন, তখনো অনেক লোক আসে।

 

রোগীরা তাঁকে পছন্দ করে

নজরুল ডাক্তার সবার সঙ্গেই হাসিখুশি। রোগীরা স্বচ্ছন্দে তাঁর কাছে সব খুলে বলে। সাধারণ রোগীদের তিনি বর্ণনা শুনেই ওষুধ দেন। জটিল রোগের চিকিৎসা তাঁর দ্বারা সম্ভব না হলে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। যাঁরা উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে যান, তাঁরাও ফিরে এসে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। সময় পেলে নজরুল ডাক্তার বাড়ি গিয়েও রোগী দেখে আসেন। হাসপাতালে থাকেন প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। তারপর খেয়েদেয়ে নিজের সেবাকেন্দ্রে বসেন। বললেন, ‘জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের সেবা করে যেতে চাই। বগুড়ায় বাড়ি ছিল। সেটি বিক্রি করে দিয়েছি। ক্ষেতলালেই এখন স্থায়ী। বড় মেয়েকে একটি বেসকারি মেডিক্যালে পড়াচ্ছি। আশা করি মেয়েও ক্ষেতলালেই প্র্যাকটিস করবে।’

 

কয়েকজন রোগীর কথা

লজির উদ্দিনের বয়স ৯০ বছর। বাড়ি খুঞ্জাইল গ্রামে। তাঁর হার্নিয়ার অসুখ। বগুড়ায় বড় ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে অপারেশন করিয়েছেন, কিন্তু ব্যথা সারছে না। মেয়েকে নিয়ে নজরুল ডাক্তারের কাছে এসেছেন। নজরুল ডাক্তার বলেছেন, অপারেশন ঠিকমতো হয়নি, তাই ব্যথা সারছে না। এখন তাই নিয়মিতই আসছেন এখানে। বললেন, ‘নজরুলের চিকিৎসা ছাড়া আমার অসুখ সারে না।’ দামগড় গ্রাম থেকে এসেছেন গৃহবধূ নাজমা বেগম। তাঁর নাতির বয়স চার মাস। ঠাণ্ডা সারছে না। বললেন, ‘আমাদের নজরুল ডাক্তারই ভরসা।’

ভাশিলা গ্রামের শ্রমিক আবুল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে পেটের পীড়ায় ভুগছিলেন। নজরুল ডাক্তারের চিকিৎসায় ভালো হয়েছেন। এখন খুব দুর্বল বোধ করছেন বলে এসেছেন। কালাই উপজেলার করিমপুর গ্রামের গৃহবধূ দোলন বেগম বলেন, ১৫ বছর ধরে নজরুল ডাক্তারের চিকিৎসা নিচ্ছি। আমাদের মতো গরিবদের কাছ থেকে তিনি কোনো ভিজিট নেন না।’

 

উপজেলা চেয়ারম্যান বললেন

ক্ষেতলাল উপজেলা চেয়ারম্যান রওনকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জয়পুরহাটের সবচেয়ে অবহেলিত ও অনগ্রসর উপজেলা ক্ষেতলাল। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সেই কৃষির অবস্থাও এখন  নাজুক। সাধারণ মানুষের দুবেলা পেট পুরে খাওয়ার সুযোগও নেই। আর উন্নত চিকিৎসা তো অনেক দূরের কথা। ডা. নজরুল এখানে অসহায়ের সহায়। মানুষটা নিরহংকারী ও নির্লোভ। দীর্ঘ দিন থেকে ক্ষেতলালের দরিদ্র মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তাঁর কাছে ঋণী। ক্ষেতলাল ডায়াবেটিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ আজিজুল হক বলেন, এলাকার অসহায় মানুষকে শুধু সাধারণ চিকিৎসাই নয়, প্রতিদিন তাঁর পরামর্শে অনেক রোগী আসে ডায়াবেটিক সমিতিতে চিকিৎসা নিতে।

 

নজরুল ইসলাম বললেন

ছোটবেলায় অ্যাজমা রোগে মায়ের কষ্ট দেখে সিদ্ধান্ত নিই ডাক্তার হওয়ার। ডাক্তার হয়েছি, তবে পাস করা বড় ডাক্তার হতে পারিনি। মার কথা মনে পড়লে এখনো দুই চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। মা চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। মার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য চেম্বারে বড় করে ছবি টাঙিয়ে রেখেছি। শহরের চিকিৎসাব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অথচ আমাদের ক্ষেতলালের বেশির ভাগ মানুষ গরিব। তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আমার চিকিৎসা পেয়ে রোগীরা খুশি হলে খুব ভালো লাগে। মন ভরে। যত দিন সুস্থ আছি, সেবা দিয়ে যাব।

ছবি : লেখক



মন্তব্য