kalerkantho


পুরো পাতা প্রেম

সঙ্গী তাঁর গাছপাখালি

মেহেরপুর পৌর ডিগ্রি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যার শিক্ষক মাসুদ রেজাকে লোকে গাছবন্ধু বলে ডাকে। পাখিরও বন্ধু তিনি। সব মিলিয়ে একজন প্রকৃতিপ্রেমী। ইয়াদুল মোমিন গল্প করে এসেছেন তাঁর সঙ্গে

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সঙ্গী তাঁর গাছপাখালি

কলেজে গাছ পরিচর্যা করছেন মাসুদ রেজা

মেহেরপুর পৌর কলেজের বয়স ১৭। সমান দিন ধরে কলেজ ক্যাম্পাস গাছ দিয়ে সাজিয়ে চলেছেন মাসুদ রেজা। নিড়ানি বা কোদাল হাতেই তাঁকে দেখা যায় বেশি। এই ঘাস কাটছেন তো ওই গর্ত খুঁড়ছেন। রেজা বলেন, ‘গাছ লাগানো সহজ। অনেকেই গাছ লাগান। কিন্তু শুধু লাগালেই চলবে না, পরিচর্যা করতে হবে। তবেই গাছ জীবন পাবে। মানুষের জীবন বাঁচাবে।’

 

একজন মাসুদ রেজা

মেহেরপুর সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিষয়ে। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) বিষয়ে সার্টিফিকেট কোর্স করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির (বিএনজিএস) আজীবন সদস্য।

 

রেজার গবেষণা

৩২১টি ঔষধি গাছ নিয়ে গবেষণা করছেন। লিখে রাখছেন গাছগুলো কোথায় মেলে, কী কী ঔষধি গুণ আছে তাদের ইত্যাদি। তিনি চান, তাঁর গবেষণাপত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত হোক। তিনি বলছেন, ‘যে ৩২১টি প্রজাতি আমার গবেষণার অংশ, তার মধ্যে তৃণজাতীয় গাছ ১২৫টি। এর মধ্যে মেহেরপুরে সচরাচর মেলে ৬৪টি, ঝুঁকির মধ্যে আছে ১৪টি, আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে ১৩টি, বিপন্ন প্রায় পাঁচটি। আর গুল্মজাতীয় গাছ রয়েছে ৮৫টি। এর মধ্যে ১৩টি আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে, বিপন্নপ্রায় একটি। বৃক্ষজাতীয় রয়েছে ৫৯ প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে ১১টিই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। আর লতাজাতীয় গাছ আছে ৫২টি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে ১৫টি, বিপন্নপ্রায় দুটি।’ এ ছাড়া মাসুদ রেজা মেহেরপুরে বিলুপ্ত কিছু গাছ সংরক্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন।  

 

রেজার গবেষণাগার

কলেজ ক্যাম্পাসটিই রেজার গবেষণাগার। তিনি একে বোটানিক্যাল গার্ডেনে রূপ দিয়েছেন বলা যায়। অনেকের ভাষ্য, এটি একটি সংরক্ষিত বাগান। বনজ, ফলদ, ঔষধি ও দৃষ্টিনন্দন ৫০০ প্রজাতির গাছ আছে এ ক্যাম্পাসে। ঔষধি গাছের মধ্যে আছে অর্জুন, হরীতকী, বহেড়া, ফলসা, ডেওয়া, অশোক, হিজল ইত্যাদি। ফুলগাছ আছে—পলাশ, জারুল, মহুয়া, দেবকাঞ্চন, শ্বেতচাঁপা, কাঁঠালিচাঁপা, মাধুরীলতা, নীলমণিলতা, গোল্ডেন শাওয়ার ইত্যাদি।

 

ক্যাম্পাসটি পাখিদেরও

রেজা ক্যাম্পাসের গাছগুলোতে কলস ঝুলিয়ে দিয়েছেন, পাখিদের যেন থাকার জায়গার অভাব না হয়। রেজা বলেন, গাছ আর পাখির সঙ্গে বেড়ে উঠছে আমাদের শিক্ষার্থীরা। দোয়েল, মৌটুসি, ভাতশালিক, মাঠশালিক, গাঙশালিক, খুড়ুলে পেঁচা, তিলা ঘুঘু, বুলবুলি, সিপাহি বুলবুলি, কানাকুয়া, বসন্তবৌরি, সাতভাই, হুদহুদ, সুইচোরাসহ অনেক পাখি নিরাপদ আবাস খুঁজে পেয়েছে এ ক্যাম্পাসে।

 

আরো যারা আছে

কলেজ ক্যাম্পাসে একটি চৌবাচ্চা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তিনটি কচ্ছপ, কোলাব্যাঙ আর মাছরাঙার খাবার হিসেবে কিছু মাছ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ক্যাম্পাসে প্রজাপতি, কাঠবিড়ালি, গুইসাপ, চামচিকা ও বাদুড়ও দেখতে পাবেন। রেজা বলেন, ‘প্রথমদিকে যখন কলেজের মালির সঙ্গে প্রতিদিন বিকেলে গাছের পরিচর্যা করতাম অনেকেই আমাকে পাগল ভাবত। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আমি ক্লাস নেওয়ার জন্য যেমন সময়মতো হাজির থাকি, তেমনি পাখি ও গাছের জন্যও বরাদ্দ করেছি বিকেলবেলাকে। একটি গাছ যেন আমার একটি সন্তান। আমি গুগল আর্থ ব্যবহার করে ঔষধি গাছ সংগ্রহ করি। সাধারণত সড়কের ধারে এসব গাছ পাওয়া যায়। তাই মেহেরপুরের সড়কগুলো চিহ্নিত করতে গুগল আর্থ সহায়ক হয়েছে।’ 

 

যাঁরা প্রেরণা জুগিয়েছেন 

কলেজের অধ্যক্ষ একরামুল আযীম, গাংনী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক (অব.) এনামুল আযীম, মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক প্রয়াত প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া এবং মাসুদ রেজার স্ত্রী ও কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক নাজমা পারভীন।

এনামুল আযীম বলেন, ‘মাসুদ রেজা মেহেরপুর নয়, সারা বাংলাদেশের সম্পদ। তাঁর মতো নিঃস্বার্থ প্রকৃতিপ্রেমী বেশি পাবেন না।’ একরামুল আযীম বলেন, ‘মাসুদ রেজা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসকে সবুজ করে চলেছেন। আমরা কলেজ ফান্ড থেকে যতটা পারি দিই। আসলে তিনি নিজের পকেট থেকেই বেশি খরচ করেন।’

 

একজন শিক্ষার্থী ও কলেজ স্টাফ

দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাসিমুল জুনায়েদ বলেন, ‘মাসুদ স্যার নিঃস্বার্থ প্রকৃতিপ্রেমী। আমরা অনেক গাছ চিনতাম না। গাছের উপকারিতাও জানতাম না। স্যার জানিয়েছেন।’

কলেজের অফিস সহকারী মো. বাবলু খান বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেক গাছ, অনেক পাখিও স্যারের কথা বুঝতে পারে। স্যার ইশারা করলে পাখিরা কাছে চলে আসে। স্যার ক্যাম্পাসের গাছগুলোর ফল পাখিদের জন্য রেখে দেন।’



মন্তব্য