kalerkantho


ফিরে দেখা

টুকিটাকি টাইটানিক

২০ বছর আগে ১৯৯৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর মার্কিন মুলুকে মুক্তি পেয়েছিল টাইটানিক। হৃদয় কেড়েছিল কোটি দর্শকের, বিশেষ করে রোজ আর জ্যাকের কথা মনে পড়বে অনেকেরই। টাইটানিক ছবির কিছু জিনিসপত্রের খবর জোগাড় করেছেন আহনাফ সালেহীন ও রিদওয়ান আক্রাম

৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



টুকিটাকি টাইটানিক

জ্যাক আর রোজের পরিচয়

টাইটানিক মুভির দুই প্রধান পাত্র-পাত্রী জ্যাক আর রোজ। জ্যাক আঁকিয়ে। কয়েক বছর ইউরোপে ভবঘুরে হয়ে ছিল। ফিরে যাচ্ছিল আমেরিকায়। রোজ ফিলাডেলফিয়ায় তাদের বাড়িতে ফিরছিল মা ও হবু বরের সঙ্গে। সে কিছুটা খামখেয়ালি। পরিচালক ক্যামেরন বলছিলেন, তৃতীয় শ্রেণির যাত্রী জ্যাক আর প্রথম শ্রেণির রোজের মিলন প্রায় অসম্ভব ছিল। আমরা চাইছিলাম হৃদয় দিয়ে ইতিহাস দেখাতে। চাইছিলাম শ্রেণিবৈষম্যে আঘাত করতে। শেষে কিন্তু তৃতীয় শ্রেণির জ্যাকেরই জয় হয়। সে নিজের জীবন বাজি রেখে রোজের জীবন বাঁচিয়েছে। জ্যাক চরিত্রে ক্যাপ্রিওকে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। তিনি দারুণ প্রাণশক্তিসম্পন্ন একজন অভিনেতা। আর কেটের মধ্যে সজীবতা আপনি পাবেন তাঁর চোখমুখ, এমনকি কণ্ঠস্বরেও।

 

ইতিহাসের টুকিটাকি

টাইটানিক ডুবেছিল : ১৫ এপ্রিল ১৯১২

মারা যায় : ১৫০০ লোক

রওনা হয়েছিল : ১০ এপ্রিল ১৯১২

রওনা হওয়ার স্থান : সাউদাম্পটন, ইংল্যান্ড। যাচ্ছিল নিউ ইয়র্ক।

ডুবে যাওয়া টাইটানিক খুঁজে পাওয়া যায় : ১৯৮৫ সালে। ড. রবার্ট ব্যালার্ডের নেতৃত্বে একটি দল অনুসন্ধান চালিয়ে ১২ হাজার ৩৭৮ ফুট সাগরের নিচে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়।

 

টাইটানিক মুভি থেকে কিছু

সত্যিকারের চরিত্র : বয়স্ক রোজের চরিত্রে অভিনয় করেছেন গ্লোরিয়া স্টুয়ার্ট। তিনি ১৯১২ সালে ডুবে যাওয়া টাইটানিকের যাত্রী ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তাঁর বয়স ছিল ৮৭ বছর। তিনি ২০১০ সালে ১০০ বছর বয়সে মারা যান।

রোজ চরিত্রে যাঁদের ভাবা হয়েছিল : গিনেথ প্যালট্রো প্রায় নির্বাচিতই হয়ে গিয়েছিলেন। তালিকায় আরো ছিলেন নিকোল কিডম্যান, ম্যাডোনা, জোডি ফস্টার, শ্যারন স্টোন।

জাহাজটিকে ডোবানো হয়েছিল : কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ড উপকূল থেকে ৪০০ মাইল দূরে এবং আড়াই মাইল গভীরে। ক্যামেরন বলেন, এর আগে পানির এত গভীরে ক্যামেরা পাঠানো হয়নি। আমরা প্যানাভিশনের সঙ্গে বিশেষ একটি ক্যামেরা তৈরির জন্য কাজ করেছিলাম। এ সময়ের শুটিংয়ে আমরা কেলডিশ নামের একটি রুশ সায়েন্টিফিক ভেসেল ব্যবহার করেছি।

 

রোজের ছবি

টাইটানিক মুভিতে জ্যাককে (লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও) একটি ছবি আঁকতে দেখা গেছে। রোজ ছিল (কেট উইন্সলেট) তাঁর মডেল। সে ছবিটিই ডুবে যাওয়া টাইটানিকের জঞ্জালের মধ্যে রত্নসন্ধানী লোভেট খুঁজে পেয়েছিল। রোজের গলায় তখন হার্ট অব দ্য ওশান হীরার নেকলেসটিও ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে পরে ছবিটি নিলামে তুলেছিল ইউএস স্পেশালিস্ট কম্পানি। বিক্রি হয়েছিল ১০ হাজার পাউন্ড দামে। ছবিটি কিন্তু আসলে এঁকেছিলেন টাইটানিক পরিচালক জেমস ক্যামেরন।

 

দ্য হার্ট অব দ্য ওশান

একটি নীল হীরার নাম। হোপ ডায়মন্ড বলেও চেনে অনেকে। রোজের  গলার হারে ছিল। সিনেমায় দেখা যায় ব্রক লোভেট (বিল প্যাক্সটন অভিনয় করেছেন) নামের একজন রত্নসন্ধানী ডুবে যাওয়া টাইটানিকে হীরাটি সন্ধান করছিল। লোভেটের ভাষ্যমতে, হীরাটি ছিল রাজা ষষ্ঠদশ লুইয়ের। ফরাসি বিপ্লবের সময় (১৭৯৩ সালে লুইয়ের শিরশ্ছেদ করা হয়) একে হৃদয় আকৃতিতে কাটা হয়। লোভেটের দল একটি আঁকা ছবি খুঁজে পায়। ছবির মানুষটির গলায় হারটি দৃশ্যমান ছিল। টিভিতে এবিষয়ক তথ্যচিত্র দেখে এক বৃদ্ধ মহিলা (গ্লোরিয়া স্টুয়ার্ট) লোভেটের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মহিলা নিজেকে ছবির মানুষ মানে রোজ বলে দাবি করেন। লোভেট রোজের বাটারফ্লাই ক্লিপটিও (চুল আটকে রাখার জন্য) খুঁজে পেয়েছিলেন। গ্লোরিয়া স্টুয়ার্টকে ধরেই পরিচালক মুভিটিকে ১৯১২ সালে ফিরিয়ে নিয়ে যান। ছবিতে দেখা যায় বিলি জেন (চরিত্রের নাম ক্যালডন হকলি) হারটি কিনেছিলেন টাইটানিকে ওঠার মাত্রই সপ্তাহখানেক আগে। বাগদত্তা রোজকে উপহার দেওয়ার উদ্দেশেই কেনা। ‘টাইটানিক’ ছবির জন্য নেকলেসটি তৈরি করে দিয়েছিল লন্ডনের অলংকার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাসপ্রে অ্যান্ড কোং। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের (শাসনকাল ১৯০১ থেকে ১৯১০) আমলের বৈশিষ্ট্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই নেকলেস। মোট তিনটি নেকলেস তৈরি করা হয়েছিল। দুটি ছবিতে ব্যবহৃত হয়, আরেকটি হয়নি। উল্লেখ্য, সত্যিকারের হোপ ডায়মন্ডটি এখন ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামে আছে।

 

 

রোজের চুলের প্রজাপতি কাঁটা (বাটারফ্লাই হেয়ার কম্ব)

টাইটানিকের শুটিং চলছিল মেক্সিকোয়। ব্রিটেনে বানানো হয়েছিল ছবির টুকিটাকি অনেক কিছু। চুলের কাঁটাও তৈরি হয়েছিল ব্রিটেনে এবং কাছিমের খোল (টরটয়েস শেল) দিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যিনি (এজেন্ট) কাঁটাটা মেক্সিকোয় নিয়ে আসছিলেন তিনি ছাড়পত্র নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। তাই কাস্টমস ছাড় দিচ্ছিল না। কাঁটাসহ হাতির দাঁত ও কাছিমের খোল দিয়ে বানানো প্রায় ৩০টি জিনিস আটক করেছিল কাস্টমস। যাইহোক ছবিতে দুটি কাঁটার ব্যবহার দেখা যায়। একটি রোজ যখন জ্যাকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। আরেকটি ছিল ভাঙা মানে লোভেটের খুঁজে পাওয়া। পরেছিল বৃদ্ধ রোজ।

 

জেমস ক্যামেরন, কেন মার্শাল ও ডন লিনচ

টাইটানিক গবেষকেরা

ডন লিথ্য এবং কেন মার্শালের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল দারুণ ব্যাপার জেমস ক্যামেরনের জন্য। লিনচ যুবা বয়সেরই টাইটানিক ডুবে যাওয়া ও তার যাত্রীদের নিয়ে কাজ করছিলেন, পরে টাইটানিক হিস্টরিক্যাল সোসাইটিতেও যোগ দিয়েছিলেন। মার্শাল একজন শিল্পী, যিনি টাইটানিক : অ্যান ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি নামের বই প্রকাশ করেছেন। লিনচ বলছিলেন, টাইটানিকের বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের অনেকেই ছিলেন তরুণ যুবা। আমি আশাবাদী ছিলাম কেউ কেউ হয়তো বেঁচে থাকবেন। তাঁদের খোঁজা শুরু করলাম, গল্প শুনতে লাগলাম এবং টাইটানিক বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছিলাম। মার্শালের আঁকা টাইটানিকের ছবিগুলো সর্বজনের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। ড. ব্যালার্ডের সঙ্গে দেখা হওয়াটাও একটি দারুণ ব্যাপার ছিল। সম্ভবত সেটি ১৯৭৬ সালে। দ্রুতই আমরা বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা সবাই টাইটানিকপ্রেমী। ক্যামেরন মার্শালের ছবিগুলো দেখে দারুণ খুশি ছিলেন। ওই ছবিগুলো তাঁকে টাইটানিক পর্দায় জীবন্ত করতে উৎসাহিত করেছে। ছবিটির জন্য ক্যামেরনের দল পাঁচ বছর খাটুনি দিয়েছে। আমি আর মার্শাল ক্যামেরনের সঙ্গে দেখা করেছিলাম শুরুর দিকেই। আমরা খেয়াল রাখছিলাম ছবিটি যেন ইতিহাসবিচ্যুত না হয়। এর প্রতিটি জিনিস, পোশাক, আসবাব, অলংকার, সজ্জা—সব কিছুতেই আমরা মতামত দিতে পেরেছিলাম। ফলে হোয়াইট স্টার লাইন ডকটি যখন সত্যি সত্যি ১৯১২-এর সময়ে ফিরে গেল আমরা খুশিতে নেচে উঠেছিলাম। ষাটের দশক থেকে এই ডকটিকে আমি কল্পনায় দেখেছি অনেকবার। বাস্তব রূপ পেলে আমরা বাকহারা হয়ে গিয়েছিলাম।


মন্তব্য