kalerkantho


ও আমার দেশ

চরকিতে বিজয়গাথা

ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ একই পরিবারের চারজন মিলে চালায়। আরো কিছু খেলনা তারা তৈরি করে, তবে বেশি করে চরকি। চরকি তারা বানায় বাংলাদেশকে বিষয় করে। মহান বিজয় দিবস নামের একটি চরকিও করে তারা। গল্প করে এসেছেন মাহবুবর রহমান সুমন

৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চরকিতে বিজয়গাথা

লালবাগ শহীদ নগরের ৩ নম্বর গলির ২৩০ নম্বর বাড়িতে থাকে তাঁরা। দুই ভাই মোহাম্মাদ রফিক ও মোহাম্মাদ জসিম। মা আর বোনও থাকেন সঙ্গে। সবাই মিলে চরকি বানান। চরকি বানানোই তাঁদের পেশা। ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজটিও এই বাড়িতে। দুই ভাই মালিক, তাই নাম ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ।

 

যেভাবে শুরু

মাদারীপুর থেকে ২০ বছর আগে বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় আসেন মোহাম্মাদ রফিক। রফিক অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পেরেছিলেন। তারপর রোজগারে নামতে হয়। পাঁচ বছর দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছেন। মেলায় মেলায় জিনিসপত্র বিক্রি করেছেন। কিছু টাকা জমতে সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেদের প্রতিষ্ঠান করবেন। পুঁজি কম, তাই চরকি বানানোর কথাই মাথায় আসে। সুখের ব্যাপার, ছয় মাসের মধ্যেই লাভের দেখা পান। তারপর ব্যবসা বাড়ানোর চিন্তা করেন। গ্রাম থেকে ছোট ভাই, বোন ও মাকে নিয়ে আসেন ঢাকায়। চারজনের থাকা আর কাজের জায়গা হয়ে যায়, এমন একটি বাসা ঠিক করলেন। আজ দেড় বছর হলো ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের বয়স। 

 

প্লাস্টিকের চরকি বেশি

চরকি কাগজের হয়। এখন প্লাস্টিকের তৈরি চরকি বেশি পাওয়া যায়। একটি কাঠির মাথায় ফুলের পাপড়ির মতো পাঁচ বা সাতটি প্লাস্টিকের

 

টুকরো আটকানো থাকে। বাতাসে ধরলে ভনভন করে ঘোরে। রফিক বললেন, প্রথমে নকশার কথা ভাবি। তারপর সেইমতো বাজার থেকে প্লাস্টিক, আঠা এবং আর যা যা লাগে কিনি। চেনা একটি ছাপাখানা আছে। সেখানে নিয়ে নকশার কাগজ ছেপে আনি। তারপর মা, বোন, ভাইকে নিয়ে চরকি বানাতে লেগে যাই।’

 

চরকিতে বাংলাদেশ

ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের চরকি বাজারের আর সব চরকি থেকে আলাদা। এর প্রায় সব চরকিতেই আছে বাংলাদেশ। শহীদ মিনার, সাভারের স্মৃতিসৌধ, লালবাগ কেল্লা, দোয়েল পাখি, শাপলা ফুল, ইলিশ মাছ, পহেলা বৈশাখ, স্টেডিয়ামে টাইগার সমর্থক, হাসিমুখের মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক ভাই ভাইয়ের চরকির  মান বাড়ায়। বাংলাদেশের পতাকার রঙে একটি চরকি করে তারা। এবারও করছে। তার গায়ে লেখা ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস।

 

চরকিতে ইতিহাস

২১ বছর আগে মোহাম্মাদ রফিক ও মোহাম্মাদ জসিমের বাবা আবুল ফকির মারা যান। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তাঁরা, দেশ নিয়ে ভাবনা অনেক। তাই সামর্থ্যের সবটুকু দিয়েই চেষ্টা করেন রফিক আর জসীম। রফিক বললেন, চরকি নিয়ে খেলে বেশি বাচ্চারা। বড়দের তো জানার অনেক মাধ্যম আছে। কিন্তু ছোটরা খেলতে খেলতেই শেখে। চরকিতে বিজয় দিবস, মাতৃভাষা দিবস, দোয়েল পাখি রাখি, যেন বাচ্চারা আগ্রহী হয় দেশ সম্পর্কে। শহীদ মিনার দেখলে বাচ্চা হয়তো মায়ের কাছে জানতে চাইবে, এটা কী? মাশরাফিকে চিনলে তেমন মানুষ হতে আগ্রহী হতে পারে। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, আমাদেরও দেশকে দেওয়ার আছে। তাই ক্ষমতায় যতটা কুলায় সবটা দিয়েই চেষ্টা করি।’

 

বেচাবিক্রি

প্রতিদিন প্রায় ৫০০ চরকি তৈরি করে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ। সেগুলো বিক্রি করা হয় হকারদের কাছে। একটা চরকি চার টাকা। ব্যবসা কেমন চলে—জানতে চাইলে রফিক বললেন, ‘ডিসেম্বর মাসে বিক্রি বেশি হয়। বিক্রি বাড়ে মার্চ মাসেও।’

 

ছবি ; লেখক


মন্তব্য