kalerkantho


যুদ্ধজাহাজে দুই দিন

২৮ ও ২৯ নভেম্বর গভীর সমুদ্রে যুদ্ধ জাহাজের মহড়া হয়। ‘মাল্টিল্যাটারাল মেরিটাইম সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ এক্সারসাইজ’ (ইমসারেক্স) নামের এই মহড়ায় অংশ নেয় ভারত, ইরান, চীন, ইন্দোনেশিয়ার আটটি ও বাংলাদেশের ৩৩টিসহ মোট ৪১টি যুদ্ধজাহাজ। একদল সাংবাদিকেরও যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল সেই মহড়ায়। সেই দলের সঙ্গে গভীর সমুদ্র ঘুরে এসেছেন ওমর ফারুক

৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



যুদ্ধজাহাজে দুই দিন

সমুদ্রে বিমান বা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলে কিভাবে নৌবাহিনী উদ্ধার করবে, জাহাজ বা ট্রলারে আগুন লাগলে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কোনো ব্যক্তি সমুদ্রে নিখোঁজ হলে কিভাবে উদ্ধার করা যাবে—এসব বিষয়েই মহড়া করবে। মহড়া দেখার জন্য একদল সাংবাদিক ঢাকা থেকে যাই কক্সবাজার। ২৭ নভেম্বর রাতে তিন ভাগে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় বিএনএস বঙ্গবন্ধু, বিজয় ও সমুদ্র অভিযান নামের তিনটি বাংলাদেশি যুদ্ধজাহাজে।

সৈকতের দিকে সমুদ্রের গভীরতা কম থাকায় বিএনএস বঙ্গবন্ধু নোঙর করে ইনানী বিচের দিকে সৈকত থেকে ৮-৯ কিলোমিটার দূরে। ২৭ নভেম্বর রাত ১২টার পর আমাদের উঠানো হয় মেটাল সার্ক বোটে। ১৫ জন একসঙ্গে বসি। একে তো জীবনে প্রথমবার, তার ওপর মধ্যরাত!

যাচ্ছি সমুদ্রের বুকে। ভয় ও রোমাঞ্চ কাজ করছিল মনে। মেটাল শার্ক বোট চলা শুরু করল ধীরে ধীরে। ভাবলাম জাহাজে পৌঁছতে ঘণ্টাখানেকের বেশি লাগবে। কিছুক্ষণ পর এর গতি এত বাড়ল যে সমুদ্র চিড়ে লাফিয়ে চলল সামনের দিকে। চালকের পাশেই আমি। ভয় পাচ্ছি বুঝতে পেরে একজন জানান, এখন পর্যন্ত এগুলো ডোবার রেকর্ড নেই।

আধ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বিএনএস বঙ্গবন্ধুর কাছে। বিশাল জাহাজ। ৩০-৪০ ফুট উঁচু। জাহাজে উঠতে হবে চিকন সিঁড়ি দিয়ে। ঢেউয়ের কারণে মেটাল শার্ক সিঁড়ির কাছে পৌঁছাতে পারছে না। শেষে নৌবাহিনী ও মেটাল শার্কের সদস্যরা রশি দিয়ে টেনে এক করলেন। ১৫ জন একে একে উঠে যাই বঙ্গবন্ধুতে। রাত থাকায় পুরো জাহাজটি তখনো দেখার সুযোগ মিলেনি। নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানালেন, জাহাজটি লম্বায় ৩৪০ ফুট। সমুদ্রে চলতে পারে ৪৬ কিলোমিটার বেগে। রয়েছে হেলিপ্যাডও।

২৮ নভেম্বর সকাল ৬টায় রওনা দিই গভীর সমুদ্রের দিকে। লেফটেন্যান্ট ওয়ালী মেহফুজ ব্রিফ করে জানান, জাহাজে আমরা কী করতে পারব, কী পারব না।

এ জাহাজের আশপাশে আরো ৪০টি জাহাজ। সবাই যাছে গভীর সমুদ্রে। কক্সবাজার সৈকত থেকে ২০০ কিলোমিটারের বেশি যাওয়ার পর নীল পানিতে দেখা মেলে ডলফিন ও ফ্লাই ফিশের।

জাহাজের কারো সঙ্গে পরিচয় ছিল না। তবে নৌবাহিনীর সবাই বেশ আন্তরিকতা দেখালেন। সাব লেফটেন্যান্ট রিফাত আহমেদ কিছুক্ষণ পর পর মহড়ার নানা বিষয়ে ধারণা দিলেন।

ক্যাপ্টেন ও জাহাজের কমান্ডিং অফিসার সাইফ উল ইসলাম, কমান্ডার আশিকুজ্জামান, মইনুল ইসলাম চৌধুরী, লে. কমান্ডার সালমান হাসান, লেফটেন্যান্ট ডা. সাইদুজ্জামান সাঈদ, মিরাজ, সাব-লেফটেন্যান্ট তানজীম জাহিনসহ সবাই শোনালেন গভীর সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজে থাকার গল্প। সিও সাইফ উল ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে এমনভাবে মিশেছিলেন, মনেই হচ্ছিল না যে তাঁর সঙ্গে নতুন পরিচয়।

একটা বিষয় লক্ষ করলাম, জাহাজে দায়িত্বরতদের এক মিনিটও বিশ্রামের সুযোগ নেই। তারা দিনের পর দিন যুদ্ধজাহাজ নিয়ে পড়ে থাকেন গভীর সমুদ্রে। যেখানে নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট সংযোগ, টেলিভিশনও। এক সদস্য জানালেন, যুদ্ধজাহাজে দায়িত্ব পালন মানে মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস। একদিকে শত্রু মোকাবেলার প্রস্তুতি রাখতে হয়, অন্যদিকে সমুদ্র উত্তাল হলে জাহাজ এত দোলে যে খাওয়াও যায় না। খেয়েও লাভ হয় না, বমি করে দিতে হয়। তখন জাহাজ এত দোলে, টেবিলের ওপর একটি প্লেট বা গ্লাস রাখার উপায় থাকে না।

২৯ নভেম্বর সকালে জাহাজ পৌঁছে কক্সবাজার তীর থেকে প্রায় ২৫০ মাইল গভীর সমুুদ্রে, ভারত মহাসাগরের কাছাকাছি। রওনা দেওয়ার সময় দেখেছিলাম ঘোলা পানি, কিন্তু শখানেক মাইল যাওয়ার পরই বদলে গেল পানির রং। নীল পানি। তেমন ঢেউ নেই। পদ্মা-মেঘনার মতো ঢেউ। কর্মকর্তারা জানালেন, নভেম্বরে সমুদ্র শান্ত থাকে। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত থাকে খুবই উত্তাল ও ভয়ংকর।

জাহাজ বঙ্গবন্ধুর পেছনের দিকটায় হেলিপ্যাড। সেখানে একটি হেলিকপ্টার। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হেলিকপ্টার উড়িয়ে মহড়ার ছবি তোলা হবে বলে জানানো হলো। নেভির দুজন তরুণ পাইলট হেলিকপ্টারে চেপে বসলেন। উড়ে চলে গেলেন অন্য জাহাজের ওপর। নামতে হবে চলন্ত জাহাজে। জাহাজটি ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার বেগে চলছে। সমান তালে উড়িয়ে কপ্টারটি ল্যান্ড করান পাইলট। এদিক-সেদিক হলে নিশ্চিত সমুদ্রে।

২৯ নভেম্বর দুপুরে গভীর সমুদ্রে দেখা গেল একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আগুনের শিখা। আগুন লাগার সংকেত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে চলে যায় আইওএনএস (ইন্ডিয়ান ওশান নেভাল সিম্পোজিয়াম)-এর কাছে। কাছাকাছি থাকা যুদ্ধজাহাজকে নির্দেশ দেওয়া হয় আগুন নেভানোর। এ সময় ভারতের যুদ্ধজাহাজ রণবীর, বাংলাদেশের ফ্রিগেট বিজয় ও ধলেশ্বরী এগিয়ে যায়। পাইপের মাধ্যমে পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। মনে হচ্ছিল যুদ্ধ নয়, আগুন নিভিয়ে এই মহড়ার মাধ্যমে যেন শান্তির বারতা দিচ্ছিলেন যুদ্ধজাহাজের সাহসী নৌসেনারা।



মন্তব্য