kalerkantho


১৯৭১ পিতার যুদ্ধ, ২০১৭ পুত্রের কাছে

আমি সৈয়দ আব্দুল আওয়াল সাভার কলেজে বাংলা পড়াই। জন্ম ও বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইলে। আমার আব্বা একজন মুক্তিযোদ্ধা। ছোটবেলায় তাঁর মুখে যুদ্ধের কথা শুনেছি অনেক। এবার ইচ্ছা হলো যুদ্ধটা দেখে আসি সঙ্গে করে। দিনটা ছিল ৪ ডিসেম্বর

৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



১৯৭১ পিতার যুদ্ধ, ২০১৭ পুত্রের কাছে

ভোর সাড়ে ৬টায় সাভার থেকে টাঙ্গাইলের বাস ধরলাম। আলোকচিত্রী রনি আমার সঙ্গী। আব্বাকে আগের রাতেই ফোনে জানিয়েছিলাম আমার উদ্দেশ্য। আব্বা তাই সেদিন নিজের কাজগুলো বাতিল করেছিলেন।

 

আমার আব্বা

সৈয়দ আব্দুল হামিদ বজলু। ১৯৫১ সালের ২৯ জানুয়ারি জন্ম। ১০ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। ১৯৬৭ সালে করটিয়ার এইচ এম ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন করটিয়া সা’দত কলেজে। সেখানে সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলেন বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী (বীর বিক্রম)-কে। তাঁর হাত ধরেই যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সনদ নম্বর, ম-৯৯৭৫১।

 

আমাদের যুদ্ধ শুরু

৮টার আগেই পৌঁছে যাই করটিয়ায়। মোটরবাইক নিয়ে আব্বা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। করটিয়া থেকে বাসাইল যাওয়ার পথে পড়ল নথখোলা ব্রিজ। ব্রিজের পূর্ব পাড়ের দক্ষিণ পাশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। সাড়ে ৮টায় আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম স্তম্ভের পাদদেশে। হেমন্তের রোদ ঝিকমিক করছে চারদিকে। আব্বা মেলে ধরলেন স্মৃতির পাতা—বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল ছিল টাঙ্গাইলও। ৭ই মার্চে আমরা কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগ দিই রেসকোর্স ময়দানে। টাঙ্গাইলে আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব ছিল আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর (কাদের সিদ্দিকীর বড় ভাই, তখন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য) ওপর। ১৮ মার্চ তাঁর নেতৃত্বে আমরা টাঙ্গাইল জেলখানার ফটক উন্মুক্ত করে দিই। ২৫ মার্চের পর পাকিস্তান বাহিনী যখন জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে তখন টাঙ্গাইলে প্রথম বাধা পায় আসিমতলায়। সাবেক ইপিআর আর বেঙ্গল রেজিমেন্টের পলাতক সৈন্যরা কিছু স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে এই প্রতিরোধ গড়েছিলেন। প্রতিরোধ ভেঙে পাকিস্তান বাহিনী প্রবেশ করে শহরে। আমরা গিয়ে জমায়েত হই সখীপুর পাহাড়ে। সেখানে লতিফ সিদ্দিকী কাদের সিদ্দিকীকে টাঙ্গাইলের সামরিক প্রধান আর আনোয়ার আলম শহিদকে বেসামরিক প্রধান ঘোষণা করেন। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে কাদেরিয়া বাহিনী।

 

আব্বার ট্রেনিং ক্যাম্প

‘সখীপুর আর শালগ্রামপুর পাহাড়ে গড়ে উঠে আমাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। গেরিলা রবিউল আলম ছিলেন আমাদের প্রধান প্রশিক্ষক। তিনি ছিলেন পাকিস্তান আর্মির দক্ষ একজন গেরিলা যোদ্ধা। তাঁর সহযোগী ছিলেন হাজি মজনু। তিনিও পাকিস্তান আর্মিতে ছিলেন। জেলখানার ফটক খুলে দেওয়ার সময় আমরা আনসার ক্যাম্প লুট করে কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করি। পরে বিভিন্নভাবে আরো অস্ত্র জোগাড় হয়ে যায়। আমি আমার আব্বার লাইসেন্স করা ১২ বোরের সিভিল গান আর কিছু গুলিও সঙ্গে এনেছিলাম। শিকার করা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আমিও ছোটবেলা থেকেই শিকার করতাম। নিশানাও ছিল ভালো। তাই থ্রি নট থ্রি রাইফেল, স্টেনগান আর সাব মেশিনগান চালাতে বেশি বেগ পেতে হয়নি।’

 

আব্বা বললেন, বিস্ময়কর এক যোদ্ধা

‘কাদিরীয়া বাহিনীতে মোট ২৮টি কম্পানি ছিল। কমান্ডারের নামে কম্পানির নাম। আমি প্রথমে ছিলাম লোকমান হোসেনের কম্পানিতে। তারপর শেষের দিকে মোকাদ্দেস হোসেনের। প্রতিটি কম্পানিতে যোদ্ধা ছিলেন ১০০ জনের বেশি। বিভিন্ন অভিযানে কম-বেশি হতো। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ছিলেন খুব ক্ষিপ্রগতির মানুষ। তিনি বিস্ময়কর এক যোদ্ধা। ১২-১৩ জনের বেশি লোক রাখতেন না সঙ্গে। সারা টাঙ্গাইল আর ময়মনসিংহ জেলা ঘুরে বেড়াতেন। পাকিস্তান বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ করে নির্ধারণ করতেন প্রতিরোধের কৌশল। খুব কঠিন আর সংকটময় একটি যুদ্ধে তাঁর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার সুযোগ হয়েছে আমার। সেটা বিয়ালার যুদ্ধ।’

 

কাদেরিয়া বাহিনীর বটতলার যুদ্ধ

নথখোলা ব্রিজ (তখন ব্রিজ ছিল না, নদীতে ছিল ফেরি) থেকে পূর্বে বাসাইলের দিকে কিছু দূর এগিয়ে গেলেই বিয়ালা গ্রাম। বিয়ালা আর নথখোলার মধ্যে পড়ে চৌরাস্তা। উত্তরে বাথুলি বাজার আর দক্ষিণে কাশিল উত্তরপাড়া। চৌরাস্তায় ছিল একটা বিশাল বটগাছ। তখন এলাকাটি ছিল ফাঁকা। কাদেরিয়া বাহিনী নথখোলা থেকে বাসাইলের দিকে যাচ্ছিল। ‘পথে একটা কালভার্টের কাছে একজন কৃষক আমাদের বলেন, কোথায় যান আপনারা? বটতলায় তো পাকিস্তান বাহিনী বসে আছে। আমরা দাঁড়িয়ে পড়ি। বঙ্গবীর তাজেল নামে একজনকে পাঠান খবর আনতে। সঙ্গে দেওয়া হয় গ্রেনেড। দরকার হলে গ্রেনেড ছুড়ে সে পালিয়ে আসবে। আমরা রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়েছিলাম। তাজেল বটতলার কাছাকাছি যেতেই পাকিস্তান বাহিনীর একজন এসে তার হাত ধরে ফেলে। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন বেয়নেট চার্জ করে। রাস্তার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে দৃশ্যটা আমরা দেখলাম। সঙ্গে সঙ্গে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাই। এক দলকে ওখানে রেখে বঙ্গবীরের নেতৃত্বে চলে যাই উত্তর দিকে বাথুলি বাজারে। যতটা সম্ভব আড়াল নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকি বটতলার দিকে। পাকিস্তান বাহিনী রাইফেলের রেঞ্জের মধ্যে এলে শুরু হয় আক্রমণ। বঙ্গবীর মর্টার থেকে একের পর এক শেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। পাকিস্তান বাহিনীও শুরু করে পাল্টা গুলি বৃষ্টির মতো। আমরাও এগিয়ে যেতে থাকি ক্রলিং করে। একপর্যায়ে পাকিস্তান বাহিনী রাস্তা ছেড়ে অবস্থান নেয় রাস্তার দক্ষিণ পাশের জমিতে। বঙ্গবীর এগোতে থাকেন শেল ছুড়তে ছুড়তে। আমাকে নির্দেশ দেন পূর্ব দিক থেকে পাকিস্তান বাহিনীকে ঘিরে ফেলতে। সঙ্গে সঙ্গে আমি জয়নাল, শহীদ, মজনুসহ ১৩-১৪ জনকে নিয়ে বাহাতৈর চক দিয়ে গিয়ে আক্রমণ চালাই। তিন দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে পাকিস্তান বাহিনী হতবিহ্বল হয়ে দক্ষিণ দিকে পেছাতে থাকে। আমরাও তাদের পিছু নিই। বঙ্গবীর মর্টার দিয়ে আমাদের কভার করতে থাকেন। বেলা পড়ে এলে আমরা পিছু ধাওয়া বন্ধ করি। পাকিস্তান বাহিনী নদীর পাড় দিয়ে কাঞ্চনপুর আদাজান হয়ে বাসাইল থানায় আশ্রয় নেয়। পিছু হটার সময় কাশিলের সাত-আটজন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। একজন পাকিস্তান সেনা মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে গ্রামবাসী তাকে পিটিয়ে হত্যা করে।’

 

ছোট বোনটাকে দেখতে মন টানছিল আব্বার

‘তখন রোজার মাস। পরিকল্পনা হয় ঈদের দিন থানা অ্যাটাক করা হবে। আমাদের কম্পানিকে নথখোলা খেয়াঘাটের ডিফেন্সের দায়িত্ব দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, টাঙ্গাইল সদর থেকে বাসাইলকে বিচ্ছিন্ন করা। পরিকল্পনামতো চাঁদ রাত ৪টায় অবস্থান নিই নথখোলায়। অভিযানের কমান্ডার ছিলাম আমি। দলকে দুই ভাগ করে রাস্তার উত্তর আর দক্ষিণে অবস্থান নিই। দক্ষিণে আমার সঙ্গে ছিল জয়নাল, রশিদ, তার আপন ভাই কাসেমসহ আরো কয়েকজন। বাংকারে রাইফেল তাক করে অপেক্ষা করতে থাকি। একটু দূরেই আমাদের বাড়ি। আমার নানাবাড়ি আমাদের বাড়ির সঙ্গেই। নানা আলজশ খান ওরফে কালু খান নামডাকওয়ালা মানুষ। বাড়ির সঙ্গেই মসজিদ। যুদ্ধের শুরু থেকেই আমাদের বাড়ি মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি। সবুর খান (বীর প্রতীক) ও তাঁর বাহিনী অস্ত্র-গোলাবারুদ রাখতেন বাড়িতে। পাকিস্তান বাহিনী একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। বাড়ির সঙ্গে মসজিদ বলে আগুন দেয়নি। কিছুদিন আগে জন্ম হয়েছে আমার ছোট বোনটার। খুব ইচ্ছা করছিল একনজর বোনটাকে দেখে আসি। পাতলা একটা কাঁথা গায়ে আমার। তার আড়ালে একটা স্টেনগান ঝুলিয়ে রওনা হলাম। বাবা ফজরের নামাজ পড়ে দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে। আমাকে দেখে খুশি হলেন। টিনের গেট খুলে ভেতরে ঢুকলাম। বোনকে কোলে নিয়ে মা সকালের নরম রোদে বসে ছিলেন বারান্দায়। কাছে গিয়ে বসলাম। বোনকে আমার কোলে দিয়ে মা উঠে গেলেন। একবাটি পায়েস এনে দিলেন। পায়েসটা অমৃতের মতো লাগল। বেশি দেরি করা যাবে না। উঠে পড়লাম। মায়ের চোখে পানি। বাবার মুখটা থমথমে। আমি দ্রুত ফিরে এসে অবস্থান নিলাম বাংকারে। বঙ্গবীর থানা আক্রমণ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে খবর পৌঁছে যায় সদরে। টাঙ্গাইল থেকে পাকিস্তান বাহিনীর রিজার্ভ ফোর্স মার্চ করে বাসাইলের দিকে। নথখোলা খেয়াঘাটে এসে তারা থমকে যায়। আমরা আগেই সব নৌকা এ পাড়ে এনে ডুবিয়ে রেখেছিলাম। পাকিস্তান বাহিনী ঘাটে নৌকা না দেখে গালাগাল শুরু করে। ফায়ার ওপেন করে আমরা আমাদের অস্তিত্বের জানান দিই। আর ওরা মেশিনগানে ব্রাশ ফায়ার করে। চলতে থাকে গোলাগুলি। বিকেলের দিকে হঠাৎ টের পেলাম পেছন দিক থেকে গুলির শব্দ। তাকিয়ে দেখি পাকিস্তান বাহিনী পাশাপাশি সিঙ্গেল লাইনে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে, গুলি করতে করতে। দক্ষিণ দিক দিয়ে নদী পার হয়েছে তারা। ডিফেন্স উইথড্র করা ছাড়া উপায় নেই। বাংকার ছেড়ে দিয়ে আমরা ছুটলাম সোজা উত্তরে। সামনের খোলা মাঠ তার পরই কামুটিয়া গ্রাম। তার আগে কোনো আড়াল নেই। যে করেই হোক পৌঁছতে হবে সেখানে। আমরা ছুটছি। গুলি এসে পড়ছে আশপাশে। রশীদ আর না দৌড়িয়ে ক্রল করে ঢুকে পড়ল ঘাটি ক্ষেতে (এক ধরনের পশুখাদ্য)। জয়নাল বাসাইল রোড পার হয়ে নেমে পড়ল বিলের পানিতে। আমার ঠিক পেছনেই ছিল রশিদের ভাই কাসেম। আমরা গ্রামের প্রথম বাড়িটায় উঠে গেলেও কাসেম পড়ে গেল গুলি খেয়ে। গ্রামে গাছগাছড়ার আড়াল পেয়ে আমরা দাঁড়ালাম। পাকিস্তান বাহিনী ঘাটি ক্ষেত ঘেরাও করে ধরে ফেলল রশিদকে। আর একদল গেল বিলের দিকে। জয়নাল মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসে অলৌকিকভাবেই। কামুটিয়ার পরেই দাপনাজুর আমাদের গ্রাম। গোলাগুলির আওয়াজ পেয়ে বাবা হতবিহ্বল হয়ে ছুটে আসেন কামুটিয়ায়। আমি বেঁচে আছি—আমাকে দেখেও তাঁর যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি চলে গেলাম আমাদের আরেকটা ঘাঁটিতে। ওদিকে বঙ্গবীরও পিছু হটেছেন। পাকিস্তান বাহিনী রশিদকে নিয়ে যায় বাসাইলে। সেখানে বেয়নেট দিয়ে তাকে হত্যা করে নির্মমভাবে। উপজেলা পরিষদে যাওয়ার পথে রাস্তার ধারেই তার কবর। পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে বাসাইল থানা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের বহুতল ভবনটি।’

রশিদ চাচার কবরের সামনে বাংলাদেশের পতাকাওয়ালা

রশীদ চাচার কবরের পাশে

নথখোলা স্মৃতিস্তম্ভ থেকে আমরা চলে এসেছি বটতলায়। এখানে চার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আব্বা দেখাচ্ছিলেন বাথুলি, বিয়ালা আর কাশিল গ্রাম। বটতলায় সেদিনের পাকিস্তান বাহিনীর অবস্থান। তাদের আক্রমণের পথ। আর পাকিস্তান বাহিনীর পিছু হটা। দেখালেন তাজেলের শহীদ হওয়ার স্থান। চোখের সামনে তাজেলের হত্যাকাণ্ডই যেন সেদিন আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে। আব্বাকে বটতলায় রেখেই রশিদ চাচার (শহীদ আব্দুর রশিদ মিয়া) কবরটাকে একনজর দেখার জন্য বাইকে চেপে বসলাম। অবাক ব্যাপার! মাথায় পতাকা বাঁধা একজন পতাকার ফেরিওয়ালা হেঁটে যাচ্ছে কবরের পাশ দিয়ে। ডাক দিয়ে তাকে থামালাম। সে প্রথমে ভেবেছিল আমরা হয়তো পতাকা কিনব। কবরটা তাকে দেখালাম। বললাম, এই মহান বীরদের জন্যই আমরা এই লাল-সবুজ পতাকাটি পেয়েছি। তুমি এর পাশে একটু দাঁড়াও আমরা ছবি তুলব। লোকটি সসম্ভ্রমে কবরটি একবার দেখল। আজ বাসাইলের হাটবার। কয়েকজন লোক বিক্রির জন্য পাটখড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পাশে। তারাও শোলার আঁটি সরিয়ে নিল যেন একটু বিনম্র শ্রদ্ধায়। আমরা ছবি তুললাম।

 

ফিরতি চক্কর

রশিদ চাচার কবর দেখে বটতলায় ফিরে গেলাম আবার। আব্বা কিছুটা আনমনা হয়ে ছিলেন। শহীদ তাজেল বুঝি তাঁর চোখে ভাসছেন! হয়তো নাকে এসে লাগছে তাজা বারুদের গন্ধ। আব্বাকে বাইকে তুলে নিয়ে থামলাম গিয়ে একটু পশ্চিমে সেই ছোট্ট কালভার্টটির ওপর। সেটা এখন ব্রিজ। এখানে একজন কৃষক তাদের সতর্ক না করলে কাদেরীয়া বাহিনীর বড় একট অংশকে হারাতে হতো সেদিনই। খানিক পরে এসে থামলাম নথখোলা ব্রিজের ওপর। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখানেই হবে শেষ। আব্বা বাড়ি যেতে বললেন। আমি বললাম আজ বাড়ি যেতে আসিনি। এসেছি বাবার যুদ্ধ দেখতে। আব্বার চোখ টলমল করছে। কালো সানগ্লাসটা তাড়াতাড়ি তুলে দিলেন চোখে। জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের কাছে কী আশা করেন? প্রথমে হেসে ফেললেন। তারপর বললেন, ‘দেশটা স্বাধীন করতে অনেক রক্ত গেছে। তোমরা একে সোনার বাংলা বানিয়ে দাও।’ আব্বাকে তাঁর বাইকের চাবিটা ফেরত দিলাম। বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে পকেট থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে বাড়িয়ে দিলেন—‘ধরো তোমরা কিছু খেয়ে নিও পথে।’

ছবি: নাজমুল হক রনি


মন্তব্য