kalerkantho


বিশাল বাংলা

কছিম উদ্দিনকে সম্মান জানিয়েছেন ভূপতিভূষণ

২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



কছিম উদ্দিনকে সম্মান জানিয়েছেন ভূপতিভূষণ

ভূপতিভূষণ বর্মা

কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়কের ধারে পাঁচপীর বাজার। বাজারের মুখেই ভূপতিভূষণ বর্মার ভাওয়াইয়া একাডেমি।

একাডেমির ভেতরে ঘর আর বারান্দায় রয়েছে একটি সংগ্রহশালা। প্রায় ৭০০ বিলুপ্তপ্রায় লোকজ সামগ্রী আছে এখানে। ভূপতিভূষণ এর নাম রেখেছেন কছিম উদ্দিন লোকশিল্প সংগ্রহশালা। কছিম উদ্দিনকে বলা হয় ভাওয়াইয়া যুবরাজ। ঘুরে এসেছেন আব্দুল খালেক ফারুক

 

ভূপতিভূষণ একজন জনপ্রিয় ভাওয়াইয়া শিল্পী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ঘুরে এসেছেন দিনকয়েক আগে। আসাম আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে দাওয়াত আসে তাঁর কাছে মাঝেমধ্যেই। ভক্তরা তাঁকে ভাওয়াইয়া ভাস্কর উপাধি দিয়েছে। ভাওয়াইয়া একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছেন ১৯৯৩ সালে।

প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীকে তিনি ভাওয়াইয়ার তালিম দিয়েছেন। ছাত্রদের অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। ভাওয়াইয়া লোক নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন ভূপতিভূষণ। বললেন, ‘একটি লোকশিল্প সংগ্রহশালার স্বপ্ন আমার দীর্ঘ দিনের। এখন তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আরো বড় করার ইচ্ছা আছে। ভাওয়াইয়া গানে কছিম উদ্দিনের অবদান অনেক। আব্বাসউদ্দীনের পরেই তাঁর স্থান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গান গেয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁকে সম্মান জানাতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। ’ উল্লেখ্য, কছিম উদ্দিনের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে ‘ওকি বাপ রে বাপ মুক্তিফৌজ কি যুদ্ধ করে বাপ রে’, ‘নয়া ডারাতে মাছ উজাইছে, হেঙ্গা পাতেয়া দে’, ‘বাপের বাড়ি মোর ধরলার ওপারে’ ইত্যাদি। প্রতিবছর ২২ আগস্ট কুড়িগ্রামে কছিম উদ্দিন উৎসব পালিত হয়। ১৯৯২ সালের ২২ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

সংগ্রহ অভিযান

সময় সব বদলে দিচ্ছে। কৃষি, গৃহস্থালি উপকরণও বদলাচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে বহু। অথচ ভাওয়াইয়ার সঙ্গে এসব উপকরণের নিবিড় যোগ। উত্তরের মানুষ ভাওয়াইয়া ছাড়া থাকবে কিভাবে? তাই আমি উপকরণগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কথা ভেবেছি। আরো বলছিলেন ভূপতিভূষণ, অনেক দিন ধরেই অল্প অল্প করে সংগ্রহ করছিলাম। তবে গত চার বছর সংগ্রহ অভিযান চলেছে জোর কদমে। ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে প্রায়ই সভা করেছি। গ্রামে গ্রামে গিয়ে মাঠবৈঠক করেছি। মত্স্যজীবী ও কৃষিজীবীদের বাড়ি বাড়ি গেছি। বেশির ভাগ মানুষই বিনা পয়সায় দিয়ে দিয়েছেন। তবে কখনো কখনো অর্থমূল্য গুনতে হয়েছে। লোহার পাতযুক্ত গরুর গাড়ির কাঠের চাকা জোগাড় করতে পঞ্চগড় যেতে হয়েছিল। ’ গত বছর উদ্বোধন করা হয়েছে এই সংগ্রহশালা। একাডেমির ৬০ জন সদস্যের কাছে কৃতজ্ঞ ভূপতিভূষণ। এ ছাড়া গঠিত হয়েছিল সাত সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ সংগ্রহ কমিটি।  

 

অমূল্য রতন

সংগ্রহশালার দ্রষ্টব্যগুলো কয়েকটি বিভাগে ভাগ করে আলাদা আলাদা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। গৃহস্থালি ও মানুষের ব্যবহৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে কুপিবাতি, হ্যাজাকবাতি, কাঠের খরম, লাউয়া, প্রাচীন বদনা, বক মারার ফাঁদ, হুঁকা, ঢেঁকি ইত্যাদি। মাছ ধরার সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে খোঁচা, বাগা, ডারকি, জিনা, টোসা, মহিষের সিঙ্গা ইত্যাদি। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সামগ্রীর মধ্যে আছে ঝাঁপি, জোয়াল, লাঙল, ছেঁউতি, হাত নেংলা, খন্তি, কোদাল, কাঁচি, বাঁশের তৈরি ইঁদুর মারার কল ইত্যাদি। বিলুপ্তপ্রায় বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন এলাকা থেকে। যেমন খমক, খঞ্জনি, একতারা, দোতরা, মুগা বাঁশি, সারিন্দা ইত্যাদি। খেলনা সামগ্রীর মধ্যে আছে বাটুল, লাটিম, খুঁটিমালাই ইত্যাদি। পূজা-পার্বণের সামগ্রীর মধ্যে আছে শঙ্ক, কোশাকুশি, পঞ্চ প্রদীপ, চামর ইত্যাদি।

 

যেতে হবে আরো দূর

ভূপতিভূষণ প্রাচীন, অতিপ্রাচীন ও দুর্লভ সামগ্রী সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। আশা করেন, একসময় সংগৃহীত সামগ্রীর সংখ্যা হবে কয়েক হাজার। কলের গান, করকা, সানাইসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ও মাটি, পাথর, পিতল ও কাঁসার বাসন-কোসন ও বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছেন এখন। তিনি জানান, একাডেমির ঘর ও বারান্দায় স্থান সংকুলান হচ্ছে না। বেশ কিছু সামগ্রী রয়েছে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার মূলত সংগ্রহশালাটি খুলে দেওয়া হয়। ভূপতিভূষণ বলেন, মাঝেমধ্যে আফসোস হয়, উদ্যোগে আরো মানুষ জড়ো করা গেলে হয়তো বিলুপ্ত অনেক কিছুই সংগ্রহে রাখা সম্ভব হতো। এখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। ভবনটি বড় করা গেলে সংরক্ষণ সহজ হবে। ’

                                    ছবি : লেখক


মন্তব্য