kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

হয়তো সুখেই আছে

২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



হয়তো সুখেই আছে

—চলো ওঠা যাক।

—মাত্র তো কিছুক্ষণ হলো এলাম, এখনই চলে যেতে চাচ্ছ?

—ভালো করে চোখ মেলে ঘড়িতে দেখো কয়টা বাজে? আমরা আসছি প্রায় তিন ঘণ্টা হয়ে গেছে...

—ও মা! তাই তো। কখন যে সময় ফুরিয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। আসলে কী—তোমার সঙ্গে থাকলে আমার সময়ের প্রতি একদম খেয়াল থাকে না, তখন সময়টা কথাবার্তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। আচ্ছা, আরেকটু বসো না প্লিজ!

—না, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।

—তা ঠিক আছে, তবে আরেকটু বসো, সূর্য অস্ত যাওয়া দেখেই চলে যাব। আর তোমার চুলের ঘ্রাণটা আরেকবার শুঁকেই...

—আচ্ছা ঠিক আছে, এর বেশি কিন্তু না।

—আচ্ছা, সূর্য যখন অস্ত যায় তখন লালবর্ণের আভা দেখতে খুব সুন্দর না?

—হুম। সুন্দর...অনেক।

—আচ্ছা, তোমার কি আমার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে?

—হুম...অনেক।

 

এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম সেই মেয়েটার সঙ্গে আমার কোনো ধরনের যোগাযোগ হয় না প্রায় দুই বছর ধরে। তার বিয়ে হয়ে গেছে, সে এখন তার শ্বশুরবাড়িতে, সংসার নিয়ে ব্যস্ত। শুনেছি তার কোল আলোকিত করে ফুটফুটে একটা কন্যাসন্তানও এসেছে! সে বেশ ভালোই আছে, সুখেই আছে। আমার কথা হয়তো একদমই মনে পড়ে না তার...তবে আমি তাকে মিস করি।

শামীম আহমাদ, রায়পুরা, নরসিংদী

 

 

ভালো থাকুন স্যার

গুহ স্যার আমাদের রসায়ন পড়াতেন। একদিন ক্লাসে ঢুকেই বললেন, ‘তোদের নিয়ে তো আর পারা গেল না। সব শিক্ষকের ক্লাস অদলবদল হচ্ছে। তোদের গ্রুপ সেভেনের’ ক্লাস কেউ নিতে চায় না। তোরা তো মহা বদ হয়ে গেছিস। আবারও আমাকেই তোদের ক্লাস নিতে হবে দেখছি।’ একটু বেশিই দুষ্টুমি হচ্ছিল আমাদের।

এর মধ্যেই এক অভিযোগে আমার ডাক পড়ল খোদ অধ্যক্ষের কামরায়। আমি ভয়ে ভয়ে ভেতরে গেলাম। ‘এই ছেলে, তুমি কোন ক্লাবে আছ?’ নটর ডেম কলেজে বিজ্ঞান, সাহিত্য, খেলা, প্রকৃতি, বিতর্কের বেশ কিছু ক্লাব ছিল। আমি কোনোটাতেই ছিলাম না তখন। ‘কোনো ক্লাবে নেই, স্যার।’ ‘তুমি খেলাধুলা করো?’ ‘না, স্যার।’ ‘লেখালেখি, বিতর্ক, ঘোরাঘুরি?’ ‘না স্যার। আমি কিছুই পারি না।’ ‘শেষ কুইজ (সাপ্তাহিক পরীক্ষা) কেমন হয়েছে?’ ‘স্যার, পদার্থবিজ্ঞান ছিল। এক শতে চার পেয়েছি।’ ‘নটর ডেম তোমার কেমন লাগে?’ ‘খুব ভালো, স্যার।’ ‘কী ভালো লাগে?’ ‘গাছপালা ভালো লাগে। স্যারদের ভালো লাগে। ফাদারদের ভালো লাগে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভালো লাগে।’ ‘আর খারাপ কী কী?’ ‘কোনো খারাপ নেই, স্যার।’ ‘তিনটা খারাপ তোমাকে বলতেই হবে। বলে চলে যাও।’ ‘ব্যবহারিক ক্লাসের কড়াকড়ি খারাপ লাগে। নির্দিষ্ট করে দেওয়া সিট-প্ল্যানিং ভালো লাগে না। আর এত কুইজ পরীক্ষা খারাপ লাগে।’ স্যার মুচকি হাসলেন। ‘একদিন এই তিনটা জিনিসই তোমার মনে পড়বে বেশি। যাও।’ আশ্চর্য, যেটার জন্য আমাকে ডাকা হয়েছিল, স্যার তার কিছুই বললেন না। অথচ তারপর আমার নামে আর কোনো অভিযোগ আসেনি। একটার পর একটা ক্লাবে আমি যোগ দিলাম। আর কুইজ পরীক্ষার নম্বর বাড়তে লাগল তড়তড় করে। আমার সেই প্রিয় শিক্ষক, নটর ডেম কলেজের তখনকার অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা কি কোনো জাদু জানতেন? মাত্র কিছুদিন হলো স্যার চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। অথচ কেন যেন মনে হচ্ছে স্যারকে অনুভব করছি আগের চেয়েও বেশি। ভালো থাকুন স্যার, যেখানেই থাকুন।

আহাদ আদনান, মাতুয়াইল, ঢাকা

 

 

যদি আবার বৃষ্টি আসে!

সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। খুব আলসেমি লাগছিল। তাই বললে কী আর হবে! আটটা অলরেডি বেজে গেছে। ভার্সিটিতে যেতে হবে। দুটি ক্লাস টেস্ট আছে। ফ্রেশ হয়ে হালকা নাশতা করে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। বৃষ্টির কলরব শুনে ছাতা সঙ্গে নিলাম।

বাসার দরজা খুলতেই ঝৃষ্টির ছাঁট মুখে এসে লাগল। কোনোমতে ছাতা মেলে ফারুক মামার দোকানের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কোনো রিকশা এলেই চটজলদি ভাড়া বাড়িয়ে দিয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে যাব। তারপর বাস ধরব। কিন্তু রিকশার কোনো দেখা নেই। প্রায় ১৫ মিনিট হলো দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই। এমন সময় ভিজতে ভিজতে এক মেয়ে কোত্থেকে যেন ছুটে এলো। বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে গেছে। মিনিট দুয়েক দাঁড়াল। কিন্তু এখানে তো ছাউনি বেয়ে পানি ঝরছে। তাই সুবিধা করে উঠতে পারল না।

আমি মেয়েটির দিকে এক নজরে তাকিয়ে আছি। মেয়েটি লক্ষ করল। আমি একটু ভয় পেলাম। নড়ে দাঁড়ালাম। একটু পর মেয়েটি বলল, এক্সকিউজ মি, একটু ছাতার নিচে দাঁড়ানো যাবে? আমি সাতপাঁচ না ভেবে, কিছুই না বলে ছাতাটি এগিয়ে দিলাম। মেয়েটি নিঃসংকোচে ছাতার নিচে এলো।

হঠাৎ একটি রিকশা এলো। আমি একটু অন্য খেয়ালে। মেয়েটি রিকশা বন্দোবস্ত করে নিল। আমি যেন প্রতিযোগিতায় হেরে গেলাম। মেয়েটি আমার ছাতা থেকে বেরিয়ে রিকশায় উঠে পড়ল। তারপর ঘটল অন্য ঘটনা। মেয়েটি আমাকে ডাকছে। এই যে আসুন না এ রিকশায়। আমি আর না করতে পারলাম না। এক রিকশায় ক্ষণিকের পরিচিত দুটি বৃষ্টিস্নাত হৃদয়। বারবার আমাকে কল্পনার জগতে নিয়ে যাচ্ছে। তখন যতটা না নিকটবর্তী ছিলাম, এখন তার থেকেও কাছে। এ যেন জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা। মেয়েটি বলল, কৃতজ্ঞতা বোধের ঋণ থেকেই রিকশায় ডেকে নিলাম। মনে কিছু করবেন না। আমি তার কণ্ঠের ঝংকারে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম।

রিকশা থেকে নেমে একটু দূরেই বাসস্ট্যান্ড। তখনো বৃষ্টি পড়ছিল। দুজন একই ছাতার নিচে মাথা গুঁজে বিমানবন্দর রেলগেট পার হতে লাগলাম। মেয়েটির একটি হাত আমার ছাতার ডাটে এবং আমারও একটি তার হাতকেই স্পর্শ করে আছে। রাস্তাটি একটু পিচ্ছিল হওয়ায় মেয়েটি টলোমলোভাবে পা ফেলছে। একপর্যায়ে মেয়েটি চিত্পটাং হওয়ার উপক্রম আর তখনই আমাকে ঝাপটে ধরল। ছাতাটি উড়ে গিয়ে কাদায় পড়ে গেল। আমার কেমন যেন মনে হলো, হঠাৎ বৃষ্টিটা থেমে গেল। প্রায় এক মিনিট পার হয়ে গেল। অতঃপর আমার শরীর ছেড়ে দিয়ে বলে উঠল, ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। তখন আকাশের বজ্রপাতের ঘনঘটা চলছিল। তবে আমার হৃদয়ে যে একটি বজ্রপাত হয়ে গেল, তা আর কেউ অবলোকন করল না।

অতঃপর বৃষ্টি থেমে গেল। মেয়েটি তুরাগ গাড়িতে উঠল আর আমি বসুমতিতে। এখন দুজনের রাস্তা দুই দিকে। অনেকক্ষণই একই রাস্তায় চললাম। তবে কারোরই পরিচয় বিনিময় করা হলো না। মাঝখান থেকে আমি যেন একটার পর একটা স্বপ্ন দেখে চলছিলাম। এত হৃদয় নিংড়ানো স্পর্শ আর নিকটে আসা, আমি যেন বৃষ্টির কলতানে মুখরিত ছিলাম। বাসে বসে বসে ওই অপরিচিতার কথাই ভাবছিলাম। ভাবছিলাম, সে কি আমার মতোই ভাবছে? জানালা খুলে দিলাম। দেখি আর বৃষ্টি নেই। ভাবলাম, অপরিচিতার একটা নাম দিই। অতঃপর তাকে বৃষ্টি নাম দিয়ে এ হৃদয়ে ঠাঁই করে নিলাম। এ কারণে যে বৃষ্টি যদি আবার আসে!

 

মোহাম্মদ অঙ্কন

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি

 



মন্তব্য