kalerkantho


মহামিলন

ডালরিম্পলের দেখা পেয়েছিলাম

দ্য হোয়াইট মুঘলস পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন রিদওয়ান আক্রাম। ভক্ত বনে যান উইলিয়াম ডালরিম্পলের। স্কটিশ এই ঐতিহাসিক লিট ফেস্টে যোগ দিতে ঢাকা এসেছিলেন সম্প্রতি। সেখানেই তার দেখা পেয়েছিলেন ভক্ত

২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ডালরিম্পলের দেখা পেয়েছিলাম

ভক্তের সঙ্গে ডালরিম্পল

১৭ নভেম্বর। ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন।

বারে শুক্রবার। উইলিয়ামের সেশন ছিল সকাল ১০টায়। সময়মতোই হাজির হয়ে গিয়েছিলাম বাংলা একাডেমিতে। হলভর্তি দর্শক। মানুষটার মুখভর্তি কাঁচা-পাকা দাড়ি। চটা জিনসের ওপর শার্টের হাতা গোটানো। পায়ে হাই নেক জুতা। মনে হচ্ছিল, এক রকস্টার। পায়ের ওপর পা তুলে বৈঠকী মেজাজে কথা বলছিলেন। শ্রোতার সামনে জীবন্ত করে তুলছিলেন নিজের বইয়ের চরিত্রগুলোকে। ইতিহাসের সেসব চরিত্র সেকালে যেভাবে কথা বলত বলে ধারণা করা যায়, সেভাবেই নকল করছিলেন। শ্রোতারা হেসে কুটিকুটি। এক ঘণ্টা যে কোথা দিয়ে পার হলো, বুঝতে পারলাম না। সেশন শেষ, ঘোষণা করলেন উপস্থাপিকা। আমন্ত্রণ জানালেন ডালরিম্পলের আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখতে। আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের দোতলাতেই সে প্রদর্শনী। নাম, ‘দ্য হিস্টরিয়ানস আই’। সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলাম। সব সাদা-কালো ছবি। সাকল্যে ২৪টি। ভারতের বিভিন্ন জায়গা—কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, লখনউ, হায়দরাবাদ, কাশ্মীর ঢুঁড়ে ছবিগুলো তুলেছেন উইলিয়াম। কম দামি অ্যান্ড্রয়েড ফোন দিয়ে তোলা। ফোনেই টুকটাক সম্পাদনা করেছেন। কিন্তু কে বলবে, ছবিগুলো ভালো দেখাচ্ছে না।

দর্শকদের সঙ্গে আরো কিছু কথা বলে ছুটলেন বইমেলা প্রাঙ্গণে। সেখানে অনেক ভিড়। উইলিয়ামের জন্যই ভিড় বেশি। ভক্তরা দাঁড়িয়ে আছে অটোগ্রাফ নেবে বলে। ভিড়ে বুঝি কাবুই হয়ে গেলেন ঐতিহাসিক। কপালে ঘাম জমল। শার্টও ভিজে উঠল। বুঝলাম অনেক দিন ধরে ভারতে থাকলেও গরমে এখনো কাবু হন। চেহারায় কিন্তু হাসিটি ধরে রেখেছেন। নিজ থেকেই নাম জিজ্ঞেস করছেন। অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছেন একে একে। তাঁর সঙ্গে ছিল ফেস্টের একজন স্বেচ্ছাসেবক। নাম জানলাম সাজ্জাদ। বলল, ‘টিলডা সুইনটনের একটা সেশন আছে সাড়ে ১২টায়। উইলিয়াম সেখানে যোগ দেবেন। এই টিলডা হলিউড অভিনেত্রী, উইলিয়ামের বোনও। ’

অটোগ্রাফ দেওয়া শেষ হওয়ার পর কিছু সময় হাতে ছিল। উইলিয়াম গেলেন লেখকদের বিশ্রামাগারে। ভাবলাম, এই সুযোগে একটু কথা বলে নিই। কিন্তু ফেস্টের স্বেচ্ছাসেবকরা কিছুতেই নিয়ম ভাঙতে রাজি নন। ব্যর্থ মনোরথে ফেরার কথা ভাবলাম। তবে আশা ছাড়লাম না। কাল আসব আবার। রাস্তায় নামার আগে দু-তিনজনের সঙ্গে কথা বলে সাজ্জাদের মোবাইল নম্বর জোগাড় করলাম। ফোনে সাজ্জাদ বলল, ‘টিলডার সেশন শেষ হলেই মধ্যাহ্নভোজের বিরতি। তারপর না হয় বসবেন। ’ কিন্তু আমার তাড়া ছিল। তাই বাংলা একাডেমির গেট পেরোলাম। মাঝপথে সাজ্জাদের ফোন, ‘উনি এখন ফ্রি আছেন। চাইলে কথা বলতে পারেন। ’ জানালাম আমার অপরাগতার কথা। তবে আগামীকাল নিশ্চিত আবার আসছি।

পরের দিন সকালেও ছিল উইলিয়াম ডালরিম্পলের আরেকটি সেশন। সেটা ১১টা ১৫ মিনিটে। এবার তিনি কথা বললেন বিখ্যাত হীরা ‘কোহিনূর’ নিয়ে। জানালেন হাত ঘুরে ঘুরে কিভাবে সেটার জায়গা হলো ব্রিটিশ রানির মুকুটে। এই সেশন শেষে সাজ্জাদের ফোন, ‘অটোগ্রাফের সেই জায়গায় চলে আসুন। উনি কথা বলতে চান। ’ গিয়ে দেখি যথারীতি অটোগ্রাফ পর্ব চলছে। পাশে দাঁড়িয়ে তীক্ষ নজর মেলে রাখি। আজকে আর শিকার হাতছাড়া করতে চাই না।

ভক্ত পাঠকদের ভিড় কমতেই ডালরিম্পলের নজর পড়ল আমার ওপর। বলল, ‘হ্যালো!’ প্রতিউত্তরে ‘হাই’ বললাম। নিজের পরিচয়টাও দিলাম। কথা বলতে বলতেই হাঁটতে থাকলেন। সেটাকে হাঁটা না বলে দৌড়ানো বলাটাই শ্রেয়। তাঁর বিশাল বপুর সঙ্গে পাল্লা দিতে খানিকটা কষ্ট হলো বৈকি! গরমের হাত থেকে বাঁচতেই দৌড়াচ্ছেন বেচারা। গন্তব্যে পৌঁছে হাতে তুলে নিলেন একটা কোমল পানীয়ের ক্যান। লম্বা একটা চুমুক দিয়ে বললেন, সময় কিন্তু বেশি দিতে পারব না। আমি প্রমাদ গুনলাম। ‘তাহলে উপায়? এত্ত এত্ত প্রশ্ন জমা আছে যে আমার?’

প্রথমেই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, আপনাকে তো দেখতে রকস্টারের মতো লাগে। শুনেই চোখ কুঁচকালেন। আমি ব্যাখ্যা দিলাম, ‘এই যে পায়ে বিশাল একজোড়া বুট পরে আছেন, শার্টটাও চটামটা আর জিনসটার তো রং জ্বলা। শত শত বছরের পুরনো ইতিহাস বলে বেড়াচ্ছেন মঞ্চে। আমরা কনসার্টে গিয়ে যেমন আমোদিত হই আপনাকে শুনেও আমোদ পেলাম। ’ তাঁর চোখ স্বাভাবিক হয়ে এলো। মনে হলো সন্তুষ্ট হয়েছেন। ধন্যবাদও জানালেন। এরপর আসল আলাপে যেতে চাইলাম। কিন্তু এত এত প্রশ্ন। কোনটা ছেড়ে কোনটা করি! বুঝে নিয়ে উইলিয়াম বললেন, ‘প্রশ্নগুলো না হয় ঠিক করো আগে। আমি আরেকটা কোক নিয়ে আসি। ’ মাথাটাকে ওপরে-নিচে ঝাঁকিয়ে সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। খানিকটা সময় তো পাওয়া গেল, ‘জয় বাবা কোক!’ দ্বিতীয় কোকটা নিঃশেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরও চলল আমাদের বাতচিত। শুরুটা হয়েছিল তাঁর ভ্রমণসাহিত্য দিয়ে। একসময় যে তিনি ভ্রমণসাহিত্য (‘ইন জানাডু’, ‘সিটি অব জিনস : আ ইয়ার ইন দিল্লি’, ‘ফ্রম দ্য হোলি মাউনটেন : আ জার্নি ইন দ্য শ্যাডো অব বাইজান্টিয়াম’ ইত্যাদি) লিখতেন তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। তারপর কথা গেল ইতিহাসে। প্রথমেই ‘হোয়াইট মোগলস’। চোখ টিপে বললেন, ‘আমিও কিন্তু একজন মোগল (উইলিয়ামের এক পূর্বপুরুষ একজন মোগল রমণীকে বিয়ে করেছিলেন)’। তারপর ‘দ্য লাস্ট মোগলস’ নিয়ে আলাপসালাপের মাঝখানেই সময় গেল ফুরিয়ে। তিনি উঠতে চাইলেন। বললেন, ‘আমার বোন টিলডার একটা প্রামাণ্যচিত্র দেখতে যাব। ’

আসন ছেড়ে উঠে প্রায় রওনাই হয়ে গিয়েছিলেন। আমি মিনতি করেই থামালাম, ‘আ সেলফি প্লিজ। ’ শেষমেশ কিন্তু দুটি সেলফি তোলা হয়ে গিয়েছিল।

ছবি : লেখক

 

সংক্ষিপ্ত ডালরিম্পল

স্কটল্যান্ডে ডালরিম্পলের জন্ম ১৯৬৫ সালে। পড়েছেন ক্যাম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। পেশায় লেখক। ইতিহাস তাঁর আগ্রহের বিষয়। শিল্পকলার ইতিহাসও অধ্যয়ন করেন। থাকেন ভারতের দিল্লিতে। তিনি বহু পুরস্কার জিতেছেন। তার মধ্যে ‘দ্য ডাফ কুপার মেমোরিয়াল প্রাইজ’, ‘দ্য টমাস কুক ট্রাভেল বুক অ্যাওয়ার্ড’, ‘দ্য সানডে টাইমস ইয়ং ব্রিটিশ রাইটার অব দ্য ইয়ার’, ‘দ্য হেমিংওয়ে প্রাইজ’ উল্লেখযোগ্য।


মন্তব্য