kalerkantho


লোকনায়ক

আব্দুর রাজ্জাক

খুব সকালে দিন শুরু হয় তাঁর। ফুটবলটা হাতে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঢুঁ মারেন। সবাইকে নিয়ে হৈহৈ করতে করতে চলে যান মাঠে। শরীরটা চাঙ্গা রাখেন, মনটা ফ্রেশ। আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে এক সকালে মাঠে গিয়েছিলেন ইয়াদুল মোমিনও

২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আব্দুর রাজ্জাক

‘ফুটবল খেলায় খুব দৌড়াদৌড়ি হয়। ঘণ্টায় খরচ হয় প্রায় ৬০০ ক্যালরি।

নিয়মিত খেললে তাই হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে যায়। পেশি হয় সুদৃঢ়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে। বাড়ে মনের শক্তিও। ’ বলছিলেন আব্দুর রাজ্জাক।

 

মেহেরপুর সরকারি কলেজ মাঠ

একদল মানুষ। প্রায় সবাই কর্মজীবী। তাঁদের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা, ব্যাংকার যেমন আছেন, ব্যবসায়ীও আছেন। ৬০ বছর বয়সীও আছেন এক-দুজন।

  শরীর ও মন চাঙ্গা রাখতে প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা ফুটবল খেলেন তাঁরা। ৬টা থেকে সাড়ে ৬টায় তাঁরা মাঠে হাজির হয়ে যান। খেলা শেষে বিশ্রাম নেন কিছু সময়। গল্পগুজব করেন। আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরেই মানুষগুলো জড়ো হয়। ১৩ বছর ধরে এই কাজ করে চলেছেন আব্দুর রাজ্জাক।

একজন রাজ্জাক

বয়স ৩৬। পেশায় ব্যবসায়ী। মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার যতারপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সদরে খালার বাসায় চলে এসেছিলেন। লেখাপড়া শেষে ব্যবসায় লেগে যান। একসময় মারাত্মক ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হন। প্রতিবেশী এক বড় ভাই তাঁকে ফুটবল খেলার পরামর্শ দেন। সেটা ওই ১৩ বছর আগে। মেহেরপুর সরকারি কলেজ মাঠ হয়ে উঠল তাঁর নিরাময় কেন্দ্র। ক্রমে ক্রমে চেনাজানা মানুষজনকেও ডেকে নিয়ে যেতে থাকেন। একসময় দেখা গেল এপাড়া-ওপাড়ার অনেকজনই সকাল সকাল মাঠে হাজির হয়ে যায়। দু-চার দিন কেউ অনুপস্থিত থাকলে সদলে গিয়ে হাজির হন বাড়িতে। কমপক্ষে ফোন করে খবর নেন। আবার উৎসাহী করে তোলেন। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। অফিস-আদালত বন্ধ থাকে। ৫০ জনও হাজির হয় মাঠে। সেদিন হয় প্রীতি ম্যাচ।   এভাবেই কাটল ১৩ বছর।  

 

অল্প দুঃখের কথা

রাজ্জাকের সঙ্গীদের অনেকেরই বদলির চাকরি। বদলির কারণে মাঠ ছেড়েছেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে সাবজজ ফারুক হোসেন, এনজিও কর্মকর্তা আহসানুল কবির পলাশ ও কামরুজ্জামান, ব্যাংক কর্মকর্তা শাহ আলমের কথা রাজ্জাকের প্রায়ই মনে পড়ে। কয়েকজন অবশ্য ব্যস্ততায় মাঠে আসা ছেড়েছেন। যেমন সাবেক সেনা সদস্য বদরুল আলম, ব্যাংক কর্মচারী সাহারুল ইসলাম প্রমুখ। রাজ্জাক অবশ্য তাগাদা দিতে ভোলেন না।

তাঁরা আধা যুগ ধরে নিয়মিত

বিপণন কর্মকর্তা নুরুজ্জামান, ব্যবসায়ী মিন্টু হোসেন, ব্যাংক কর্মচারী সোহেল আহমেদ, ছাত্রনেতা বারিকুল ইসলাম লিজন, ব্যবসায়ী কে এম আহসান উল্লাহ, জাহিদ বাবু, জামাল আহমেদ, সঞ্জু হোসেনসহ আরো প্রায় ১০-১২ জন ছয় বছর ধরে নিয়মিত আসেন মাঠে। রাজ্জাক বলেন, ‘আমাদের মধ্যে একটা ভারি বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। মেয়ের বিয়ে, ছেলের মুসলমানিতে যেমন আমরা পরস্পরকে সাহায্য করি, বাড়ির উঠান মেরামতেও তেমনি হাত লাগাই। ফুটবল আমাদের বন্ধুত্ব বাড়িয়েছে। ’

 

এখন মাঠটিও পরিষ্কার থাকে

মেহেরপুরে যত খেলার মাঠ আছে, কলেজ মাঠটিই বেশি উপযোগী। আগে মাঠে জংলা ছিল। উঁচু-নিচু ছিল অনেক জায়গা। সন্ধ্যা হলে বসত নেশার আড্ডা। এখন রাজ্জাকরা সব পরিষ্কার করেছেন। বন্ধ হয়েছে নেশার আড্ডা।  

 

সতীর্থরা বলেন

সোহেল আহমেদ বলেন,  ‘ছয়-সাত বছর ধরে  ফুটবল খেলছি। কোনো কোনো সময় ছেদ পড়লে রাজ্জাক ভাই ফোন দেন। মাঠে আসতে বলেন। আমিও আবার হাজির হয়ে যাই। ’ জাহিদ বাবু গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। বললেন, আব্দুর রাজ্জাক মাঠটিকে ধরে রেখেছেন। আমাদের কাছে প্রতিটি সকাল এখন নতুন ভোর। আমাদের সবার মধ্যেই দারুণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। শরীরের যত্ন নিতেই খেলি। প্রতিযোগিতার জন্য নয়। ’ আহসান উল্লাহর বয়স পঞ্চাশ। বলেন, ‘ছোটবেলায়ও খেলতাম। মাঝখানে খেলার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। রাজ্জাকের প্রেরণায় আবার মাঠে এসেছি। কোনো দিন মিস করলে মন খারাপ থাকে। ’

            ছবি : লেখক


মন্তব্য