kalerkantho


আরো জীবন

বানরওয়ালা

সাভারের পোড়াবাড়িতে বেদেপাড়া। এ পাড়ায় বানরের খেলা দেখায় একজনই। নাম খায়রুল। মাসুম সায়ীদ দেখা করে এসেছেন

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বানরওয়ালা

‘ওই যে নদীর ধারের বাড়িটা। মসজিদের পাস দিয়ে সোজা চলে যান।

’ খায়রুলদের বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল একজন। পথটা খুব সরু। একজন মাত্র লোক হাঁটতে পারে। মাথায় ঘুরছে একটা ছবি—সাদা লুঙ্গি আর ফতুয়া পরা একটা লম্বা হ্যাংলা-পাতলা চালাক লোক। বগলে একটা ময়লা ঝোলা। হাতে ডুগডুগি আর কাঁধের ওপর একটা লালমুখো বানর। মাঝেমধ্যেই সে আসত। সেই ছোটবেলার কথা। অবশেষে শেষ হলো পথ। ঘরটা মাচার ওপর। খায়রুল বাড়ি ছিল না। তবে ফোন পেয়ে আসতে দেরিও করল না। কোথায় সেই সাদা লুঙ্গি আর ফতুয়া? এ যে সরল চেহারার নিরীহ এক মানুষ। খুবই সাধারণ। মুখে লাজুক হাসি।

 

খায়রুলের মা-বাবা

পাঁচ ভাই আর দুই বোনের মধ্যে খায়রুল তৃতীয়। বাবা নুরুজ্জামান মিয়া। মা তাজেল বিবি। হ্যাঁ, রূপবান যাত্রার সেই তাজেল—তারই নামে এই নাম। দাদা মোনছের আলী মাল। মাল (বৈদ্য) বেদেদের ৯টি শাখার একটি। এদের পেশা সাপের বিষঝাড়া, দাঁতের পোকা ফেলা, রসবাতের তেল বেচা ও শিঙা লাগানো। এরা সাপ ধরে বিক্রি করে কিন্তু সাপের খেলা দেখায় না। মোনছের মাল বৈদ্যগিরি বা কবিরাজগিরিই করত। চিকিৎসাব্যবস্থায় উন্নতি আর দিন দিন মানুষের সচেতনতা বাড়তে থাকায় কবিরাজিতে ভাটা পড়ে। নুরুজ্জামান তাই বৈদ্যগিরি বাদ দিয়ে শুরু করে সাপের খেলা। খায়রুলের অন্য ভাইয়েরাও তাই করে। খায়রুলই শুধু দেখায় বানরের খেলা। সাপ খেলাও দেখায়, তবে অবরে-সবরে।

 

শ্বশুরবাড়ির উপঢৌকন

খায়রুলের শ্বশুরবাড়ি যশোরের বারোবাজারে। তারাও বেদে। তবে পেশা বানরের খেলা দেখানো। আত্মীয় বাড়িতে বেড়ানোর সূত্র ধরে আরিফার সঙ্গে পরিচয়। তারপর পারিবারিকভাবেই বিয়ে। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে তাকে উপঢৌকন হিসেবে দেওয়া হয় একটি মেয়ে বানর। নাম গোলাপি। গোলাপি রীতিমতো শিক্ষিত। দাদা শ্বশুর নিজ হাতে শিখিয়ে-পড়িয়ে দক্ষ করে তুলেছেন গোলাপিকে। শুধু গোলাপিকে নয়, সঙ্গে খেলা করানোর তালিমটাও তাঁরা দিয়েছেন খায়রুলকে। সাপ খেলা দেখানোর অভ্যাসটা তাঁর ছিলই। গোলাপির সঙ্গে ভাব হতে সময় লাগেনি খায়রুলের। সেই থেকে গোলাপি খায়রুলের সঙ্গে। তাই বলে আরিফা তাকে সতিন মনে করে না। ভাবে বোন। বাপের বাড়ির সাথি। লালমুখো গোলাপি কাঠের দাওয়ার এক কোণে বাঁধা ছিল খুঁটির সঙ্গে। অনেক খেলাই জানে গোলাপি। লাঠি হাতে চৌকিদার, পুলিশের চোর ধরা, ঘোলের হাঁড়ির বাক কাঁধে ঘোষ মশাই, লেংড়া বুড়োর হেঁটে যাওয়া, এমনকি দেখাতে পারে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধও। পারে বন্ধু পাতিয়ে হাত মেলাতে। করতে জানে সালাম। খেলা শেষে বাটি হাতে ঘুরে ঘুরে টাকা তোলে। আর খায়রুলের ইশারা পেলে পায়ে ধরে পড়ে থাকতে জানে টাকা না দেওয়া পর্যন্ত। বয়স আছে গোলাপির। ৩০ বছরের মতো হবে।

 

খায়রুলের পরিবার

খায়রুলের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে বড়। বছর ছয়েক বয়স। নাম খায়রিনা আক্তার। খলি গায়ে কপালে কাজলের একটা যোগচিহ্ন এঁকে সে সেই তখন থেকে বাবার গা ঘেঁষে ঘেঁষে আছে। ছেলেটা একেবারেই ছোট। স্ত্রী আরিফার গাওয়ালে (গ্রামে গ্রামে ঘুরে খেলা দেখানো বা শিঙা লাগানো) যাওয়ার অভ্যেস নেই। বেদেনির হাত ছাফাই খেলা, শিঙা লাগানো, তুকতাক চিকিৎসা কোনোটাই তার জানা নেই। আর জানার আগ্রহও নেই। খায়রুলও চায় না আরিফা গাওয়াল করুক।

 

দেশের ভেতরেই ঘুরে ফেরে

বেদেদের ভালো রোজগার হয় ভারতে। এপাড়ার অনেকে মাঝেমধ্যেই পারি জমায় ভারতে। ফিরে আসে মোটা উপার্জন করে। কিন্তু কখনো সীমানা পার হয়নি খায়রুল। ভারতে যারা তারা অনেকটা চালাক-চতুর। কিন্তু স্বভাবে খায়রুল বেশ সরল আর শান্ত। বেদে সম্প্রদায়ের নিজস্ব একটি ভাষা আছে। সেটা সে জানে। কিন্তু ভারতে যেতে হলে হিন্দি, উর্দু আর আসাম ও বিহার অঞ্চলের বাংলাটাও জানতে হয় ভালো। সেটা সে জানে না। তাই দেশের ভেতরই তার সীমানা।

 

সেই দিন আর নেই

বানরের খেলায় লোকের আগ্রহ আর কৌতূহল এখনো আছে। তবে আগের মতো টাকা-পয়সা তেমন কেউ দেয় না। দিনে চার-পাঁচ শ টাকার মতো হয়। তবে আয়-ব্যয়ের হিসাবে সব সময় থাকে গরমিল। মা-বাবার সঙ্গেই থাকে খায়রুল। মা এখন আর গাওয়ালে যেতে পারে না। বাবা সাপ খেলা ছেড়ে বেদেপাড়ার মোড়ে বসে মাঝে মাঝে মাছ বিক্রি করে। বানরের খেলার আয়ে তাদের চলা কষ্ট হয়ে যায়। অথচ কী দিন ছিল! সুখের সেই দিন স্মরণ করতে খায়রুলের বাবা নুরুজ্জামান গেয়ে ওঠে জসীমউদ্দীনের গয়া বাইদ্যার গান— ‘মোরা পঙ্খি মারি পঙ্খি ধরি/ মোরা পঙ্খি বেইচা খাই/ মোদের সুখের সীমা নাই...। ’ একসময় সত্যি তাদের সুখের সীমা ছিল না। নৌকায়ই বসবাস করত বেশির ভাগ সময়। নৌকা নিয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াত। এক মাস রোজগার করলে বাকি এগারো মাস বসে খাওয়া যেত। তাই ডাঙায় থিতু হয়ে জমিজিরাত কিনে চাষাবাদ করতে চায়নি কোনো দিন। দুর্দিন শুরু হয়েছিল তার কালেই। সুসময়ের আশায় তখন জমি না কিনে ছেলেদের দিয়েছিলেন স্কুলে। মাথা ভালো নয় বলে খায়রুল থেমে গিয়েছিল ক্লাস টুতেই; কিন্তু পরের দুজনের একজন শফিক এসএসসি পাস করে গিয়েছিল কলেজে। আর অন্যজন—মিনারুল উঠেছিল ক্লাস টেনে। এ লেখাপড়া ভাগ্য বদলাতে পারেনি তাদের। এখন সাপ খেলা দেখিয়েই তারা কোনো রকমে দিন চালিয়ে নিচ্ছে। পড়ালেখার পেছনে সময় আর টাকা খরচ না করলে অন্যদের মতো তাদেরও ঘর থাকত পাকা—আফসোস তাজেল বিবির।  


মন্তব্য