kalerkantho


এগিয়ে যাও বাংলাদেশ

ইমু আপার রক্ত

বিরল গ্রুপের রক্তের অধিকারী ইমু। অন্যের প্রয়োজনে এই রক্ত সে দিতে চায় কিন্তু অনেকেই নিতে চায় না। কারণ সে হিজড়া। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শাখাওয়াত উল্লাহ

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ইমু আপার রক্ত

২৫ বছরের তরুণ সুমনের দুটি কিডনিই নষ্ট। বাঁচার আশা খুব বেশি নেই। মা ছালেহা বেগম হারতে নারাজ। নিজের রক্তের গ্রুপ আর ছেলে সুমনের রক্তের গ্রুপ এক। মা একটি কিডনি দিলেন। কিডনি প্রতিস্থাপনের সময় বিপত্তি। রক্তের প্রয়োজন। যেখানে কিডনি পাওয়া গেছে, সেখানে পজেটিভ গ্রুপের রক্তের জন্য আর চিন্তা কি? তবে সেই রক্তের জোগাড় হয়নি অপারেশনের দিন পর্যন্ত! আজই সুমনের জন্য অন্তত এক ব্যাগ এবি পজেটিভ রক্ত দরকার। আত্মীয়-স্বজন, ফেসবুক বন্ধু কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না রক্ত।

স্বজনরা খোঁজ পেল নজরুল-নাজনীন দম্পতি সারা দেশে মানুষকে বিনা মূল্যে রক্ত সংগ্রহ করে দেন। তাঁদের আছে রক্তদানের জন্য একটি কল সেন্টারও। ফোন করা হলে নজরুল বললেন, ‘টেনশন করিয়েন না, রক্ত সংগ্রহ করা কোনো ব্যাপার না।’ নজরুল খোঁজ নিতে শুরু করলেন। না, ঢাকায় তাঁর সংগ্রহে রক্তদানের উপযোগী কোনো এবি পজেটিভ গ্রুপের ডোনার নেই। যাঁরা আছেন, তাঁরা দূরে। নজরুল বিপদে পড়ে গেলেন। তখনই মনে পড়ে গেল ১৫-২০ দিন আগের কথা।

টিএসসিতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন নজরুল-নাজনীন দম্পতি। একজন হিজড়া এসে টাকা চাইল, ‘এই ভায়া কিছু দেও।’ নজরুল অভ্যাসবশত বললেন, ‘রক্ত দিবেন? রক্তের গ্রুপ কী আপনার?’ ‘আমরা তো হিজড়া। আমাদের রক্ত কে নেবে?’ সোজাসাপ্টা উত্তর। নজরুল সেখানেই তাঁর রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে দেখলেন এবি পজেটিভ। ইমু কথা দিলেন নজরুল যখন রক্তের জন্য কল দেবেন তখন রক্ত দেবেন।

ইমুর কথা ভেবেই নজরুল সুমনের আত্মীয়দের বললেন, ‘একজন ডোনার আছেন, যিনি হিজড়া।’ এ কথা শুনেই সুমনের স্বজনরা হতাশ। নজরুল বুঝিয়ে বললেন, ‘তাঁর রক্ত পরীক্ষা করার পর ডাক্তার যদি বলেন কোনো সমস্যা নেই, তবেই তো রক্ত নেবেন।’ তাঁরা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললেন। তারপর রাজি হলেন রক্ত ঠিক থাকলে নেবেন।

হিজড়াদের একা দূরে কোথাও যাওয়া নিষেধ। তাই নজরুল ফোন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমু চলে এলেন আরেক বান্ধবী নদীকে নিয়ে। দুই বান্ধবীকে নিয়ে নজরুল চলে গেলেন শ্যামলীর হাসপাতালে। এখানে এসে আরেক বিপদ। গার্ড কোনো অবস্থাতেই হাসপাতালে হিজড়াদের ঢুকতে দেবে না। নজরুল অনেক বুঝিয়ে বললেন তাঁরা রক্ত দেবেন। তারপর ডাক্তারের হস্তক্ষেপে তাঁরা হাসপাতালে ঢুকলেন। ডাক্তার রক্তের সব টেস্ট করে বললেন, ‘রক্তে কোনো সমস্যা নেই। ইমুর রক্তে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই।’

ইমুর রক্ত পরীক্ষার সময় ডাক্তার সুমনের জন্য আরো এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন বলে জানালেন। ইমু নদীকে রাজি করালেন রক্তের গ্রুপ মিললে নদীও রক্ত দেবেন। নদীর রক্তের গ্রুপও এবি পজেটিভ! তাঁর রক্তেও সমস্যা নেই। ইমু আর নদীর রক্তে সুমন সুস্থ হয়ে উঠলেন।

‘মানুষকে রক্ত দিতে চাইতাম; কিন্তু কেউ তো আমাদের রক্ত নেবে না। রক্ত দিতে পেরে ভালো লাগল। রক্ত যখন নিচ্ছিল, তখন খুব ভয় পাইছিলাম। তারপর তো দেখি কোনো সমস্যা নাই। এখন কারো দরকার হলে অবশ্যই রক্ত দেব।’ বলছিলেন ইমু।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঁধনের সংগঠক শাহরিয়ার মাহমুদ বলেন, ‘এখানে অনেক হিজড়া আছেন। তাঁদের মধ্যে এখন দুয়েকজন রক্ত দিচ্ছেন। একবার ঢাকা মেডিক্যালে একজন হিজড়ার জন্য রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল; কিন্তু অনেকেই হিজড়া দেখে রক্ত দিতে চাননি। পরে অনেক কষ্টে ডোনার সংগ্রহ করতে হয়েছিল। এখন সে পরিস্থিতি বদলে গেছে। হিজড়ারাও রক্ত দিতে উৎসাহী হচ্ছেন।’

ইমুরা মানুষের প্রয়োজনে পাশেও থাকতে চান; কিন্তু সমাজ তাঁদের মেনে নিতে পারে না। আফসোস করে বলেন, ‘আমি যদি একটা দোকান দিই, কেউ আমার দোকান থেকে কিছু কিনবে না। আমরা যখন সাহায্য চাই, তখন মানুষ আমাদের কত বকাবকি করে। আমাদের গায়ে হাত পর্যন্ত তোলে। আমাদের জীবনটা তো আর সাধারণ মানুষের মতো না।’

চারুকলার একজন শিক্ষার্থী ইমু সম্পর্কে বলেন, ‘তাঁকে অনেক দিন ধরে ক্যাম্পাসে দেখি। সবার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করে।’ ইমুকে যখন জানানো হলো, আপনাকে নিয়ে পত্রিকায় লেখা হবে। তখন রাজি হননি। জানালেন ছবি তুলতে হলে দলনেতার অনুমোদন লাগবে। তাঁকে যখন বুঝানো হলো যে আপনাকে নিয়ে লিখলে অনেকেই রক্তদানে উৎসাহী হবে, তখন রাজি হলেন। ‘যা হওয়ার হোক, ছবি তোলেন। আমার চাচা একজন প্রফেসর মানুষ, বাবা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, আমার ছোট বোনটির বিয়ে হয়নি। পত্রিকায় ছবি এলে হয়তো তাদের ক্ষতি হবে।’ পরিবার আর সমাজের সুবিধার কথা চিন্তা করে এসব ছেড়েছেন অনেক আগেই। খুব বেশি চাওয়া-পাওয়া নেই এখন। শুধু মানুষের কাছাকাছি থাকতে চান।

 

ছবি : শিহাব শাকিল


মন্তব্য