kalerkantho


লোকশিল্প দরদি

লোক ও কারুশিল্প নিয়ে সেই ১৯৬১ সাল থেকে কাজ করছেন মালেকা খান। এবারের আন্তর্জাতিক বুননশিল্প উৎসবে ৭৬ বছর বয়সী মালেকা খানকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে গল্প করে এসেছেন মাহবুবর রহমান সুমন

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



লোকশিল্প দরদি

১৯৪০ সালের ১ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের রসুলপুরে দাদাবাড়িতে জন্ম। সেখানেই স্কুল। পরে ঢাকায় এসে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ থেকে আইএ ও বিএ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে সমাজকল্যাণে স্নাতকোত্তর করেছেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে। একসময় সংগঠনটির পূর্ব পাকিস্তান অংশের অর্গানাইজিং সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থার (১৯৭১-৭৬) সঙ্গে। প্রথমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিলেও একসময় সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন বাংলা ক্রাফটের সঙ্গে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বাংলা ক্রাফটের সভাপতি ছিলেন। তখন তিনি গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প নিয়ে।

দেশ-বিদেশে উপস্থাপন করেছেন বাংলাদেশের এই শিল্পকে। প্রকাশ করেছেন অসংখ্য জার্নাল। এখন ব্যস্ত ‘নকশি কাঁথা বাংলাদেশের নন্দিত শিল্পের স্মারক (অতীত, বর্তমান ও রূপান্তরের ধারাবাহিকতা)’ বই লেখার কাজে। উল্লেখ্য, তিনি হস্ত ও কারুশিল্প নীতিমালা ২০১৫-এর অন্যতম প্রস্তাবক।

 

লোকশিল্পে প্রেম

ছোটবেলায় গ্রামের উঠানে কাঁথা বুনতে দেখেছেন। গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে দেখেছেন হাতে নানা কিছু তৈরি করতে, যেগুলো গ্রামের লোকেরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস হিসেবে ব্যবহার করতেন। ছোটবেলার এসব দৃশ্য থেকে তাঁর লোকশিল্পের প্রতি ভালোবাসা জন্মে। তবে তখন তিনি এসবের কিছুই বুঝতেন না। গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনে কাজ শুরু করার সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। তখনই বিভিন্ন এলাকার লোকশিল্প, জামদানি, তাঁতশিল্প, মৃিশল্প দেখে এসব বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ জন্ম নেয়। বিভিন্ন এলাকায় যখন কাজ করতে যেতেন, তখন বিকেলের সময়টা ফাঁকা থাকত। তখন এলাকার ঐতিহ্যবাহী এসব জিনিসের খোঁজে বেরিয়ে পড়তেন। গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে তখন শোভাযাত্রা ও ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্রের প্রদর্শনী হতো। সেখানে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ভিন্নভাবে তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য উপস্থাপন করত। প্রতি আয়োজনেই পূর্ব পাকিস্তান জয়ী হতো। সেই গল্প মালেকা বললেন, ‘একবার ঢাকা রেসিডেনসিয়াল স্কুলে এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আমার ওপর দায়িত্ব পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে কাজ করার। তখন আমি চট্টগ্রাম গিয়ে যারা এমন কাজ করে তাদের জিনিসপত্রসহ ঢাকায় নিয়ে আসি। তাদের ঢাকায় থাকার ব্যবস্থা করি। মেলা শেষে তাদের টাকা-পয়সা দিয়ে ফেরার ব্যবস্থা করি। সে অনুষ্ঠানেও পূর্ব পাকিস্তান জয়ী হয়। ’

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে মালেকা

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে মালেকা খাতুন অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে শুনেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ। যুদ্ধের সময় গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে মেয়েদের হোম নার্সিং ও ফাস্ট এইডের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। শুরু থেকেই মালেকা খান যুক্ত হন কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে সংগঠিত কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থার সঙ্গে। কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে কাজ করতেন তিনি। তাঁর কাজ ছিল নির্যাতিত মেয়েদের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা। তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে সাহায্য করা। নির্যাতিত মেয়েদের পুনর্বাসনের কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। মালেকা খান বলেন, ‘সেই সময় মেয়েদের উৎসাহ দিতাম। তাদের মনের কথা, প্রয়োজনের কথা শুনতাম। কে কী কাজ করতে পারে, সেগুলো শুনতাম। তাদের মানসিক শান্তির জন্য সব সময় কাজের মধ্যে রাখতাম। একবার এক মেয়ে বলল, আপা আমাকে পাট এনে দেন। পাট এনে দেওয়ার পর আমি অবাক হলাম তাঁর পাটের দ্রব্য তৈরি করা দেখে। সেখান থেকে আরো উৎসাহ পেয়েছিলাম এই শিল্প নিয়ে কাজ করতে। তারপর দেখলাম মেয়েদের কেউ পাটের কাজ পারে, কেউ জামদানির কাজ করতে পারে। তখন যে যে কাজ করতে পারে, তাকে সে কাজে আরো পারদর্শী করতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। ’ উল্লেখ্য, মালেকা খান ১৯৫২ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ৪ ফেব্রুয়ারি কামরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন।

তারপরের গল্প

১৯৭৯ সাল থেকে মালেকা খান বাংলা ক্রাফটের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া তিনি এ দেশের লোকশিল্প, বিশেষ করে জামদানি, নকশি কাঁথা, মৃিশল্পসহ অন্য প্রায় সব বিষয় নিয়ে জার্নাল প্রকাশ করেছেন। সেখানে এসব শিল্পের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরেছেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে এসব শিল্পের পরিবর্তনের ইতিহাসের কথা বলেছেন। গবেষণা করেছেন এসব শিল্পের আন্তর্জাতিক মান ও বাজার নিয়ে। অংশ নিয়েছেন বিদেশি বিভিন্ন সেমিনারে। সেই গল্পে তিনি বললেন, ‘এক সেমিনারে আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল—আপনি একটি ছোট দেশ থেকে এসেছেন। আমাদের সঙ্গে আপনাদের সংস্কৃতির কী পার্থক্য দেখছেন? উত্তরে বলেছিলাম, দেখছি তোমাদের সংস্কৃতি কয়েক বছরের পুরনো আর আমাদের সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরনো। ’ তিনি প্রধানত এই শিল্প নিয়ে কী কাজ করেন—এ প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘আমি প্রকৃত শিল্পীদের কাছে যাই। তাদের পরামর্শ দিই, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। যেমন ধরেন, একজন জামদানির কারিগরকে আমি বোঝাই আন্তর্জাতিক বাজারে এখন কী রং বা কী ধরনের জামদানির চাহিদা বেশি। সেই লক্ষ্যে কাজ করার জন্য প্রয়োজন হলে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। ’ ২০১৩ সালে জামদানি বয়নের পদ্ধতিকে অনন্য সাধারণ ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত দিয়েছে ইউনেসকো। সে অর্জনেও রয়েছে মালেকা খানের অবদান।

ইকেবানার মালেকা

ইকেবানা হচ্ছে জাপানিজ ফুল সাজানোর একটি পদ্ধতি। নান্দনিক এ শিল্পটি এখন থেকে প্রায় পাঁচ শ বছরেরও বেশি পুরনো। এই পদ্ধতিতে ফুল সাজালে তা অনেক দিন সতেজ আর আকর্ষণীয় থাকে। মালেকা খান বাংলাদেশে এই ইকেবানার প্রচারের জন্য জাপান সম্রাটের কাছ থেকে পুরস্কারও পেয়েছেন। এই ইকেবানায় বাংলাদেশে তাঁর অনেক ছাত্র রয়েছে।

 

একান্ত মালেকা

মালেকা খানের বসার ঘরের দেয়ালজুড়ে সাজানো রয়েছে বাংলার লোকশিল্পের হাজার বছরের পুরনো বিভিন্ন অনুষঙ্গ। ৭৬ বছর বয়স হলেও এখনো শরীরে ও মনে সে ছাপের দেখা পাওয়া যায় না। এখনো ব্যস্ত সময় পার করছেন লোকশিল্পের বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখির কাজে। তিনি মনে করেন, তাঁর মতো যাঁরা এ বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সেগুলো লিখে রাখা উচিত। তা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম এসব ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান হারাবে। এ ছাড়া যত দিন পারেন তিনি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান।


মন্তব্য