kalerkantho


ফিরে এলো

টিকাটুলীর মতিন

গানটির বয়স প্রায় তিন দশক। মুখে মুখে ফিরছে আবার এখন। আরে টিকাটুলীর মোড়ে, একটা অভিসার সিনেমা হল রয়েছে—ঢাকা অ্যাটাক সিনেমায় গানটির প্রথম লাইন। গানটির গীতিকার ও শিল্পী মতিন চৌধুরীকে খুঁজতে গিয়েছিলেন মাহবুবর রহমান সুমন

৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



টিকাটুলীর মতিন

মতিন চৌধুরীর গানের মজমা

পুরো গান

আরে টিকাটুলীর মোড়ে একটা অভিসার সিনেমা হল রয়েছে

হলে নাকি এয়ারকন্ডিশন রয়েছে

আ আরে ভাই একদিন গেলাম সিনেমা দেখতে। আর রিকশা থেকে নেমে দেখি

হলে একটি সুন্দরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

হঠাৎ দেখি সেই মেয়েটির চোখে আমার চোখ পড়েছে

হলে নাকি এয়ারকন্ডিশন রয়েছে।

 

আ আরে ভাই, হাউসফুল কোনো টিকিট নাই

দশ টাকার টিকিট ব্ল্যাকে বিশ টাকায় কিনে নিয়ে কোনো রকমে ভেতরে ঢুকে বসলাম

হঠাৎ দেখি পাশের চেয়ারে সেই মেয়েটি

আমার পাশেই বসেছে

হলে নাকি এয়ারকন্ডিশন রয়েছে।

 

আ আরে ভাই সিনেমা আরম্ভ হয়ে গেল

রাজ্জাক-শাবানা যখন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন আমার বুকে ভেতর ধুপধাপ শুরু হয়ে গেল।

আমি যদি প্রেম করতে পারতাম

তখন দেখি পাশের সিটে বসা সেই মেয়েটি আমাকে চিমটি মেরেছে।

হলে নাকি এয়ারকন্ডিশন রয়েছে।

 

আ আরে ভাই সিনেমা শেষ হওয়ার পথে, রাজ্জাক ভিলেন যখন ধুপধাপ মারপিট

আবার শাবানা দৌড়ে এসে রাজ্জাককে বলল, আমি তোমার চিরদিনের সাথী

তখন দেখি পাশের সিটে বসা সেই মেয়েটি আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।

হলে নাকি এয়ার কন্ডিশন রয়েছে।

 

আ আরে ভাই, সিনেমা শেষ হয়ে গেল

বাইরে আসলাম, রিকশা নিলাম

হঠাৎ দেখি সেই মেয়েটি দৌড়ে এসে

আমার রিকশায় চেপে বসেছে

হলে নাকি এয়ারকন্ডিশন রয়েছে।

 

আ আরে ভাই, মেয়েটি বলল ডার্লিং খুব ক্ষুধা পেয়েছে

গেলাম মোস্তফা হোটেলে

খুব পোলাও কোরমা খাইলাম

হঠাৎ দেখি বয় একটা পাঁচ শ টাকার বিল এনেছে।

বিলটা দেখে তখন আমার মাথা ঘুরেছে।

হলে নাকি এয়ারকন্ডিশন রয়েছে।

 

আ আরে ভাই, খাওয়াদাওয়া শেষ হয়ে গেল

মেয়েটি বলল, ডালির্ং আজকের মতো চলে যাই বলে চলে গেল।

আমি বাড়ি এসে রিকশা থেকে নেমে

রিকশা ভাড়া দিতে দেখি

মেয়েটি আমার পকেট মেরে চলে গিয়েছে।

হলে নাকি এয়ারকন্ডিশন রয়েছে।

 

মতিনের দাদা ছিলেন গানের মাস্টার। তবে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছে বাবার কাছে। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মতিন সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই গানপাগল। ১৯৬৮ সালে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে তাঁর জন্ম। বয়স যখন ১৬ তখন থেকেই বগুড়ার এখানে-সেখানে গান গেয়ে বেড়াতেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় আসেন। ওঠেন উত্তরায় ফুফুর বাসায়। প্রয়াত ওস্তাদ আখতার সাদমানির কাছে তালিম নেওয়া শুরু করেন। পাশাপাশি ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গান গেয়ে বেড়ান। এখন ওই একটি গানের সুবাদেই ৫০টি জেলায় গান গাওয়ার দাওয়াত পেয়েছেন।

 

গ্যারিসন হল থেকেই টিকাটুলী

বগুড়ার একটি অনুষ্ঠানে প্রথম গানটি গেয়েছিলেন মতিন প্রায় ৩০ বছর আগে। ‘সে সময় ঢাকায় ঘুরতে আসতাম মাঝেমধ্যে। সিনেমা দেখতাম সময় পেলে। একদিন গিয়েছিলাম গ্যারিসন হলে। সোনাবউ ছবিটি চলছিল। হলের সামনে একটা দৃশ্য দেখে চোখ আটকে গেল—রিকশা থেকে নামল এক যুগল। তাঁরা টিকিট কাউন্টারে গিয়ে টিকিট পেল না।   তারপর ব্ল্যাকে টিকিট কেটে হলে গিয়ে ঢুকল। গানটির কথা আমি ওই ঘটনা দেখেই লিখেছি। বগুড়ায় প্রথম গাওয়ার পর লোকে হাততালি দিল। ঢাকায় এসে গাইতে থাকি গানটি। ঢাকা অ্যাটাক ছবিতে যেটি শুনছেন তাতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সে কাজটি করেছেন আমার বন্ধু মামুন আকন্দ। ’ বলছিলেন মতিন চৌধুরী।

মতিন চৌধুরী ও মামুন আকন্দ

এবার মামুন কিছু বললেন

২০০২ সালের ঘটনা। বন্ধুদের আড্ডায় গানটি গাইতেন মতিন। একদিন আমার মনে হলো, গানটির কথা কিছু অগোছালো। মতিন ভাইকে বললাম, আপনি চাইলে আমি হাত লাগাতে পারি। মতিন ভাই রাজি হয়ে  গেলেন। এরপর থেকে গানটি সেভাবেই গাওয়া হতে থাকে। জনপ্রিয়ও হয় তুমুল। এরপর ২০১০ সালে সারা ভিশনের আমজাদ হোসেন গানটি শোনেন। তিনি মতিন ভাইয়ের একটি একক অ্যালবাম প্রকাশের আগ্রহ দেখান। অ্যালবামটির নাম দেওয়া হয়েছিল, জীবন হলো সিগারেটের ছাই। টিকাটুলী গানটিও ছিল তাতে। শ্রোতার মন কেড়ে নেয় ওই গান। ’

ঢাকা অ্যাটাকে গানটির দৃশ্য

ঢাকা অ্যাটাকে টিকাটুলী

একবছর আগের কথা। মতিনের মোবাইলে ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে একজন চাইলেন, ‘আপনি কি মতিন চৌধুরী, যিনি টিকাটুলী গানটি  গেয়েছেন?’ মতিন বললেন, ‘হ্যাঁ। ’

তখন অপর প্রান্ত থেকে পরিচালক দীপঙ্কর দীপন নিজের পরিচয় জানালেন। আর বললেন, ‘আপনাকে আমি দুই মাস ধরে খুঁজছি। টিকাটুলী গানটি আপনাকে দিয়ে সিনেমায় গাওয়াব। আমার অফিসে এসে একবার দেখা করেন। ’ মতিন প্রথমে ভেবেছিলেন কেউ তাঁর সঙ্গে মজা করছে। তাই চুপ মেরে রইলেন। পরের দিন আবার ফোন। একই কথা। এবার বন্ধু মামুনকে জানাতেই হয়। মামুন দেখা করার পরামর্শ দিলেন। পরের দিনই অবশ্য প্রধান সহকারী পরিচালক ফয়সাল আহমেদ নিজেই দেখা করতে চলে এসেছিলেন। তারপর মতিন গিয়ে পরিচালকের সঙ্গে দেখা করেন। পরিচালক বললেন, ‘গানটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চাই। ’ কথায় অল্প কিছু তবে সুরে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হলো। সুর করেছেন শাহীন কামাল। সংগীতায়োজনে ডিজে রাহাত ও মীর মাসুম।

 

অভিনয়ও করেছেন মতিন

গানে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি গান গাওয়ার দৃশ্যে অভিনয়ও করেছেন মতিন। বললেন, ‘পরিচালক জানালেন গানটি খুঁজতে বেশি সময় না লাগলেও আমাকে খুঁজে বের করতে তাঁর দুই মাস সময় লেগেছে।   গানটি জনপ্রিয়, কিন্তু গায়ককে কেউ চেনে না। তাই পরিচালক আমাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করাতে চাইলেন। দুই রাত ধরে এফডিসিতে শুটিং হয়েছে। প্রথমে একটু ঝামেলা হয়েছে তবে পরিচালক গুছিয়ে নিয়েছেন। ’ 

 

ওই দেখ টিকাটুলীর মতিন

আগে কখনোই অভিনয় করেননি। কিন্তু এক সিনেমাতে মুখ দেখিয়েই দারুণ পরিচিতি পেয়েছেন মতিন। এখন রাস্তা দিয়ে গেলে, লোকে বলে, ওই দেখ টিকাটুলীর মতিন। মতিনের খুব ভালো লাগে। পরিচালক দীপনের কাছে দারুণ কৃতজ্ঞ মতিন।

 

ছবি: শামসুল হক রিপন


মন্তব্য