kalerkantho


বাংলাদেশির কীর্তি

অণুজীববিজ্ঞানী সমীর সাহা

ইউনেস্কোর কার্লোস জে. ফিনলে পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের অণুজীববিজ্ঞানী ড. সমীর কুমার সাহা। ঢাকা শিশু হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলোজি (অণুজীববিজ্ঞান) বিভাগের প্রধান এই অধ্যাপক এখন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রয়েছেন। স্কাইপেতে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আতাউর রহমান কাবুল

৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অণুজীববিজ্ঞানী সমীর সাহা

ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা

নিউমোনিয়া হলো ফুসফুসের প্রদাহজনিত রোগ। সাধারণত ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে।

বয়স্ক লোক, দীর্ঘদিন রোগে ভোগা লোক ও শিশুদের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি বেশি। প্রথমে সর্দি-কাশির মতো সাধারণ উপসর্গ থাকলেও পরে মারাত্মক আকার ধারণ করে। বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ এই নিউমোনিয়া। অপরদিকে মস্তিষ্কঝিল্লির প্রদাহজনিত রোগ হলো মেনিনজাইটিস। নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিস রোগের জীবাণু হলো ‘নিউমোকক্কাস’। ঠিক কোন ধরনের নিউমোকক্কাস দ্বারা নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিস হয়, তা খুঁজে বের করেন সমীর সাহা ও তাঁর দল। এটি করতে ২০ বছরের মতো গবেষণা করতে হয়েছে তাঁদের।

এসব ভ্যাকসিন যাতে বিনা মূল্যে বাংলাদেশের শিশুরা পেতে পারে সে জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও বক্তব্য দেন সমীর সাহা। একপর্যায়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘সর্বদলীয় নিউমোকক্কাস কমিটি’ হয়।

এই সংস্থার কিছু সদস্য বাংলাদেশেও আসেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে এ দেশে নিউমোকক্কাস ভ্যাকসিনের যাত্রা শুরু হয়। ইউনেসকো বলেছে, সমীর কুমারের এসব কাজ বাংলাদেশে শিশুস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারই স্বীকৃতি এই পুরস্কার।

পাকিস্তানের অণুজীববিজ্ঞানী অধ্যাপক শাহিদা হাসনাইনের সঙ্গে যৌথভাবে এই পুরস্কার পেয়েছেন ড. সমীর। শাহিদা হাসনাইন পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও মলিকুলার জেনেটিক্স বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন। পুরস্কারের ১০ হাজার মার্কিন ডলার যৌথভাবে পাবেন দুজন। ৬ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ৩৯তম অধিবেশনে দুই অণুজীববিজ্ঞানীর হাতে তুলে দেওয়া হবে এই পুরস্কার।

জে. ফিনলে পুরস্কার ছাড়াও ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিতে বিশেষ অবদানের জন্য আমেরিকান সোসাইটি অব মাইক্রোবায়োলজির পুরস্কার লাভ করেন সমীর সাহা। তিনি বলেন, ‘ঢাকা শিশু হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল অর্ধেক রুম দিয়ে, সেই বিভাগ এখন তিন হাজার স্কয়ার ফুট। ইউনেসকোর পুরস্কার আমার কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ভাবতেই পারিনি আমাকে এভাবে সম্মানিত করবে। পুরস্কারটি শুধু আমার জন্যই নয়, এটি বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ ঘটনা। আমি এই বিশেষ প্রাপ্তিতে আনন্দিত ও অভিভূত। আমার কাজে আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে আমার হাসপাতাল, আমার টিম, পরিবার, এবং সর্বোপরি সরকার। আমার টিম আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশের কোনো একটি হাসপাতালে বসে এ রকম একটি স্বীকৃতি পাওয়া একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য খুবই ডেডিকেটেড একটি টিম দরকার, যেটি আমাদের আছে। ’

 

পেছনের গল্প

১৯৫৫ সালে নোয়াখালীর এক ব্যবসায়ী পরিবারে সমীর সাহার জন্ম। ১৯৭৫ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতক করার পর মাইক্রোবায়োলজিতে স্নাতকোত্তর করেন। ১৯৮৩ সালে যোগ দেন ঢাকা শিশু হাসপাতালে। এরপর ভারতের বানারসের ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্স থেকে মেডিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ের ওপর পিএইচডি করেন। ফিরে এসে ১৯৮৯ সালে আবার যোগ দেন শিশু হাসপাতালে। তিনি বলেন, ‘অনেক কঠিন একটি বিষয় মাইক্রোবায়োলজি। ওই সময় স্পেসিফিক মাইক্রোবায়োলজি বলতে শিশু হাসপাতালে তেমন কিছু ছিল না। প্রথম দিন থেকেই চেষ্টা ছিল কিছু একটা করব। বারান্দায় একটা টুলের ওপর বসে একাই কাজ করতাম তখন। ’ 

সমীর সাহার পিএইচডির গবেষণা ছিল ডায়রিয়ার জীবাণু নিয়ে। মূলত ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেই কাজ করতে হতো। তিনি দেখলেন, ডায়রিয়ায় শিশুমৃত্যুর হার কমলেও বেশি মারা যাছে নিউমোনিয়া, টাইফয়েড ও মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে। তখন তিনি নিউমোনিয়ার নির্দিষ্ট দুটি জীবাণু নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।  

 

জে. ফিনলে পুরস্কার

কার্লোস জুয়ান ফিনলে (৩ ডিসেম্বর ১৮৩৩—২০ আগস্ট ১৯১৫) কিউবান চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী। পুরো নাম জুয়ান কার্লোস ফিনলে ওয়াই বেরিস। তিনি পীতজ্বরের ওপর গবেষণা করা প্রথম দিককার বিজ্ঞানীদের একজন। ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানী কার্লোস জে. ফিনলে পুরস্কার চালু করে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। গবেষণার মাধ্যমে অণুজীববিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের ১৯৮০ সাল থেকে এই পুরস্কার দেয়া হচ্ছে।

 

অণুজীববিজ্ঞানী পরিবার

সমীর সাহার পরিবারকে ‘অণুজীববিজ্ঞানী পরিবার’ বলা চলে। স্ত্রী সেতারুননাহারও একজন অণুজীববিজ্ঞানী। সমপ্রতি অবসর নিয়েছেন বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে। এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে সেঁজুতি সাহা টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মলিকুলার বায়োলজিতে পিএইচডি করেছেন।

ছেলে সুদীপ্ত সাহা অণুজীববিজ্ঞানে ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টো থেকে ডিগ্রি নিয়ে এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল হেলথ বিষয়ে পড়ছেন।

ড. সমীর সাহা একাধারে ঢাকা শিশু হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলোজি বিভাগের প্রধান, চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) নির্বাহী পরিচালক, কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট টাইফয়েডের (সিএটি) স্টিয়ারিং কমিটির প্রধান, নিউমোকক্কাল অ্যাওয়ারনেস কাউন্সিল অব এক্সপার্টসের সদস্য এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইনভেসিভ ব্যাকটেরিয়াল ডিজিজ সার্ভিলেন্সের কারিগরি উপদেষ্টা।


মন্তব্য