kalerkantho


অদম্য মানুষ

মামুনকে দেখে বোঝাই যায় না

ওমর ফারুক মামুন কম্পিউটারে এতই সড়গড় যে ইয়াদুল মোমিনও প্রথম দেখায় বুঝতে পারেননি তিনি চোখে দেখেন না

৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মামুনকে দেখে বোঝাই যায় না

মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের ছোট ছেলে মামুন। এইচএসসি পরীক্ষার সময় গ্লুকোমায় আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তবে হারাননি মনোবল ও ইচ্ছাশক্তি। তাই ২৮ বছর বয়সী এ যুবক এখন মেহেরপুর সদর সমাজসেবা কার্যালয়ের একটি প্রকল্পের কম্পিউটার প্রশিক্ষক। তার নিজেরও আছে একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার। যখন সে ক্লাসে থাকে, দেখে বোঝার উপায় নেই সে চোখে দেখে না।

 

মালয়েশিয়া গিয়েছিল

গত বছরের জুলাই মাস। জাপান ব্রেইল লাইব্রেরি মালয়েশিয়াতে আয়োজন করেছিল একটি আইসিটি কর্মশালার। ১৫ দিনের আয়োজন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে জসিম তৃতীয় স্থান লাভ করে। দুটি সফটওয়্যার জসিমকে খুব সাহায্য করে—জেএডাব্লিউএস (জব অ্যাকসেস উইথ স্পিচ) এবং এনভিডিএ (নেটওয়ার্ক ভিস্যুয়াল ডিজ-অ্যাবিলিটি অ্যাপস)।

বাড়িতে জসিমের চলতে ফিরতে অসুবিধা হয় না, তবে বাইরে গেলে সাদাছড়ি লাগে। প্রতিদিন সকালে একাই বাড়ি থেকে বের হয়ে কখনো ভ্যানযোগে, কখনো বা মটরসাইকেলে চড়ে চলে আসেন কেদারগঞ্জ বাসসন্ট্যান্ড। পরে সেখান থেকে বাসযোগে মেহেরপুর সদরের সমাজসেবা কার্যালয়ে হাজির হন যথাসময়ে।

 

পৃথিবীতে আসার আগেই দুঃখ এসেছিল

মায়ের গর্ভে আসার মাস খানেক পরে মামুনের বাবা আব্দুর রহমান ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যান। মামুন দাদা আর চাচাদের স্নেহ পেয়েছে। খুব মেধাবী ছিল। চাচারা ভাবত বড় হয়ে ডাক্তার হবে। যখন সে নবম শ্রেণিতে পড়ে তখন হঠাৎ তার মাথাব্যথা শুরু হয়। পরিবারের লোকজন প্রথমে ভেবেছিল লেখাপড়ার চাপে হয়তো এমন হচ্ছে। কিন্তু মাথাব্যথা কিছুতেই কমে না। পরে স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মামুনের মামা আনারুল ইসলাম ২০০৩ সালে তাকে নিয়ে যান রাজধানীর একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তার চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়ে। চিকিৎসক বলেন, ‘এটা ভালো হওয়ার রোগ নয়, এমনকি দুটি চোখই আলো হারিয়ে ফেলতে পারে। ’

 

কলকাতায়ও গিয়েছিল

ঢাকার ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে মামুন। পরে তাকে কলকাতায়ও নেওয়া হয়। কিন্তু কথা ওই একই—এ রোগ ভালো হওয়ার নয়। এরপর ২০০৪ সালে এসএসসি পাস করে মামুন। এইসএসসিতে ভর্তি হয় মুজিবনগর সরকারি কলেজে। এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরপরই দুই চোখেরই আলো নিভে যায়। সে আর দেখতে পায় না। পরীক্ষা সব শেষও করতে পারেনি মামুন। পুরো পরিবারেই নেমে আসে অন্ধকার। মা অঝোরে কাঁদতে থাকেন। মামুন স্বেচ্ছাবন্দি হয় বাড়িতে। এভাবেই কেটে যায় প্রথম চারটি বছর।

 

আসে ২০১০ সাল

ঝিনাইদহের এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর মানুষের কাছে ছয় দিনের একটি কম্পিউটার ট্রেনিং করে মামুন। তাঁর কাছ থেকেই জেডাব্লিউএএস সফটওয়্যারটি সংগ্রহ করে। বাড়ি ফিরে প্র্যাকটিসও করতে থাকে। পরে যখন যেখানে সমস্যা হতো, যাকে কাছে পেত সমাধান নিত। পাশাপাশি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচএসসি প্রগ্রামে ভর্তি হয়। সেখান থেকে ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করে তিনি। এখন বিএসএসও করছে।  

 

মামুন বলে

আমার চোখের সমস্যা হওয়ার পর বাসায় বসে থাকতাম। সে সময় শুধু ভাবতাম, কী হবে। একদিন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের একটি কথা জানতে পেরে আমি নড়ে বসি। তিনি বলেছিলেন, স্বপ্ন হচ্ছে সেটাই, যেটা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না। তখন থেকে আমি আর নিজেকে গুটিয়ে রাখিনি। বাস্তবতা মেনে নিয়ে স্বপ্ন সফল করার কাজে লেগে গেলাম। আমি কম্পিউটার শিখেছি। কম্পিউটার চালানোর সময় মনেই হয় না আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। আমার অনেক ইচ্ছার একটি ছিল মুজিবনগরের কেদারগঞ্জ বাজারে একটি আইসিটি সেন্টার গড়ে তোলা। সেটি এখন বাস্তব। আমার সেন্টারের নাম আইকন আইসিটি ও কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার। আমি এখানে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিতে চাই। চাই ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে তারা স্বাবলম্বী হোক।  

 

মামুনের ছাত্র-ছাত্রীরা

সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রকল্পটিতে চারটি ব্যাচে ক্লাস নেন মামুন। প্রশিক্ষণার্থী ২০০ জন। একজন যেমন মুসলিমা খাতুন। বলল, ‘মামুন স্যারের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। তিনি দারুণ দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন। ’

আরেকজন জহুরুল ইসলাম বলল, ‘মামুন স্যার অনেক ভালো ক্লাস নেন। ’ মামুনের সহকর্মী এস এম রাসেল। বলল, ‘সে দারুণ উদ্যমী ও কর্মচঞ্চল। মনেই হয় না দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তার কাছ থেকে আমি নিজেও অনেক কিছু শিখেছি। ’                            

 

ছবি: লেখক


মন্তব্য