kalerkantho


বঙ্গ জীবনের অঙ্গ

দুলালের তালমিছরি

বেঁচে থাকলে দুলালচন্দ্র ভড়ের বয়স ১০০ হতো। বাঙালি ব্যবসা জানে না—কথাটির মুখে ছাই দিয়ে মিছরিটি দুই বাংলারই বাজার গরম রেখেছে ৮০ বছর ধরে। তাই কেওকারপিন হেয়ার অয়েল, ব্রিটানিয়া থিন-অ্যারারুট বিস্কুট বা মার্গো সাবানের মতো দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরিও বঙ্গ জীবনের অঙ্গ। খবর করেছেন মাসুম সায়ীদ

৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দুলালের তালমিছরি

শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা ১৪২৪। দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরির বিজ্ঞাপন

বৃষ্টি-বন্যা আর শীতের বাংলায় তখন সর্দি-কাশি ছিল নিত্যসঙ্গী।   গুড়-চিনিতে কৃমি বাড়ে—ভরসা তাই তালমিছরি।

পুরোদস্তুর ওষুধ ওই তালমিছরি। এখন আর চিনির মিছরি তেমন মেলে না। তালমিছরি কিন্তু আছে বহাল তবিয়তেই। আর তালমিছরির কথা উঠলেই আসে দুলালচন্দ্র ভড়ের নাম। এক-দুইটা নয়, টানা আট দশক ধরে সর্দি-কাশি, আর পেটের পীড়ায় বাঙালি ভরসা রাখছে দুলালচন্দ্রের তালমিছরির ওপর। হ্যাঁ, চোখ বন্ধ করে।

 

দুলালের শুরু

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কলকাতার হাওড়ার হাটে দুলালদের কাপড়ের রমরমা ব্যবসা। দাদা, বাপ-চাচারা শ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছেন না।

নবীন দুলালচন্দ্রের মন গেল নতুন পথে। ধবধবে সাদা মিছরির দিকে। এর চাহিদা তখন তুঙ্গে। তবে অল্প দিনেই সাদা মিছরি ছেড়ে ধরলেন লালচে তালমিছরির কারবার। সাহস আর উৎসাহ জোগালেন দাদামশাই জওহরলাল ভড়। দু-একজন খুদে ব্যবসায়ী আগে থেকেই ছিলেন এই ব্যবসায়। কিন্তু দুলালচন্দ্র নিয়োগ করলেন সর্বশক্তি। কাপড়ের ব্যবসায়ের দীর্ঘ দিনের সুনাম আর প্রতিপত্তিও কাজ দিল। দারুণ ফলও পেলেন হাতে হাতে। অন্যদের উঠে যেতে হলো অল্প দিনেই। আর দুলালচন্দ্র পেলেন একচেটিয়া বাজার।

 

ব্যবসায়িক নিষ্ঠা

নতুন এই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য দুলালচন্দ্রের একাগ্রতার কমতি ছিল না। অল্প দিনের মধ্যে তিনি তালমিছরির উৎপাদন আর বিপণন ব্যবস্থাকে নিয়ে গেলেন অন্য উচ্চতায়। গুণগত মানের কারণে হু হু করে বাড়ছিল বাজার। তখনকার দিনে কোনো ব্যবসাতেই ট্রেডমার্ক বা প্যাটেন্টের চল ছিল না। কিন্তু দুলালচন্দ্র ব্যবসাটাকে একান্তই নিজের করার জন্য শুরু করলেন চেষ্টা। অবশেষে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের আস্থা অর্জন করেই বের করলেন রেজিস্ট্রেশন নম্বর—৩৯৬৫। সেই থেকে আজও প্লাস্টিকের বোতলের গায়ে লেবেলে যুক্ত থাকে এই নম্বর। যদিও এখন আর এই নম্বর দরকার হয় না। তবু বাবার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন ছেলে ধনঞ্জয় ভড়।

 

বেচাবিক্রির কথা

তখনকার দিনে মিছরি যেত বস্তায় ভরে। নানা মাপের চটের বস্তায় প্যাক হয়ে তালমিছরি পৌঁছে যেত নানা প্রান্তরে। বাংলার সীমা ছাড়িয়ে আসাম, আহমেদাবাদ, ওড়িশায়ও। আজও সমানতালে চলছে রপ্তানি। বিক্রির জন্য বিশেষ কোনো তত্পরতা নেই। নেই কোনো নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র রাজ্যের বাইরে। ক্রেতারা মোবাইল ফোনে অর্ডার দিয়ে অ্যাডভান্স টাকা মিটিয়ে দেন। তারপর মাল যায় ট্রান্সপোর্টে। বড়বাজারের অফিস থেকেও সরাসরি মাল বুক হয়। ‘বাবাকে কোনো দিনও ঘুষ দিয়ে ডাক্তার ধরতে হয়নি। প্রডাক্ট প্রেসক্রাইব করার জন্য গিফট ছাড়তে হয়নি। সর্দি-কাশি আর পেটের ব্যামোয় আজও মানুষ বেছে নেন আমাদের তালমিছরি। ’ আনন্দবাজার পত্রিকায় (২৭ আগস্ট ২০১৭) এ কথা বলেছেন দুলালচন্দ্রের ছেলে ধনঞ্জয় ভড়।

 

কী রহস্য তালমিছরিতে

স্বনামধন্য এই তালমিছরির প্রকৃত রহস্য কী? ‘আসলে দ্রব্যগুণ! তালের খাঁটি রস আর সামান্য চিনি ছাড়া তো তেমন কিছু থাকে না। ’ ধনঞ্জয়বাবুর সরল জবাব। তাল-গুড় জ্বাল দিতে হয় একটা নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত। তালমিছরির এই পর্বটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। জ্বাল শেষে ফুটন্ত গুড় ঢালা হয় ট্রে বা পাত্রে। তারপর বিশেষ চট দিয়ে ঢেকে দিয়ে পাত্রগুলো একটা বন্ধ ঘরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রেখে দিতে হয়। সাত-আট দিন পর পাত্রের ওপর ও নিচের অংশ শুকিয়ে দানা শক্ত হয়ে মিছরিতে পরিণত হতে থাকে। তখন মাঝখানে জমে থাকা জলীয় অংশ বিশেষ পদ্ধতিতে বের করে নেওয়া হয়। চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণের প্রথম ভাগ—মোট চার মাস মিছরির মৌসুম। তমলুকের খাঁটি গুড় আর বংশপরম্পরায় যুক্ত অভিজ্ঞ কারিগরের কারণে আট দশকে এতটুকুও টলেনি তালমিছরির ব্যবসা—বলেছেন ধনঞ্জয় ভড়। ঝড় গেছে কিছু। তবে তেমন বেশি কিছু নয়। পারিবারিক বিবাদে জড়িয়েছে ভড়েরা। আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। সেটা দুলালচন্দ্র বেঁচে থাকতেই ১৯৮০ সালে। ভাই সনাতনের সঙ্গে বিবাদ। উল্লেখ্য দুলালচন্দ্র পরলোকে গেছেন ২০০০ সালে।  

 

বাংলাদেশে দুলালচন্দ্র

দুই বাংলা ভাগ হলেও দুলালচন্দ্রের তালমিছরি সীমানার তোয়াক্কা করেনি। সাভার নামাবাজারের শংকর স্টোরের মালিক মদন সাহার কাছেই শোনা যাক সে কথা। ‘দুই পুরুষের ব্যবসা আমাদের। সেই বাবার আমল থেকেই দুলালচন্দ্রের তালমিছরি বিক্রি হচ্ছে এই দোকানে, চলছে এখনো। ’ এরপর সাভার বাসস্ট্যান্ডের শাহজালাল মার্কেটের দেওয়ান স্টোরের কর্মচারী মোস্তাকের কাছে যাই। ১৮-২০ বছর বয়স তাঁর। ক্যাশ কাউন্টারের ওপরই সে সাজিয়ে রেখেছে প্লাস্টিকের দুটি বোতল। গায়ে দুলালচন্দ্রের ছবি ও স্বাক্ষরযুক্ত লেবেল। ‘দুলালের তালমিছরিটাই বেশি চলে। ’ হাসিমুখে বললেন মোস্তাক। এভিনিউ সুপারশপ সাভারের সুপরিচিত এক নাম। এখানকার পুরনো বিক্রয়কর্মী জনি। তার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা—কাস্টমাররা দুলালচন্দ্রের তালমিছরি নাম ধরেই চেয়ে নেয়। শুধু সাভার কেন, বাংলাদেশের সব জায়গাতেই দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরি পরিচিত এক নাম। কথা হয় স্কুলশিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে। বরিশালের উজিরপুরের মানুষ তিনি। ১৯৮৬ সালে উজিরপুরেরই এক গ্রামে তিনি প্রথম দুলালচন্দ্রের তালমিছরির দেখা পান। তিনি অবাক হন ভেবে, বিশ্বায়নের এই যুগে যখন ঘরের জিনিসই পর হয়ে যাচ্ছে, তখনো দুলাল আছেন স্বমহিমায়। একটি তালমিছরির বয়স ৮০ বছর! তুচ্ছ নয় মোটেই।

এভিনিউ সুপারশপ, সাভার

 

ছবি: লেখক ও সংগ্রহ


মন্তব্য