kalerkantho


সুপ্রভাত বাংলাদেশ

সুলতানের ছবি আঁকেন দেলোয়ার

দেলোয়ার হোসেন। নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার মানিকনগরের সন্তান। ওমানপ্রবাসী। আর্ট তাঁর নেশা ও পেশা। ছবি আঁকার কাজ নিয়েই ওমান গিয়েছিলেন পাঁচ বছর আগে। এখনো সুনামের সঙ্গে ছবি আঁকার কাজ করছেন ওমানের স্কুল-কলেজ, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা বাসাবাড়িতে। খবর নিয়েছেন রায়হান রাশেদ

২৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



সুলতানের ছবি আঁকেন দেলোয়ার

ওমানের সুলতানকে আঁকছেন দেলোয়ার

মানিকনগর প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলেন দেলোয়ার। দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে ছিল কাজী নজরুল ইসলামের ছবি।

মানুষটির চোখে মায়া ছিল। দেলোয়ারকে আকর্ষণ করল। সাদা কাগজের ওপর বলপেন দিয়ে আঁকলেন কবির ছবি। দুখু মিয়ার ছবি দিয়েই শুরু দেলোয়ারের। কারো কাছে শেখার সুযোগ পাননি তিনি। বলা চলে বইয়ের ছবিগুলোই তাঁর গুরু। ১৯৯৫ সালে দুখু মিয়ার ছবি আঁকার দুই বছর পরই দেলোয়ার এঁকেছিলেন দুই বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ও হামিদুর রহমানের ছবি। ওগুলো এঁকেছিলেন দেয়াল থেকে খসে পড়া ইটের টুকরো দিয়ে। দেয়ালেই এঁকেছিল। তার পর থেকে দেয়ালে আঁকার নেশা পেয়ে বসল তাঁকে।

 

মানিকনগরের দেয়াল ভরে গেল

গাছপালা, শাপলা, বকুল ফুল, দোয়েল, ময়না বা চড়ুইয়ে মানিকনগরের দেয়ালগুলো ভরে উঠতে লাগল। তখনকার জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ দেলোয়ারের খুব পছন্দের ছিলেন। সালমান শাহের ছবি অনেক এঁকেছেন তিনি। দেয়ালওয়ালাদের অনেকে বিরক্ত হয়েছেন। বাবা সৈয়দ আলীর কাছে বিচার গেছে। বাবা ছবিটবি আঁকা পছন্দ করতেন না। তাঁরা গরিব মানুষ। পরিবারের কেউ স্কুলে যায়নি। বাবা চাইতেন, ছেলে হালকা-পাতলা পড়াশোনা করে রোজগেরে হোক। কিন্তু দেলোয়ারকে তখন থামানো সোজা নয়। তিনি ছবি এঁকে যেতে থাকলেন আপন আনন্দে। ছেলেবেলায় ফিরলেন দেলোয়ার, ‘তখন নিরানব্বই সাল। নির্বাচন সামনে। আমাদের গ্রামের বিএনপির এক নেতার চোখে পড়েছিল আমার আঁকা একটি দেয়ালচিত্র। তিনি আমাকে বেশ কিছু নির্বাচনী স্লোগান লেখার কাজ দিয়েছিলেন। ’

 

টিফিনের সময় আঁকতেন

কৃষক বাবার রোজগার ছিল সামান্য। স্কুলে টিফিন নেওয়ার সুযোগ তাঁর ছিল না। পিরিজকান্দি হাইস্কুলের সহপাঠীরা যখন খাবার ভাগ করে খেতেন, দেলোয়ার বসে যেতেন ছবি আঁকতে। ঘরে পালা হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করে মা দুই-তিন টাকা দিতেন মাঝেমধ্যে। তা দিয়ে টিফিন পিরিয়ডে এটা-সেটা খেতেন। ভালো পোশাকও ছিল না। তবে ভালো ছাত্র আর হাতের লেখা ভালো হওয়ায় টিচাররা তাঁকে পছন্দ করতেন। ‘বিশেষ করে হেমেন্দ্র স্যার সব সময় উৎসাহ দিতেন। বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন; কিন্তু আমাকে পড়া ছাড়তেই হলো। বাবা আর পারছিলেন না। ক্লাস টেনে উঠেই ঢাকার একটি গার্মেন্টে কাজ করতে চলে যাই। ’ বলছিলেন দেলোয়ার।   

 

মোমের আলোয় ছবি আঁকা

গার্মেন্টে কাজ করেছেন ২০১২ সাল পর্যন্ত। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত, মোমের আলোয় ছবি আঁকতেন দেলোয়ার। একদিন গার্মেন্টেরই এক অনুষ্ঠানে আঁকাআঁকি করেন এমন একজনের সঙ্গে দেখা। লোকটির নাম আশরাফুল। নিজেও ছবি আঁকেন, জানালেন দেলোয়ার। কয়েক দিন পর দেখা করতে বলেন আশরাফুল। চার হাজার টাকা বেতনে গাজীপুরের আশরাফুল আর্ট অ্যান্ড পাবলিসিটিতে চাকরি নেন দেলোয়ার। আশরাফুল তাঁকে তুলি ধরা শেখান। দেলোয়ার গাজীপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জন্যও ছবি এঁকেছেন।

 

ছবি আঁকতে ওমান

কাজ করতে পারলেই খুশি দেলোয়ার। কাস্টমারের কাছে টাকা চাইতে পারতেন না ভালো করে। আশরাফুল আর্ট অ্যান্ড পাবলিসিটিতে কাজ করার সময়ই এলাকার এক বড় ভাই বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি প্রথমে না করে দিয়েছিলেন। পরে যখন বললেন, ‘ছবি আঁকারই কাজ। ’ রাজি হয়ে গেলেন দেলোয়ার। এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে ওমান গেলেন দেলোয়ার। দুই বছর একটি কম্পানির হয়ে আঁকার কাজ করেছেন। তবে বেতন পেতেন না ঠিকমতো, খাবারও না। খারাপ গেছে সময়টা। পরে বাধ্য হয়ে পালান। নিজেই কাজের অনুমোদনপত্র জোগাড় করেন। খুঁজে খুঁজে ছবি আঁকেন। দিনে দিনে পরিচিতি বাড়ে। একসময় ডাক আসতে থাকে ওমানের বড় কম্পানি, সরকারি দপ্তর ও আর্টপ্রিয় মানুষদের বাসাবাড়ি থেকে। ওমানের বর্তমান সুলতান সাইদ কাবুজ বিন সাইদ আল সাইদ ছবিও আঁকেন দেলোয়ার। তাঁর ছবি দেখে ডিগ্রিধারী মানুষও খুশি হন।

 

মা ও মাটির টান

দেশের কথা ভোলেন না দেলোয়ার। ওমানে বসেই আঁকেন বাংলার সবুজ প্রকৃতি, পাখি, নদীনালা ইত্যাদি। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, শিল্পী শাহাবুদ্দীনের ছবিও এঁকেছেন তিনি। বললেন, ‘আমি দেশে ফিরে একটি আর্ট সেন্টার খুলতে চাই। চাই নতুন ছেলে-মেয়েরা আর্ট শিখুক। আর্ট দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক তারা। যেমন শিল্পী শাহাবুদ্দীন করেছেন। আমার খুব ইচ্ছা একবার শিল্পী শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে দেখা করার। ’


মন্তব্য