kalerkantho


তোমায় সালাম

মারিনো রিগন

১৯৭১ সালে চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ফাদার মারিনো রিগন। তিনি ইতালি ও বাংলাদেশের সম্মানিত নাগরিক। ২০ অক্টোবর পরলোকে চলে গেছেন এই বাংলাদেশপ্রেমী। লিখেছেন মামুন রশীদ

২৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মারিনো রিগন

রিগনের বাবা রিকার্দো রিগন ছিলেন কৃষক। পাশাপাশি গ্রামের নাট্যদলে অভিনয় ও গান-বাজনা করতেন।

মা মনিকা রিগন ছিলেন শিক্ষিকা। ৫ জানুয়ারি ১৯২৫ ইতালির ভেনিসে জন্ম নেওয়া মারিনো রিগন ছিলেন আট ভাই-বোনের সবার বড়। বাবাকে দেখেই সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ। আর মায়ের উৎসাহে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা। একটি মঞ্চনাটকে বাবাকে যিশুর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখে মাত্র ছয় বছর বয়সে স্বপ্ন দেখেন পুরোহিত হওয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু ১৯৩১ সালে ইতালিতে নিজ গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণির পাট চুকিয়ে যোগ দেন ক্যাথলিক মিশনারিতে। এরপর মিশনারির তত্ত্বাবধানে হাইস্কুল ও কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে স্নাতক করেন। তারপর পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে স্নাতকোত্তর করেন। ধর্মপ্রচারক হিসেবে অভিবাসী হওয়ার আগ্রহ থেকেই গ্রিক, ফরাসি, লাতিন ও ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেন।

মাত্র ২৮ বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে ধর্মপ্রচারক হিসেবে বেরিয়ে পড়েন পৃথিবীর পথে। ধর্মগুরুদের নির্দেশে বাক্সপেটরা নিয়ে ১৯৫৩ সালের ৬ জানুয়ারি পৌঁছেন ভারতের কলকাতায়। ওখান থেকে ট্রেনে ৭ জানুয়ারি পৌঁছেন বাংলাদেশের যশোরে। এরপর স্টিমারে ঢাকায়। এখানে আর্চবিশপ মিশনে অবস্থানের সময়েই ধারণা জন্মে বাংলাদেশ বিষয়ে। দ্রুত আপন করে নেন বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতিকে। চার মাস পর যাজকের সহকারী হিসেবে আসেন কুষ্টিয়ার ভবেরপাড়া ক্যাথলিক মিশনে। ১৯৫৪ সালে যান সুন্দরবনের পাশে মালাগাজি মিশনে।

সেখানে ছিলেন ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত। এরপর ১৯৬২ সাল পর্যন্ত খুলনা ক্যাথলিক মিশনে কাজ করার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বানিয়াচর মিশনে। ১৯৭৯ থেকে ২০১৪ সালে ইতালিতে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সুন্দরবনের শেলাবুনিয়ার সেন্ট পল মিশনে কাজ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি ছিলেন বানিয়ারচর গ্রামের ক্যাথলিক গির্জার প্রধান যাজক। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও বর্বরতা তাঁকে ক্ষুব্ধ করে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। রাতের বেলা গির্জাকে পরিণত করেন হাসপাতালে। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেন। সেই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা দানের কাজ করেন। স্থানীয়দেরও উদ্বুদ্ধ করেন মুক্তিযুদ্ধে। সেই সময়গুলোতে তিনি বাইনোকুলার চোখে নদীর দিকে লক্ষ রাখতেন। পাকিস্তানি সেনাদের দেখলেই গির্জার ঘণ্টা বাজাতেন। ঘণ্টাধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রা পালিয়ে যেত। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে তিনি চারটি নৌকা বানিয়েছিলেন—‘সংগ্রামী বাংলা’, ‘রক্তাক্ত বাংলা’, ‘স্বাধীন বাংলা’ ও ‘মুক্ত বাংলা’। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো উঠে এসেছে তাঁর ডায়েরিতেও। নিজের ডায়েরি ও চারটি নৌকা ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দিয়ে দেন।

শুধু বাংলাদেশের নয়, বাংলা সাহিত্যের প্রেমেও পড়েন রিগন। তাঁর অনুবাদে ইতালীয় ভাষায় শুধু রবীন্দ্রনাথেরই বই প্রকাশিত হয় অর্ধশত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এত বেশি বই একা অনুবাদের কৃতিত্বও তাঁর। প্রথম অনুবাদ করেন ‘গীতাঞ্জলি’। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। এ ছাড়া তিনি লালনের প্রায় সাড়ে তিন শ গান, জসীমউদ্দীন, শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন কবির কবিতা ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেন।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে বেশ সখ্য ছিল তাঁর। ১৯৭৩ সালে তিনি কবি জসীমউদ্দীনকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধুকে গীতাঞ্জলির ১০৯ নম্বর কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান।

ফাদার মারিনো রিগনের বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব এবং ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রদান করে। এর আগে ১৯৮২ সালে পেয়েছিলেন কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। শুধু বাংলাদেশই নয়, সাহিত্য ও মানবকল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তিনি ইতালির ভেনিসের লায়ন্স ক্লাব পুরস্কার, রকো দি অরো, ড. রবার্ট ডাব্লিউ পিয়াসের ম্যান অব দ্য ইয়ারসহ নানা সম্মাননা পান। ২০১২ সালে আবৃত্তিশিল্পী রবিশঙ্কর মৈত্রী তাঁকে নিয়ে ‘ফাদার মারিনো রিগন : ভেনিস টু সুন্দরবন’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন।

বাংলাদেশকে রিগান আত্মিকভূমি ভাবতেন। তাই প্রিয় বাংলার মাটিতেই চিরনিদ্রায় ঘুমাতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ ছাড়তে আগ্রহী ছিলেন না; কিন্তু ধর্মগুরুদের নির্দেশ মানতে বাধ্য সবাই। তাঁদের নির্দেশ মেনেই ২০১৪ সালে নিজের দেশে ফিরে যান। জন্মভূমিতেই ২০ অক্টোবর ২০১৭ বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় পরলোকে চলে যান এই বাংলাপ্রিয় মানুষটি।


মন্তব্য