kalerkantho


আরো জীবন

চাবিওয়ালা

সমুদ্রসৈকতে যেমন থাকে তেমন বড় ছাতা তাঁর মাথার ওপর। তালা সারাই আর চাবি বানানোই তাঁর কাজ। সঙ্গে ছাতা সারাই, ম্যাচ লাইটারে গ্যাস ভরার কাজটাও করেন। মাসুম সায়ীদ গিয়ে দেখেন মুন্না কিচকিচ শব্দে চাবির খাঁজ কাটছেন। মুন্না সাভার বাজারের অভিজ্ঞ কারিগর

২৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



চাবিওয়ালা

হাতের চাবিটা একটা গাড়ির। আসলটা গেছে ভেঙে।

ভাঙা চাবিটা হাতে করে চালক ছুটে এসেছেন মুন্নার কাছে। বড় একটা টিনের কৌটায় নকল সব চাবি। নকল চাবিতে কোনো খাঁজ থাকে না। আসল চাবির সঙ্গে মিলিয়ে খাঁজ কেটে নিতে হয়। তারপর রেত দিয়ে ঘষতে হয়। মুন্না ঘষা থামিয়ে একবার মিলিয়ে দেখল। তারপর আবার একটু কিচকিচ শব্দ তুলল। নেড়েচেড়ে ভালো করে দেখে চাবিটা তুলে দিল চালকের হাতে। চালক চাবিটা হাতে নিয়ে শুধায়, খাপে খাপ বসবে তো? মুন্না মিষ্টি হাসি দিল। সে নিশ্চিন্ত। চালক গুনে গুনে টাকা দিল।  

 

কাজের ফাঁকে

চালক বিদায় নিলে মুন্নাকে নিয়ে গিয়ে বসলাম নিরিবিলি একটা চায়ের দোকানে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মুন্না খুলল তার জীবনের খেরোখাতা। ২৮ বছর হলো তার এ কাজে। বাবা স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ক্লাস থ্রিতেই থেমে যায় পড়ালেখা। ছয় ভাই-বোন পিঠাপিঠি। মা-বাবা দুজনে হিমশিম খাচ্ছিলেন সংসারটা টেনে নিতে। অগত্যা স্কুল ছেড়ে দিতে হলো। কাঁধ লাগাতে হলো সংসারের ঘানিতে। বড় সন্তান হিসেবে মুন্নার দায়িত্ব কম নয়। কাজ শিখতে খুব একটা সময় লাগেনি। তবে দক্ষতা বাড়ে মিরপুর আর উত্তরার উস্তাদদের সান্নিধ্যে। এখন সে নিজেই ওস্তাদ।

 

বাপ-দাদার কথা

তাঁরা ছিলেন সাটুরিয়ার নয়াপাড়ার মানুষ। সান্দার সম্প্রদায়ের। এটা বেদেদেরই একটা শাখা। এদের মেয়েরা চুড়ি মালা ফিতা ফেরি করে। আর পুরুষদের কাজ ছিল ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহ। দাদা ছানোয়ার সওদাগর বড় কারবারি ছিলেন। নদী থেকে ঝিনুক তুলে নিজেই সংগ্রহ করতেন মুক্তা। কিনতেন অন্যের কাছ থেকেও। তারপর চালান করতেন শহরে। বাবা শরীফউদ্দিনও কিছুদিন মুক্তার কারবার করেছিলেন। নদ-নদীতে ঝিনুক কমে আসায় আর কৃত্রিম মুক্তার প্রচলনের ফলে মুক্তার ব্যবসা ছাড়ে সান্দাররা। শরীফউদ্দিন মুক্তার কারবার ছাড়ার পর শুরু করেন ছাতা সারাইয়ের কাজ। একজন বিহারির কাছ থেকে শিখে নেন তালা-চাবিরও কাজ। এখন অনেক সান্দারই তালা ঠিক করা, চাবি বানানো, ছাতা সারাই এবং টর্চ লাইট ও লাইটার মেরামতের কাজ করে।

 

জলে থেকে ডাঙায়

একসময় নৌকায় করে নদীতে নদীতে ভাসমান ছিল জীবন। বাবা ঝিনুক আর মুক্তার কারবার ছেড়ে ছাতার কাজ ধরে উঠে এলেন ডাঙায়। এক শতাংশ জায়গা কিনে তার ওপর হলো কোনো রকম মাথা গোঁজার ঠাঁই। সরকারের দেওয়া ভূমিহীন বেদে আর সওদাগরদের জায়গা চলে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে। তাদের ভাগ্যে শিকা ছেঁড়েনি। ভাই-বোনরা বড় হতে থাকল। ছোট্ট জায়গায় স্থান সংকুলান আর হয় না। তাই উঠে যেতে হলো ভাড়া বাসায়। সেই থেকে থাকতে হচ্ছে ভাড়া বাসাতেই। বোনদের বিয়ের খরচ জোগাতে হয়েছে কিস্তিতে টাকা ধার করে।

 

নিজের সংসার

নিজেরও সংসার হলো। শ্বশুরবাড়ি টঙ্গী। বলাবাহুল্য, একই গোত্র। কাজও এক। কিন্তু স্ত্রীকে চুড়ি-মালা বিক্রি করতে পাঠায় না মুন্না। খাটুনিটা গায়ে-গতরে ষোলআনা নিজেই খাটে। এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটার বয়স ১৩। পড়ে ক্লাস ফাইভে। আর ছেলেটার বয়স আট। ক্লাস টুতে পড়ে। মুন্নার আশা ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে মানুষ হবে। তবে ছেলেকে নিজেদের কাজটাও শেখাবেন। কাজ জানা থাকলে দাঁড়াতে হবে না কারো দুয়ারে।

 

তালা-চাবির কথা

কথায় কথায় জানা গেল তালা-চাবির নানা কথা। চাবির নমুনা থাকলে শতকরা ৯৫ ভাগ তালারই চাবি বানানো সম্ভব। সম্ভব নষ্ট তালা মেরামত করা। সাধারণ তালা-চাবির পাশাপাশি ডোরলক, সিন্দুক বা আলমিরার লক ঠিক করতে পারে তারা। তালা ভাঙার পর আবার তা মেরামতও করা যায়। সাধারণ চাবি রেত দিয়ে ঘষে হাতেই বানানো যায়। তবে কিছু চাবি বানাতে হয় মেশিন দিয়ে কেটে। সে মেশিনও তার আছে।

 

দরদাম

ডুপলিকেট বা নকল চাবির ছাঁচ পাওয়া যায় চকবাজারে। কিনতে হয় পিস হিসেবে। চাবির ধরন আর আকার বুঝে দাম। দুই টাকা থেকে শুরু। কোনো কোনোটার দাম আবার এক-দেড় শ টাকাও। বেশি দামের চাবিগুলো গাড়ির। চাবি বানানোর মজুরি ১০ টাকা থেকে শুরু। ২০০ টাকা পর্যন্তও পাওয়া যায়। কেউ বাসায় ডেকে নিলে দূরত্ব আর কাজের ধরন বুঝে মজুরি। ক্ষেত্রবিশেষে বকশিশও মেলে। ১০-২০ টাকার কাজই বেশি আসে। দিন শেষে জমে ৪০০-৫০০ টাকা। কোনো কোনো দিন হাজার টাকাও হয়। তবে সে রকম দিন খুব একটা আসে না।

 

ঝামেলাও আছে

ডেকে নিয়ে ফাঁদে ফেলেন কেউ কেউ। কেউ আবার নিজের বাড়ি বলে খুলে দিতে বলেন অন্যের ঘর। তাই ডাক এলে সাবধানে নিতে হয় কাজ। শর্ত জুড়তে হয়। কাস্টমার ভাড়াটিয়া হলে বাড়ির মালিক সঙ্গে থাকলেই কেবল তালা খোলা। আর বাড়ির মালিক হলে রাখতে হয় আশেপাশের লোক। ‘তা ছাড়া আমরা বেশির ভাগ সময় হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিয়ে তালা খুলি। যাতে সারা বাড়ির মানুষ জেনে যায়। ’ এর পরও সমস্যা হয়। কাগজে কিংবা সাবানে চাবির ছাপ নিয়ে অনেকেই আসে ডুপলিকেট চাবি বানাতে। এদের বেশির ভাগই অল্প বয়সী ছেলেমেয়ে। বাবা-মাকে না জানিয়ে বানাতে চায় চাবি। এদের উদ্দেশ্য ভালো না। এ ধরনের কাজ কখনো করে না মুন্না। বারণ করে শিষ্যদেরও। মার্কেটে কোনো দোকানে চুরি-ডাকাতি হলে সন্দেহের তীর আগে তাদের দিকেই ঘোরে। পড়তে হয় পুলিশের জেরার মুখে।

 

দিনকাল

তালা-চাবির কোনো মৌসুম নেই। সারা বছর একইভাব। ভাগ্যের খেয়াল। কোনো কোনো দিন বনি (বউনি) করতেই দুপুর হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো দিন দোকান খুলতে না-খুলতেই কাজ আসে। তবে ছাতার কাজটা শুধু বর্ষাতেই জমে। নদী-খালে মাছ নেই বলে টেঁটা বা ফচকা ইদানীং চলেই না। বাসা ভাড়া আর জিনিসপত্রের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এটে উঠতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। কেউ কেউ নিশ্চিত আয়ের আশায় কাজ নেয় গার্মেন্টে। কেউ যায় বিদেশে। অনেক টাকার ব্যাপার বলে বিদেশের ভাগ্যও হয় না সবার। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে শুধুই ঘুরপাক খায় মুন্নাদের জীবন।        

 

ছবি: লেখক


মন্তব্য