kalerkantho


ঘটনাটি অক্টোবরের

মাতাহারির বিদায়

মারা যাওয়ার পরেই মাতামাতি শুরু হয় মাতাহারিকে নিয়ে। ১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর মাতাহারিকে ফ্রান্সে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির হয়ে গোয়েন্দাগিরির জন্য। অবাক হওয়ার মতো হলেও সত্য, তাঁকে নিয়ে লেখা উপন্যাস আর জীবনকাহিনির সংখ্যা ২৫০। মঞ্চনাটক হয়েছে, টিভি সিরিজও হয়েছে। ১৯৩১ মাতাহারি নামের চলচ্চিত্রের নামভূমিকায় অভিনয় করেন গ্রেটা গার্বো। ২৪ অক্টোবর বিবিসি থেকে সূত্র পেয়ে লিখেছেন আহনাফ সালেহীন

২৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মাতাহারির বিদায়

জেমস বন্ডকেও অনেক রসদ জুগিয়েছেন মাতাহারি

মাতাহারি জন্মেছিলেন ১৮৭৬ সালে নেদারল্যান্ডে। চার ভাই-বোনের সবার বড় ছিলেন।

তাঁকে ডাকা হতো মার্গারিটা বলে। তাঁর বাবা তেল ব্যবসায়ী ছিলেন। পরিবারটি সচ্ছল ছিল। মার্গারিটার ছেলেবেলা হেসেখেলেই কাটে। নামি স্কুলে পড়ারও সুযোগ পেয়েছিল। ১৮৮৯ সালটা দুঃখ নিয়ে এলো। তাঁর বাবা ঋণখেলাপি হয়ে গেলেন। মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। ১৮৯১ সালে মা মারা গেলেন। বাবা আমস্টারডামে আবার বিয়ে করলেন। মার্গারিটাকে হেগে চলে যেতে হলো।

 

মার্গারিটা বিয়ে করে বসলেন

তখন বয়স মার্গারিটার ১৮ মোটে। ডাচ কলোনিয়াল আর্মির ক্যাপ্টেন রুডলফ ম্যাকলিয়ড পত্রিকায় পাত্রী চেয়ে একটি বিজ্ঞাপন দেন। সাড়া দেন মার্গারিটা। ইন্দোনেশিয়াকে তখন ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ নামে ডাকা হতো। সেখানে নিয়োজিত ছিলেন রুডলফ। ১৮৯৫ সালের ১১ জুলাই আমস্টারডামে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ে করে মার্গারিটা সমাজের উঁচু শ্রেণিতে জায়গা পেয়ে যান। টাকাপয়সাও ইচ্ছামতো খরচ করতে পারছিলেন। তারপর ১৮৯৭ সালে জাভা দ্বীপের মালাংয়ে রওনা হয় দম্পতি। তবে সুখী হতে পারেননি মার্গারিটা। কারণ রুডলফ মদ্যপ ছিলেন, স্ত্রীকে প্রহারও করতেন। এক পর্যায়ে মার্গারিটা ভ্যান রিডস নামের আরেক ডাচ অফিসারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং অস্থায়ীভাবে একত্রে থাকতে শুরু করেন। জাভায় গিয়ে ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্য বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন মার্গারিটা এবং একটি ডান্স কম্পানিতে নামও লিখিয়েছিলেন। নাচতে গিয়েই সে নাম নিয়েছিল মাতাহারি। মালয় ভাষায় যার অর্থ সূর্য। ১৯০২ সালে রুডলফের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় মাতাহারির। তত দিনে তাঁরা নেদারল্যান্ডসে ফিরে এসেছেন।

মাতাহারিরূপী গ্রেটা গার্বো

প্যারিস যাত্রা

১৯০৩ সালে সালে প্যারিস যান মাতাহারি। সেখানকার একটি সার্কাস দলে লেডি ম্যাকলিয়ড নাম নিয়ে নাম লেখান। যদিও ম্যাকলিয়ড পরিবার এতে তুমুল আপত্তি জানিয়েছিল। জীবিকার জন্য তিনি চিত্রশিল্পীদের মডেল হিসেবেও কাজ করতেন। ১৯০৫ সালে মাতাহারির নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর নাচ খুব দর্শক টানত। তাঁর উত্তেজক অনেক আলোকচিত্রও পাওয়া যাচ্ছিল বাজারে। উঁচু মহলে তাঁর যোগাযোগও তৈরি হচ্ছিল। পত্রপত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লেখাও ছাপা হচ্ছিল। তবে ১৯১৫ সাল নাগাদ তাঁর নাচের ক্যারিয়ারে ধস নামে। তবে তত দিনে অনেক রাজনীতিবিদ, সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর সখ্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে...

নেদারল্যান্ডস নিরপেক্ষ ছিল। বিশ্বযুদ্ধে দেশটি কোনো পক্ষেই জড়ায়নি। মাতাহারি ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে মাঝেমধ্যেই যাতায়াত করতেন স্পেন আর ব্রিটেন হয়ে। সেসময় ক্যাপ্টেন ভাদিম মাসলভের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান মাতাহারি। মাসলভ ছিলেন ফ্রান্সে নিয়োজিত রুশ পাইলট। ১৯১৬ সালের বসন্তে মাসলভ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে যুদ্ধরত ছিলেন। ওই গ্রীষ্মেই মাসলভ মারাত্মকভাবে আহত হন। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। মাতাহারি প্রেমিককে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার অনুমতি চান। হাসপাতালটি যুদ্ধক্ষেত্রের কাছেই ছিল। নিরপেক্ষ দেশের মানুষ হওয়ায়অনুমতি মিলছিল না। জার্মানদের গোপন খবর এনে দেওয়ার শর্তে ফ্রান্সের এক গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে অনুমতি দিতে রাজি হয়। মাতাহারি যুদ্ধের আগে ক্রাউন প্রিন্স ভিলহেল্ম মানে জার্মানির কাইজার ভিলহেল্ম টু-র ছেলেকে অনেকবার নাচ দেখিয়েছেন। প্রিন্স তখন ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের সিনিয়র জার্মান জেনারেল। গোয়েন্দা সংস্থাটি এ খবর জানত এবং বিশ্বাস করত মাতাহারি প্রিন্সকে আবার প্রলুব্ধ করতে পারবে। ১৯১৬ সালের নভেম্বরে জাহাজে চড়ে রওনা হলেন মাতাহারি। কিন্তু ব্রিটিশ বন্দর ফলমাউথে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো। নিউ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনল। মাতাহারি ফ্রান্সের হয়ে কাজ করার কথা স্বীকারও করলেন। তাঁর কথার সত্যতা প্রমাণিত হলে তিনি ছাড়াও পেলেন। ওই বছরের শেষাশেষি তিনি মাদ্রিদে চলে গেলেন। সেখানে একজন জার্মান সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। কর্মকর্তাকে মাতাহারি অনুরোধ করলেন প্রিন্সের সঙ্গে মোলাকাত করিয়ে দিতে। আরো জানালেন, টাকা পেলে ফ্রান্সের কিছু গোপন খবর তিনি জার্মান বাহিনীকে দিতে পারেন।

মার্গারিটা ওরফে মাতাহারি

ডাবল এজেন্টের নাম এইচ টুয়েন্টি ওয়ান    

১৯১৭ সালের জানুয়ারি মাসে একজন জার্মান গুপ্তচরের কথা জানতে পারে ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাটি। গুপ্তচরের নাম এইচ টুয়েন্টি ওয়ান। টুয়েন্টি ওয়ানের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা হলো। ফরাসিদের মনে মাতাহারির নামই আসছিল টুয়েন্টি ওয়ানের ক্ষেত্রে। আর ওদিকে জার্মান জেনারেল ওয়াল্টার নিকোলাই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন মাতাহারির ওপর। তিনি প্যারিসে শোনা কিছু গুজবই সরবরাহ করছিলেন মাত্র। নিকোলাই তাঁকে বরখাস্ত করলেন। তারপর ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে মাতাহারিকে এলিসি প্যালেস হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হলো। জুলাই মাসে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়। তবে নিশ্চিত প্রমাণ হাজির করা যায়নি। ওই সময় ফরাসি সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহও ছড়িয়ে পড়ে। তাই বিচার কার্য কিছু সময় থমকে যায়। তবে জেরার এক পর্যায়ে মাতাহারি স্বীকার করেন, তিনি জার্মানদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন। তারপর ১৫ অক্টোবর। সূর্য ওঠার একটু আগে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয় মাতাহারিকে।


মন্তব্য