kalerkantho


স্মৃতিচারণা

‘গাছের সঙ্গে কথা বলতেন’

মোকারম হোসেন   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘গাছের সঙ্গে কথা বলতেন’

ছবি : কাকলী প্রধান

প্রায় ২০ বছর আগে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে পরিচয়। রমনা পার্কে ঘুরে ঘুরে একদল শিক্ষার্থীকে গাছপালা চেনাচ্ছিলেন।

আমিও সেই দলে মিশে গেলাম। অনুষ্ঠান শেষে আলাপ। ঠিকানা দিয়ে বললেন, ‘একসময় বাসায় এসো। ’ এভাবেই তাঁর হাত ধরে উদ্ভিদবিদ্যায় হাতেখড়ি। তাঁর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই রমনা পার্কে যাই। দূরে কোথাও অচেনা গাছের সন্ধান পেলে তাঁকে নিয়ে যাই। বাসায় বসে বইপত্র ঘেঁটে পরিচিতি বের করেন তিনি। পাহাড়ের দুর্লভ গাছ এনে আমরা পার্কে লাগাই। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে দিই। রমনা পার্কের উদ্ভিদ সম্ভারকে সমৃদ্ধ করতে সেখানে লাগানো হয় মাকড়িশাল, পালাম, কাউয়াতুতি, কনকচাঁপা, ক্যাশিয়া গ্রান্ডিস, আগর ও কুরচি। রমনা পার্ক ও কার্জন হল লাগোয়া উদ্যানে থিতু হয় আমাদের একমাত্র বুনো ম্যাগনোলিয়া দুলিচাঁপা। বিভিন্ন পার্কে লাগানো এসব গাছ নিতান্তই বিপন্ন ও দুষপ্রাপ্য। বহু কষ্টে এসব গাছের চারা জোগাড় করেছিলেন তিনি। এরই মধ্যে আবার কিছু কিছু গাছে ফুলও ফুটতে শুরু করে।

এক দিন সিদ্ধান্ত হলো, আমরা একটি সংগঠন করব। এর মধ্য দিয়ে সারা দেশে বৃক্ষচর্চার মর্মবাণী ছড়িয়ে দেব। নাম ঠিক করা হলো ‘তরুপল্লব’। বিপন্ন ও আলঙ্করিক বৃক্ষ সংরক্ষণের পাশাপাশি ২০০৮ সাল থেকে তরুপল্লবের মাধ্যমে ‘গাছ দেখা গাছ চেনা নামে’ অনুষ্ঠান শুরু করি। নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ শিক্ষার্থীদের বৃক্ষ ও পরিবেশ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্যই এ অনুষ্ঠান। শুরু থেকেই এ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা, নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া, পাখি পর্যবেক্ষক ও গবেষক শরীফ খান, ইনাম আল হকসহ আরো অনেকে। ড. নওয়াজেশ আহমদও প্রথম দিকের কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তরুপল্লব এ পর্যন্ত ২৫টি অনুষ্ঠান করেছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করেছি আরো বেশ কয়েকটি। গাছ ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে তরুপল্লবের এ কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই অব্যাহত থাকবে।

দীর্ঘ ২০ বছরে গাছ ও প্রকৃতি সম্পর্কে যা কিছু শিখেছি, তার পুরোটাই দ্বিজেন শর্মার অবদান। তাঁর সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি। প্রথম দিকে প্রায় প্রতিদিনই তাঁর বাসায় যেতাম। লেখাগুলো নিপুণ হাতে সম্পাদনা করতেন। শেখাতেন কিভাবে লিখতে হবে। অনুজদের শেখানোর ক্ষেত্রে দারুণ উৎসাহী ছিলেন। নতুন করে লেখা তৈরির সূত্র ধরিয়ে দিতেন। তৈরি করতে চেয়েছেন অসংখ্য উত্তরসূরি। আবার সংগঠনের নতুন কাজ সম্পর্কে নির্দেশনা দিতেন। তত দিনে আমরা আরো কিছু বিপন্ন ও দুর্লভ গাছ খুঁজে বের করি। বাংলাদেশে মাত্র একটি বা দুটি আছে এমন গাছের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্ল্যাকবিন। গাছটির অবস্থান রমনা পার্কের অদূরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার উত্তর পাশের সীমানায়। লাগোয়া মূল সড়কটি বেইলি রোড হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ‘ফ্লোরা অ্যান্ড ফউনা’ অষ্টম খণ্ডের তথ্যমতে, ড. সালার খান ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত একটি জার্নালে এই গাছটির কথা উল্লেখ করেন। অসংখ্য জাতের গাছপালা বিদেশ থেকে এসে আমাদের আবহাওয়ায় চমৎকার মানিয়ে নিয়েছে। এই গাছটিও ব্যতিক্রম নয়। জানামতে, দেশের একমাত্র স্বর্ণ অশোকটি আছে বলধা গার্ডেনের সাইকি অংশে। রংপুর কারমাইকেল কলেজ প্রাঙ্গণে আছে প্রায় শতবর্ষী দুটি কাইজেলিয়া পিনাটার গাছ। পরে অবশ্য এ গাছের বংশবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। পাখিফুলের সবচেয়ে পুরনো দুটি গাছ দেখা যায় নাটোরের উত্তরা গণভবনের প্রবেশ পথের বাঁ দিকে। ধারণা করা হয়, এখান থেকেই গাছটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।

মূলত আমাদের নিসর্গ চর্চার প্রাণকেন্দ্র রমনা। চারপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে এলাকাটি একসময় রমনাগ্রিন নামে পরিচিত ছিল। পার্কলাগোয়া হেয়ার রোড ও বেইলি রোডও বিচিত্র বৃক্ষরাজিতে সুসজ্জিত। আছে অনেক শতবর্ষী দুর্লভ গাছপালাও। সারা বছরই নান্দনিক পুষ্প-প্রাচুর্যে বর্ণাঢ্য থাকে এ পার্ক।

ছায়াঢাকা হেয়ার রোডে আছে শতবর্ষী দুর্লভ পাদাউক বৃক্ষের বীথি। এই বীথি তিনিই আমাকে প্রথম চিনিয়েছেন। গ্রীষ্মের কোনো একদিন অপূর্ব সোনালি রঙের ফুলে ফুলে ভরে ওঠে গাছ। পরের দিন গাছতলায় শুধু ঝরা ফুলের রোদন। তারপাশেই আছে একসার সুদৃশ্য কুসুমগাছ। বসন্তে টকটকে লাল কচিপাতাগুলো বর্ণাঢ্য আয়োজনে মাতিয়ে রাখে গোটা এলাকা। রমনা পার্কের অন্যান্য দুর্লভ সংগ্রহের মধ্যে আছে—পীতপাটলা, কাউয়াতুতি, আগর, জ্যাকারান্ডা, অঞ্জন, বাওবাব, গ্লিরিসিডিয়া, কর্পূর, স্কারলেট কর্ডিয়া, জহুরিচাঁপা, মাধবী, মালতী, রুদ্রপলাশ, লেডিস আম্ব্রেলা, পাখিফুল, সহস্রবেলি, গোল্ডেন শাওয়ার, পালাম, ঝুমকোলতা, লতাপারুল, বনআসরা, মণিমালা ইত্যাদি। নার্সারির পাশে আছে বুনো আমের একটি পুরনো বীথি। এসব গাছ আমি আগে কখনো দেখিনি। আমাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছেন তিনি।

অনতি দূরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সড়কদ্বীপ-লাগোয়া পথের ধারে দুষপ্রাপ্য বুদ্ধনারকেল ও বেরিয়া গাছের কথা প্রথম বৃক্ষাচার্য দ্বিজেন শর্মার মুখেই শুনি। তিনি বলেছেন, গাছ দুটি যিনি লাগিয়েছেন অবশ্যই প্রকৃতি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন। না হয় এমন সামঞ্জস্যতা ঘটত না। গাছগুলো অনেক দূর থেকেই আমাদের দৃষ্টি কাড়ে। স্কারলেট কর্ডিয়ার পুরনো তিনটি গাছ আছে টেনিস কমপ্লেক্সের সামনের দিকে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বাগানে আছে দুর্লভ হাপরমালী, পাখিফুল, মুচকুন্দ, ধারমারা, কনকচাঁপা ও মাধবী। রমনা অঞ্চলের এই বিপুল বৃক্ষ-বৈচিত্র্য ও দুর্লভ বৃক্ষ সমাহারের পেছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি রবার্ট লুইস প্রাউডলক। ব্রিটিশ আমলে ঢাকায় নিযুক্ত লন্ডনের কিউ গার্ডেনের এই উদ্যানী পৃথিবীর উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে যেসব বৃক্ষপ্রজাতি ঢাকায় এনেছিলেন, সেসব গাছই ঢাকার প্রকৃতিকে করেছে বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে প্রাউডলক অন্তরালবর্তী হলে দ্বিজেন শর্মাই আবার তাঁকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।

আমরা একটু সুযোগ পেলেই এসব গাছ দেখতে বেরিয়ে পড়তাম। দ্বিজেন শর্মা তাঁর সন্তানতুল্য গাছগুলোর পাশে দাঁড়াতেন, গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতেন, ওদের সঙ্গে কথা বলতেন। কখনো কখনো আমরা বেঞ্চিতে বসে রমনার ঘনায়মান সন্ধ্যার পবিত্র রূপ দেখেছি। তারপর এক ধরনের মগ্নতার ভেতর ধীরে ধীরে বাড়ির পথ ধরতাম।


মন্তব্য