kalerkantho


শখের তোলা

শামীমের সংগীত সংগ্রহশালা

শামীম আমিনুর রহমানের সংগ্রহে আছে কলের গান থেকে শুরু করে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডেক সেট পর্যন্ত। অভিনব রেডিও এবং পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর দশকের দুষ্প্রাপ্য রেকর্ডও আছে। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের গান, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, চরমপত্রের রেকর্ডসহ অনেক কিছু। দেখে এসেছেন সামিউল্যাহ সমরাট

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শামীমের সংগীত সংগ্রহশালা

১৯৭১। তখনো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি।

তবে বরিশাল শহরের মানুষজনের মধ্যে যুদ্ধের আগাম বার্তা যেন পৌঁছে গিয়েছিল। বরিশাল-ঝালকাঠি মহাসড়কের রায়াপুরে একটি প্রাইমারি স্কুলে  একজন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক স্থানীয় কিছু যুবককে প্রশিক্ষণ দিতেন। পাশেই বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসে প্রায় মাসখানেক ছিল দশ বছরের শামীম। প্রতিদিন ট্রেনিং দেখতে যেত। গান গাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল তারও বছরখানেক আগে। প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে দেশের গান গাওয়ার সুযোগ হলো শামীমেরও। রেডিওতে শোনা ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি গেয়ে শোনায় সে। সবাই পছন্দ করল তার গায়কি। ছোট্ট শামীম বুঝল এই গানের গুরুত্ব। ভাবল, ইস! যদি এই গান নিজের কাছে সংগ্রহ করে রাখা যেত।

ছোটবেলার গান সংগ্রহের ইচ্ছাটা পূরণ করে চলছেন এখনো। সংগ্রহের তালিকাটা শুধু দীর্ঘই নয়, অনেক সমৃদ্ধ। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম সংগীত ও সংগীত-উপকরণের সাম্রাজ্য দেখব বলে। সংগৃহীত পুরনো জিনিসপত্র পরিষ্কার করার জন্য বের করেছিলেন কয়েক দিন আগে। এখনো গোছানো হয়নি।

ছোটবেলার শখ হলেও গানের রেকর্ড আর সংগীত যন্ত্রপাতির সংগ্রহ পুরোদমে শুরু করেন নব্বইয়ের দশকে। বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগ্রহ শুরু করেন। নিজের শখের কথা ছড়িয়ে দেন বন্ধুবান্ধব ও স্বজনদের কাছে। অনেকেই সাড়া দেন। অনেকে মনে করেন পাগলামি।

১৯৯১ সালে শামীম খবর পেলেন ঢাকা কলেজের উল্টো দিকের এক বাড়ির এক ভদ্রমহিলা একটি গ্রামোফোন বিক্রয় করবেন। গেলেন দেখতে। দাম চাওয়া হলো সাড়ে তিন হাজার টাকা। নতুন সরকারি চাকরি। সদ্য বিবাহিত। হিসাব-নিকাশ করে সেই গ্রামোফোন আর কেনা হয়নি। এ রকম সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে নিজের সংগ্রহের পরিসর বাড়িয়েই চলেছেন।

তিন ধরনের তিনটি স্প্রিং ওয়াইন্ড গ্রামোফোন দেখালেন। একটি বড় চোঙাওয়ালা। আর দুটির মধ্যে একটি পোর্টেবল, আরেকটি কেবিনেট আকৃতির। এ দুটির বয়স শত বছরের কাছাকাছি। এখনো সচল। বেশ ঝকঝকে। আমেরিকান গ্রামোফোন কম্পানি কলম্বিয়ার তৈরি রেকর্ড বাজিয়ে শোনালেন শিল্পী নীনা হামিদের বিখ্যাত গান ‘আমার সোনার ময়না পাখি...’  

‘একেবারে নিখুঁত শব্দ পেতে হলে গ্রামোফোন রেকর্ডের জুরি নেই,’ বললেন শামীম। ইলেকট্রিক গ্রামোফোন রয়েছে অনেক। সব বের করে দেখা সম্ভব হলো না। যে চার-পাঁচটি দেখালেন সেগুলো সচল। ফিলিপস কম্পানির স্পুল টেপ আর প্লেয়ারও রয়েছে বেশ কয়টি।

রেকর্ডের ভাণ্ডার দেখে বিস্ময় বেড়ে গেল। ৭৮ আরপিএম, ৪৫ আরপিএম, ৩৩ আরপিএমের দেশি-বিদেশি কম্পানির তৈরি প্রায় আট শতাধিক রেকর্ড জমিয়েছেন। এই রেকর্ডের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গান, নাটক, আবৃত্তি, ঐতিহাসিক ভাষণ।

লাল-সাদা খামে একটি রেকর্ড হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখুন তো ভালো করে। ’ জর্জ হ্যারিসনের সেই কনসার্ট ফর বাংলাদেশের রেকর্ড। দেখালেন বঙ্গবন্ধুর ভাষণের রেকর্ড। ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে সিলেটের নাসির হায়দারের গাওয়া কাওয়ালির রেকর্ডটি রেখেছেন যত্ন করে। ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’, ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো’, ‘সারা বাংলা জেলখানা’, ‘এ ঘর দুর্গ সে ঘর দুর্গ’, ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা’, ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর’, ‘আমি এক বাংলার মুক্তিসেনা’, ‘রক্তের প্রতিশোধ রক্তেই নেব’—এসব গান নিয়ে হিন্দুস্তান মিউজিক্যাল প্রডাক্টস লিমিটেডের ‘বিক্ষুব্ধ বাংলা’র রেকর্ড দেখালেন। এর সংগীত পরিচালক আবদুল জব্বার আর আপেল মাহমুদ। ৪৫ আরপিএমের ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানের রেকর্ডটি দেখতে দেখতে শামীম নস্টালজিক হয়ে গেলেন। আগ্রহ নিয়ে দেখালেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত গানের রেকর্ড সমর দাসের পরিচালনায় ‘একটি ফুলকে বাঁচাব বলে’।

হিন্দুস্তান রেকর্ডসের কয়েকটি রেকর্ড রয়েছে বিখ্যাত শিল্পী অমর পালের। এর মধ্যে পেলাম অংশুমান রায়ের গাওয়া ‘একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের’ গানের রেকর্ডটি।  

সংগৃহীত পুরনো গানের ভিড়ে রয়েছে মেহবুবা রহমান ও মুমতাজ আলী খানের গাওয়া ‘যাইও না যাইও না বন্ধু গো’, মোহাম্মদ আসাফুদ্দৌলার গাওয়া নজরুলসংগীত ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’।

গান ছাড়া নাটকের সংগ্রহে রয়েছে কবি জসীমউদ্দীন রচিত ‘বেদের মেয়ে’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘নটী নন্দিনী’; ‘ডি এল রায়ের লেখা ‘সাজাহান’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’, অমর ঘোষের তরুণ অপেরার ‘আমি সুভাষ’, গীতিনাটক বুদ্ধদেব রায়ের কথা ও সুরে ‘মনসামঙ্গল’।

৩৩ আরপিএম রেকর্ডে রয়েছে গ্রাম্য পালা ‘গুনাই বিবি’, ‘রূপবান’, সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। পপ গানের মধ্যে ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফকির আলমগীর, আজম খানের গান পেলাম। শম্ভু মিত্র, কাজী সব্যসাচী, প্রদীপ ঘোষের আবৃত্তির রেকর্ডও রয়েছে কয়েকটি। রেকর্ডের পাশাপাশি সংগ্রহে আছে হরেক রকম রেডিও।  

সংগ্রাহক শামীম আমিনুর রহমান জন্মেছেন বরিশালে। বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। পড়েছেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ও বুয়েটে। পেশায় স্থপতি হলেও গবেষণা করছেন প্রাচীন বাংলার জাহাজশিল্প নিয়ে, বাইজিদের নিয়ে গবেষণা প্রায় শেষ করে এনেছেন। তাঁর গবেষণার আরেকটি বিষয় হলো প্রাচীন সমাধি। বই লিখেছেন ‘ঢাকার প্রথম আকাশচারী ভানতাসেল’। অষ্টাদশ শতকে ঢাকার প্রথম আকাশচারী আমেরিকান তরুণী ভানতাসেলের করুণ মৃত্যু নিয়ে লেখা এই বই। সংগীতচর্চাও করেন। একদিন গান শোনার আমন্ত্রণ নিয়েই কথা শেষ হলো।

 

ছবি : দেলোয়ার লিটু


মন্তব্য