kalerkantho


মহাযাত্রী

বাদশাহ হুমায়ুন

শের শাহ সুরি যখন তাঁর বিজয়রথ চালাতে চালাতে আগ্রা এসে পৌঁছালেন, বাদশাহ হুমায়ুন লাহোরে পালিয়ে গেলেন। তারপর রচিত হলো এক দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস। সৈয়দ আশফাকুল হাসান সে যাত্রাপথ খুঁজে বেড়িয়েছেন

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বাদশাহ হুমায়ুন

১৫৪০

যদিও পলাতক তবু তো বাদশাহ। নাসির উদ্দিন মুহাম্মদ।

হুমায়ুন নামেই চেনা। মনোবল হারাননি একটুকু। পরিবার-পরিজনসহ তাঁর সঙ্গী ছিল বিরাট এক দল। তাতে পাইক-বরকন্দাজ আছে, সেনা সদস্যরাও আছে। শের শাহ হুমায়ুনকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলেন। আফগানদের কাছেও খবর পাঠিয়ে রেখেছিলেন যেন হুমায়ুনকে শান্তি না দেয়। শের শাহ নিজে একজন পাঠান বা পাখতুন। সুরি তাঁর গোত্রের নাম। শের উপাধি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল কারণ যৌবনে বাঘ মেরেছিলেন। তাঁর আসল নাম ফরিদ খান। যা-ই হোক, হুমায়ুন একপর্যায়ে শের শাহের কাছে বার্তা পাঠালেন, আমি আপনার কাছে সব হিন্দুস্তান ছেড়ে এসেছি, আপনি লাহোরকে ছাড়ুন এবং পাঞ্জাবের সিরহিন্দকে আমাদের মাঝে সীমানা হিসেবে রাখুন। শের শাহ উত্তর দিলেন, আপনার জন্য আমি কাবুল ছেড়ে এসেছি, আপনি বরং সেখানে গিয়ে দেখুন। ওদিকে নিজের ভাই মির্জা কামরান হুমায়ুনকে কাবুলে প্রবেশ করতে দেবেন না বলে জানান। হুমায়ুনের সেনাদল কামরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে চেয়ে ছিল। কিন্তু পিতৃ আজ্ঞার (ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ করো না) কথা মনে রেখে হুমায়ুন মুলতানের পথ ধরলেন।  

১৫৪১

সিন্ধুর তীর ধরে এগোতে থাকলেন হুমায়ুন। ভাই হিন্দালকে পাঠালেন দাদু নামে সিন্ধের এক জায়গার খবর নিতে। হিন্দাল সবুজ সংকেত দিলে তিনি দাদুতে ভাইয়ের সঙ্গে মিলিত হন এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। হিন্দালের এক শিক্ষকের মেয়ে হামিদা বানুও ছিল দলে। তখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর। হিন্দালের তাঁর প্রতি আগ্রহ ছিল। হুমায়ুনও বিয়ের প্রস্তাব দেন। হিন্দাল এতে খেপে যান। হামিদা বানুও গররাজি ছিলেন। অবশেষে ১৫৪১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হুমায়ুনের সঙ্গে হামিদার বিয়ে হয়। নবপরিণীতাকে নিয়ে বাদশাহ ভকর সিন্ধের দিকে রওনা হন। হিন্দাল ভাইয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে কান্দাহারের দিকে যাত্রা করেন।

১৫৪২

হুমায়ুন ভকর দখল করে নেন। তারপর সিন্ধুরই আরেক জায়গা সেহওয়ান দখল করতে যান। কিন্তু সিন্ধের শাসক শাহ হুসেইন হুমায়ুনকে বাধা দেন। সাত মাস সেহওয়ান অবরোধ করে রেখে ভকর ফিরে আসতে বাধ্য হন হুমায়ুন। তত দিনে হুমায়ুন বিপর্যস্ত। ভাবলেন, মক্কা যাত্রার কথা। তখনই যোধপুরের রাজা মালদেও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বার্তা পাঠান। হুমায়ুন তাই জয়সলমির হয়ে যোধপুর যাত্রা করেন। মাঝে জয়সলমিরের রানা আক্রমণ করে বসেন। তবে বাদশাহের বাহিনীর কাছে পরাজিত হন। বাদশাহ আজমীরের ধারে পৌঁছান। তখনই হুমায়ুন একটি বার্তা পান, মালদেওকে শের শাহ লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছেন। নাগর ও আলওয়ার দিয়ে দেবেন মালদেওকে যদি হুমায়ুনকে আশ্রয় না দেন। হুমায়ুন উপায় না দেখে অমরকোটের দিকে যাত্রা করেন। এই সময় হামিদার ঘোড়াটি মারা যায়। হামিদার তখন আট মাসের গর্ভাবস্থা।  

 

পথ যায় মরুভূমিতে

অমরকোটের পথ ছিল খুব কষ্টের। পানির সমস্যা ছিল প্রকট। সঙ্গীদের অনেকেই ছিল পদযাত্রী। মালদেওয়ের বাহিনীও ছিল পেছনে। যা-ই হোক একসময় অমরকোট পৌঁছাতে পারেন হুমায়ুন।

২২ আগস্ট ১৫৪২।   হুমায়ুন অমরকোট পৌঁছান। রানা প্রসাদ ছিলেন শাসনকর্তা। তিনি বাদশাহকে অভ্যর্থনা জানান। ১৫ অক্টোবর ১৫৪২  হামিদা বানু এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। বাদশাহ পুত্রের নাম রাখলেন জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবর।  

 

পারস্য যাত্রা ও সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার

অমরকোট থেকে ভকর যাওয়ার পথে শাহ হুসেইন আবার বাধা দিতে আসেন। ভয়ে বাদশাহর সৈন্যদের অনেকে পালিয়ে যায়। সমঝোতায় আসতে বাধ্য হন হুমায়ুন। সিন্ধ ছেড়ে কান্দাহারের পথে রওনা হন। এই সময় বৈরাম খান তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। মির্জা কামরানের অনুগত কান্দাহারের শাসনকর্তা হুমায়ুনকে পথে আক্রমণ করেন। বাদশাহ তখন হিন্দুকুশ পাহাড় বেয়ে পারস্য যাত্রা করেন। খুব ঠাণ্ডা ছিল তখন। বরফ পড়ছিল। খাবার ছিল না, আগুন জ্বালানোর কাঠ ছিল না। বাদশাহ একপর্যায়ে পূর্ব ইরানের সিস্তানে  পৌঁছাতে সমর্থ হন। পারস্যের শাহ তামাস্প বাদশাহকে সহযোগিতা দিতে সম্মত হন। পরে হুমায়ুন কান্দাহার, কাবুল, বালখ হয়ে হিন্দুস্তান এসে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।


মন্তব্য