kalerkantho


ও আমার দেশ

লিংকনের যুদ্ধ

কুড়িগ্রাম আইন কলেজের অধ্যক্ষ ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্রাহাম লিংকন একটি জাদুঘর গড়ে তুলেছেন। নাম উত্তরবঙ্গ জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঠাসা এ ঘর। বিশেষ করে যুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাসে। দেখে এসেছেন কুদ্দুস বিশ্বাস

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



লিংকনের যুদ্ধ

‘এসেছি, দেখেছি, মুগ্ধ হয়েছি, বেঁচে থাকো লিংকন, বেঁচে থাকুক ইতিহাসবোধ। এই বাংলাদেশে।

তোমরাই বাঁচিয়ে রাখবে। ’ পরিদর্শন বহি নামের মন্তব্য খাতায় কথাগুলো লিখেছিলেন প্রয়াত লেখক সৈয়দ শামসুল হক। তিনি জাদুঘরটি দেখতে গিয়েছিলেন ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর। গেল ৭ ফেব্রুয়ারি লিংকনের জাদুঘর দেখেছেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগের কিপার ড. গোলাম হায়দার। তিনি লিখেছেন, ‘এখানকার সংগ্রহ দেখে আমি অভিভূত, বিস্মিত! আমার দৃষ্টিতে ও অভিজ্ঞতায় জাতীয় জাদুঘর এবং আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের পরে এটি অবস্থান করবে। ’ এ রকম অনেক মন্তব্য রয়েছে পরিদর্শন বহিতে।

 

এটি এখানে

কুড়িগ্রাম জেলা শহর। বেপারীপাড়া। লিংকন নিজের বসতবাড়িতেই গড়ে তুলেছেন উত্তরবঙ্গ জাদুঘর।

দুই তলা বাড়ি। বৈঠকখানাসহ নিচতলায় তিনটি ও দোতলায় চারটি ঘর রয়েছে। ২০১২ সালে জাদুঘরের যাত্রা শুরু। লিংকনের উদ্যোগে বেশি সহায়তা দিয়েছেন তাঁর বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশিদ। সহায়তা পেয়েছেন স্ত্রী নাজমুন নাহার ও ছেলে শাশ্বত গৌরব সিদ্ধার্থর কাছ থেকেও।

 

এখানে যা আছে

বৃহত্তর রংপুর জেলার পাঁচ হাজার ৮৬৫ রাজাকারের তালিকা। যোগদানের তারিখসহ তাঁদের নাম ও ঠিকানা। রয়েছে স্থানীয় দালাল, রাজাকারদের স্বহস্তে লিখিত ক্ষমা প্রার্থনার আবেদনপত্রের কপি। শান্তি কমিটির সদস্যদের তালিকা ও সভার ধারাবিবরণী। আছে পরিত্যক্ত, বাতিল অস্ত্র, নানা দলিল ও প্রতিকৃতি। রয়েছে সেই সেলাই কলটি, যা দিয়ে কুড়িগ্রামে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকাটি তৈরি হয়েছিল। জাদুঘরটিতে রয়েছে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের করণীয় নির্ধারণে ১৯৫৩ সালে লেখা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের লেখা চিঠি। আছে সিজি জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের রাসায়নিক নিক্তি, গ্রেনেড বক্স, সাইক্লোস্টাইল করা রণাঙ্গন থেকে প্রকাশিত অগ্রদূত পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা, উদ্বাস্তু শিবিরের কার্ড ইত্যাদি। আছে চার হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকাও।   

উপরন্তু আছে প্রায় শতাব্দী প্রাচীন আইনজীবীর ডায়েরি ও রেজিস্ট্রি করা নিকাহনামা, উলিপুর থেকে উদ্ধার করা প্রাচীন মন্দিরের টেরাকোটার ইট। সব মিলিয়ে এ জাদুঘরে নিদর্শনসংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।

 

সপ্তাহে এক দিন খোলা

জাদুঘরটি সাধারণের জন্য সপ্তাহে এক দিন মানে শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে আগে থেকে জানালে যেকোনো দিন দেখার সুযোগ। জাদুঘরের কোনো স্টাফ নেই। সাধারণত আব্রাহাম লিংকন কিংবা তাঁর স্ত্রী নাজমুন নাহার জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের ঘুরিয়ে দেখান।

 

লিংকন বললেন

আরো অনেক নিদর্শন উন্মুক্ত করা যাচ্ছে না স্থানাভাবে। নিদর্শনগুলোর আয়ুষ্কাল বাড়ানোর জন্য কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট দরকার। জাতীয় জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সহায়তা দিলে উপকার হয়। জাদুঘরটির জন্য জমি এবং আলাদা ভবন নির্মাণের বিষয়টিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জমি আছে কিন্তু অর্থ সহায়তা প্রয়োজন।   

লিংকন যুদ্ধ দেখেছেন

কুড়িগ্রাম জেল তাঁর বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। ৭ এপ্রিল ১৯৭১। পাকিস্তানিদের গণহত্যাকাণ্ডে জেল পুলিশের পাঁচ সদস্যকে প্রাণ হারাতে দেখেছেন লিংকন। শৈশবের সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারেননি লিংকন। মা-বাবার সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়েছিলেন লিংকন। সেই স্মৃতিও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বীরপ্রতীক তারামন বিবির জন্য লিংকন একটি বাড়ি তৈরি করে দিয়েছেন। জায়গাটি শহরের কাছেই। আশা করছেন এটি গড়ে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুশীলন কেন্দ্র হিসেবে। মূলত রংপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গিয়েই জাদুঘরের জন্য স্মারক সংগ্রহের কাজ শুরু করেন তিনি। বলছিলেন, ‘যেহেতু ছাত্ররাজনীতি করেছি, রাজনীতির প্রয়োজনেই আমাকে উত্তর জনপদের নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। আগ্রহ ছিল এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার। রংপুরে সেনাবাহিনীর শাশ্বত বাংলা জাদুঘরে গিয়েছি। পরে রংপুরের ইতিহাস লেখার সময় কিছু স্মারক হাতে পেলাম। ভাবলাম এগুলো দিয়ে কুড়িগ্রামেই একটি জাদুঘর শুরু করি। ’ 

 

একজন আব্রাহাম লিংকন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রনেতা ছিলেন। ফেলানী হত্যা মামলায় ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। ছিলেন অধুনালুপ্ত ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের উপদেষ্টা। তাঁর স্ত্রী নাজমুন বাংলা সাহিত্য পড়ান কুড়িগ্রামের মজিদা কলেজে। ছেলে সিদ্ধার্থ পড়াশোনা করেন ঢাকায়।


মন্তব্য