kalerkantho


আরো জীবন

শাণের মানুষ

বেশ সুরেলা গলা তমজুদউদ্দিনের। গলি থেকে রাস্তায় হেঁকে যান শি-ল-পা-টা... বঁ-টি ধা-র...। মাসুম সায়ীদ দেখা পেয়েছিলেন দিনকয় আগে

২৬ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



শাণের মানুষ

প্রতি-উত্তরের আশায় কান পেতে থাকেন। বেশির ভাগ সময়ই মেলে না উত্তর।

তবু তমজুদউদ্দিন বলে চলেন, শি-ল-পা-টা... বঁ-টি ধা-র...। একসময় বড় রাস্তায় ওঠেন। বাঁ দিকে আরেকটা গলি দেখে ঢুকে পড়েন। বলেন, শি-ল-পা-টা... বঁ-টি ধা-র...। সারা সকালে এই প্রথম সাড়া মিলল, ‘বঁটি ধার কত?’

 

বঁটি দেখে দাম। বলে দাঁড়িয়ে পড়লেন তমজুদ।

মাঝারি আকারের বঁটি হাতে একটা লোক বেরিয়ে এলেন গেটের ভেতর থেকে। পেছন পেছন একটা শিশু। তমজুদ ২৫ টাকা চাইলেন।

বঁটিওয়ালা ১৫ টাকা বললেন। শেষে রফা হয় ২০ টাকায়। গেটের সামনে শাণের মেশিনটা রেখে তাতে বাইসাইকেলের মতো চড়ে বসে প্যাডেলে পা রাখেন তমজুদ। জিনিসটা আসলে সাইকেলই। গিয়ার চেইন আর প্যাডেলের সাহায্যে ঘোরে শাণের পাথরটা। আগুনের ফুলঝুরি ছুটিয়ে চিঁ চিঁ শব্দ করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাসিয়ে ছাড়লেন বঁটিটাকে। তমজুদ ভালো করে ধার পরখ করে তুলে দিলেন মালিককে। মালিককে সন্তুষ্টই মনে হলো। দিনের প্রথম রোজগার বুঝে নিয়ে তমজুদ আবার ঘাড়ে তুললেন শাণের মেশিন। ‘শি-ল...পা-টা...বঁ-টি ধা-র, কাটাবেন শিলপাটা...। সকাল তখন সবে সাড়ে ৯টা।

 

বড় গ্রামে বাড়ি

হবিগঞ্জের বানিয়াচং এশিয়ার বৃহত্তম গ্রাম। বানিয়াচংয়ের বাড়ৈউড়িতে জন্ম তমজুদ আলীর। ধানের মৌসুম ছাড়া হাওর অবসরেই থাকে। তখন কেউ কেউ মাছ ধরে। কেউ বা বেরিয়ে পড়ে শাণের মেশিন নিয়ে। বেশির ভাগই আসে ঢাকার দিকে। এদেরই একজন আলেক মিয়া। বয়সে তমজুদ আলীর বছর দুই বড়। তবে সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। আলেক মিয়ার কাছেই কাজটা শিখেছিলেন তমজুদ। তারপর এক মৌসুমে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। তা প্রায় ১১ বছর আগের কথা।

 

ঘরের কথা

পিতা ইয়াদুল্লাহর ইচ্ছা ছিল তমজুদকে মাওলানা বানানোর। সে ইচ্ছাতেই ছোটবেলায় ভর্তি করানো হয় মাদরাসায়। কিন্তু অভাবের কারণে শেষ হয়নি পড়ালেখা। মাদরাসা ছেড়ে দিয়ে ধরতে হয়েছে লাঙলের হাতল। মাঠের কাজটা শিখে উঠতে সময় লাগে না তাঁর। বিয়েও হয় যৌবনের প্রারম্ভেই। স্ত্রী রহিমা সম্পর্কে চাচাতো বোন। একই পাড়ায় এমাথায়-ওমাথায় বাড়ি। এখন তাঁদের দু্ই ছেলে ও দুই মেয়ে। তিনজন পড়ে মাদরাসায়। আর বড় মেয়ে পড়ে স্কুলে, চতুর্থ শ্রেণিতে। রহিমাও বেশ কর্মঠ। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে দুটো পয়সা আয় করেন।

এবার শিল-পাটা

ইটের দেয়ালের ওপর টিনের চাল দেওয়া বড় বাড়ি। স্টিলের গেট পার হয়ে তমজুদকে ঢুকতে হলো ভেতরে। বাড়ির লোক শিল-পাটা ধার করাতে চায়। ৫০ টাকা চুক্তিতে কাজ শুরু করে দেন তমজুদ। শাণের মেশিনেই বাঁধা থাকে পাথর কাটার হাতুড়ি আর ছেনি। পাটা মাটিতে রেখে একটা পিঁড়ি চেয়ে নিয়ে বসে পড়েন তমজুদ। তারপর মাস্ক এটে নেন মুখে। তা না হলে পাটার মরিচের ঝাঁঝ জ্বালা ধরাবে নাক-মুখে।

 

কাজের আগে দরদাম

এ কাজে দরদামটা জটিল কিছু না। তবে অপরিহার্য।   একদামে কেউ কাজ করাতে চায় না। তাই পাঁচ-দশ টাকা বেশি চাইতে হয়। তারপর বাড়তিটা কমিয়ে কাজটা হাতে নেওয়া। ১০-১১ বছর আগে কাজের মজুরি ছিল পাঁচ থেকে দশ টাকা। সেটা এখন বেড়ে হয়েছে দশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। নতুন শিল-পাটা অনেক সময় কেটে-ছেঁটে ঠিকঠাক করার দরকার হয়। সে ক্ষেত্রে মজুরি বেশি। ৭০ থেকে ৮০, কখনো কখনো ১০০ থেকে ১৫০ টাকাও পাওয়া যায়।

ক্ষেতখামারের কাজ

ধানের দেশের মানুষ। নিজের জমি না থাকলেও চাষাবাদ থাকে। বছরে দুবার ধান লাগাতে হয়। কাজের সময় বাড়িতে চলে যেতে হয় জমি দেখাশোনা করতে। ফাঁকে ফাঁকে এসে করেন শাণের কাজও। গেল বোরো মৌসুমে সাড়ে তিন কেড় (৯৮ শতাংশ) জমিতে ধান চাষ করেছিলেন তমজুদ। দেড় কেড় জমির ধান কাটতে পারেননি। বন্যায় তলিয়ে গেছে পাকার আগেই। বাকি জমিতে যে ধান পেয়েছেন, তাতে চলে যাবে সারা বছর। চাল কিনতে হবে না। ধান তলিয়ে যাওয়ায় কোনো আফসোস নেই তমজুদের। ক্ষতিটা পুষিয়ে নিয়েছেন অন্যভাবে। তিনি আগেভাগেই চলে আসেন সাভার। বেশির ভাগ লোক তখনো দেশেই। সাভারে শাণের লোক কম থাকায় তিনি কাজটাও পেয়েছেন বেশি।

 

বাড়ির পথে

একটানা খুব বেশি দিন বাড়ি ছেড়ে থাকেন না তমজুদ। ১৫-২০ দিন পরপর চলে যান দেশে। একটানে সব থেকে বেশি ছিলেন ২৪ দিন। তা-ও মাত্র একবার। ঘরে ফেরার আনন্দ তাঁর প্রতিবারই হয় মধুর। ছেলে-মেয়েদের কিছু না কিছু আবদার থাকেই। আর আবদার না থাকলেও তিনি খালি হাতে ফেরেন না কখনোই। কিছু না কিছু নিয়ে যান সঙ্গে করে। তারাও জানে ব্যাপারটা। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বাবাকে। বাড়িতে তখন ভালো বাজারসদাই হয়। স্ত্রী যত্ন করে রান্না করেন। একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করে সবাই।

 

ছবি : লেখক


মন্তব্য