kalerkantho


দ্যাশের মানুষ

ইলিশপুরের যাত্রী

যদিও ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর জলদস্যুর তাণ্ডব আছে, তবু শাহ আলম মাঝি থেমে থাকেন না। ট্রলারের গতি আরেকটু বাড়িয়ে দেন, এগিয়ে যান সামনে। জলের রং দেখেই বুঝতে পারেন ইলিশের ঝাঁক কোন দিকে ছুটছে। চাঁদপুরের বড় স্টেশনে শাহ আলমের দেখা পেয়েছিলেন ফারুক আহম্মদ

১৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



ইলিশপুরের যাত্রী

দুই কিলোমিটার দীর্ঘ জাল আছে শাহ আলম মাঝির ট্রলারে। সাগরে জাল ফেলে ঘণ্টা ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকেন।

কোনো কোনোবার টানা ১০-১৫ দিনও নোনা জলে ভেসে থাকেন। তবে কষ্ট মনে থাকে না, যখন দাম পান ভালো।  

 

জলের মাঝে ৪০টি বছর

ভোলার দৌলতখানে শাহ আলমের জন্ম। বাবা রফিজুল ইসলামকে হারিয়েছেন শৈশবেই। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল ১৫ বছর বয়সে।

সেদিন বড় স্টেশনে খুব ব্যস্ততা। তবু শাহ আলম নিয়ে গিয়ে বসালেন ট্রলারের ডেকে। জলের মধ্যে তাঁর ৪০ বছর চলছে।

বহুবার ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর জলদস্যু মোকাবেলা করেছেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন কয়েকবার।

 

পাঁচ বছর আগে একবার

দুই-তিন দিন হয়ে গেল মাছের দেখা পাচ্ছিলেন না। মনটা খুব খারাপ ছিল। এমন সময় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। জলদস্যুর দল ট্রলার ঘিরে ফেলে। প্রথমে দা, কুড়াল নিয়ে হামলা করে। প্রতিহতের চেষ্টা করলেন শাহ আলম মাঝি ও তাঁর জেলের দল। একপর্যায়ে জলদস্যুরা শটগানের গুলি ছোড়ে। এতে অন্যরা ট্রলারের খোলের ভেতরে আশ্রয় নেন; কিন্তু শাহ আলমের সে সুযোগ নেই। হাল ধরে চলন্ত ট্রলার নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হবে। ততক্ষণে ডান হাত আর পায়ে গুলি এসে লেগেছে। রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, কিন্তু শাহ আলম হাল ছাড়েননি। টানা পাঁচ ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে তীরে ভেড়েন। এর পরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর স্ত্রী-সন্তানরা হাতে-পায়ে ধরেছিল। বলেছিল, আর সাগরে না যেতে।

 

সাগর এক মায়া

শুধু ইলিশের মৌসুমেই নয়, অন্য সময়ও মাছের টানে ঘর ছাড়েন শাহ আলম। সাগর তাঁকে টানে। সাগর যে রত্নভাণ্ডার। অন্য মৌসুমে অন্য মাছ মেলে। ঝড়ও তাঁকে থামাতে পারেনি। ১৯৯১ সালটা স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর তখন ইঞ্জিনচালিত নৌকা ছিল না। ছিল পালতোলা এক বিশাল নৌকা। সেইবার ঝড় হয়েছিল প্রচণ্ড। ছিলেন গভীর সাগরে। একে একে ৯ জন জেলে ভেসে গেল। তিনিই ছিলেন বাকি। দয়াময় প্রভু বাঁচিয়েছেন।

 

চাঁদনি রাত ছিল

ঢেউ আর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বন্ধুতা পাতিয়ে সাগরে চলতে হয়। একবার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেল। প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল ট্রলারে। জেলেরা কান্না জুড়ে দেয়। আমি বললাম, আল্লাহর নাম নাও। কিসে থেকে কী হলো, ইঠাৎই ইঞ্জিন চালু হয়ে গেল। ট্রলার চলতে শুরু করল ফের। চাঁদ উঠেছিল সে রাতে। জলের ওপর নজর গেল। কী যেন কী একটা দেখলেন। প্রথমে ভয় পাননি। তারপর ভালো করে ঠাহর করতেই মনে হলো কিছু একটা নাচছে জলের ভেতর। ‘মানুষের মতোই লাগল। চিৎকার করে সবাইকে খোলের ওপর ডাকলাম। আর দেখলাম লাল পরি, নীল পরির নাচ। সবাই মিলে উপভোগ করলাম লাল পরি, নীল পরির নাচ। ’ বলছিলেন শাহ আলম।

 

এলাম চাঁদপুর

সাগর থেকে এবার চাঁদপুর মোকামে আসতে শাহ আলমদের সময় লেগেছে তিন দিন। ৩৫ মণ ইলিশ নিয়ে এসেছেন। বললেন, ‘এক মাসের জ্বালানি আর খাবার নিয়ে সাগরে রওনা দিই। তিন বেলা মোটা চালের ভাতই খাই, তবু খরচ কম নয়। তার ওপর আছে মহাজনের দেনা। কিছু লাভের আশায় আছি। ’ 

 

এবার বাড়ি যাবেন

সব মাছ বিক্রি হয়ে গেলে এখান থেকে সোজা বাড়ি যাবেন শাহ আলম। ‘স্ত্রী ও সন্তানদের দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। বড় ছেলেটা এবার দৌলতখান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে। মেজো আর ছোট সন্তানের জন্যও জামা কিনে ফেলেছি। স্ত্রীর জন্য পালবাজার থেকে একটা শাড়ি কিনব। দুটি সংসার আমার। একটি সাগরে, আরেকটি বাড়িতে। একবার বাড়ি যাই তো আরেকবার সাগরে। ’ বলছিলেন শাহ আলম।


মন্তব্য