kalerkantho


অনন্তের কাছে পৃথিবীর চিঠি

প্রাপক ভিনগ্রহবাসী (যদি থেকে থাকো)। গোল্ডেন রেকর্ড নামের এই ফোনোগ্রাফ রেকর্ডটি তৈরি করেছিলেন কার্ল সাগান ও তাঁর দল। লোকে এটিকে বলে কসমিক পোস্টকার্ড। ১৯৭৭ সালে চিঠিটি নিয়ে যাত্রা শুরু করে ভয়েজার নামের দুটি মহাশূন্যযান। প্রথম যানটি যাত্রার ৪০ বছর পূর্ণ হবে আগামীকাল। জানাচ্ছেন আহনাফ সালেহীন

১৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



অনন্তের কাছে পৃথিবীর চিঠি

ভয়েজার প্রকল্প

নাসা ১৯৭৭ সালে ভয়েজার ওয়ান ও টু নামের জোড়া অনুসন্ধানী যান পাঠায় মহাশূন্যে। ভয়েজার টু পাঠানো হয়েছিল ২০ আগস্ট, আর ওয়ান ১৬ দিন পর ৫ সেপ্টেম্বর।

প্রাথমিক উদ্দেশ্য জুপিটার, শনি ও শনির উপগ্রহ টাইটানকে জানা। ভয়েজার ওয়ান প্রাথমিক উদ্দেশ্য শেষ করেছে ২০ নভেম্বর ১৯৮০ সালে। তারপর গেছে হেলিওস্ফিয়ারে (এটি প্লুটোর কক্ষপথ থেকেও অনেক দূরে)। ২০১২ সালে হেলিওস্ফিয়ারের কাজকর্ম সেরে আন্তনক্ষত্রমণ্ডলে ঢুকে পড়েছে। বলা ভালো অনন্তে যাত্রা শুরু করেছে। এত দিনে স্পেসক্রাফট দুটির একটি পৃথিবী থেকে ১৪ বিলিয়ন মাইল দূরে, অন্যটি ১১ বিলিয়ন মাইল। বলা হয়ে থাকে ভয়েজার হচ্ছে মানুষের তৈরি নিদর্শন, যা এখন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে আছে।

আইডিয়াটা ছিল যাত্রাপথে যদি বুদ্ধিমান ভিনগ্রহবাসীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তাহলে তাদেরকে পৃথিবী নামের এই গ্রহটির সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া।

 

একজন কার্ল সাগান (১৯৩৪-১৯৯৬)

সাগান একাধারে জ্যোতির্বিদ, মহাজগদ্বিদ এবং অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট।

তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে লিখেছেনও। বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। বিশেষ ভিনগ্রহবাসীর জীবন নিয়ে তিনি অনেক ভেবেছেন। তাঁর দ্য ড্রাগনস অব ইডেন, ব্রোকাস ব্রেইন এবং পেইল ব্লু ডট উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তিনি কসমস : আ পারসোনাল ভয়েজ নামে একটি জনপ্রিয় টিভি সিরিজ লিখেছেন। বলা হয়ে থাকে কমপক্ষে ৫০ কোটি মানুষ এটি দেখেছে। তাঁর বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বই কনটাক্ট থেকে ১৯৯৭ সালে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। নিউ ইয়র্কে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা স্যামুয়েল সাগান ইউক্রেন থেকে মার্কিন মুলুকে গিয়েছিলেন। পেশায় ছিলেন গার্মেন্ট ওয়ার্কার।

 

কী কী আছে গোল্ডেন রেকর্ডে

কার্ল সাগান সত্তরের দশকের গোড়ায়ই মহাশূন্যে বার্তা পাঠানোর কাজে হাত দিয়েছিলেন। পরে ভয়েজার ওয়ান ও টুয়ে গোল্ডেন রেকর্ড যোগ করার কথা তোলা হলে নাসা সম্মতি দিতে বেশি দেরি করেনি। তারপর থেকেই ভাবা হচ্ছিল কী কী থাকবে এতে। সভ্যতার সাক্ষ্য দেবে যে সংকলন তার সংগঠনের কাজটি বিরাট নিশ্চয়ই। সাগানের নেতৃত্বে ফ্রাঙ্ক ড্রেক, অ্যান ড্রুইয়ান, জন লোমবার্গ ও টিমোথি ফেরিসকে নিয়ে একটি দল গঠন করা হলো।

ফেরিস বলেন, আমরা ভাবতে থাকলাম অ্যালিয়েনরা আমাদের কোন সব বিষয় জানতে চাইতে পারে। মারমারস অব আর্থ বইতে (মেকিং অব দ্য রেকর্ড বিষয়ে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত) লোমবার্গ বলেছেন, নিজেকে আমি একজন ইটি (এক্সট্রাটেরিস্টেরিয়াল) বানিয়ে ফেলেছিলাম। ’

যখন আলোকচিত্র সংযোজনের কথাও ভাবা হলো তখন দলটি প্রথমে চেষ্টা করে বিভ্রান্তি তৈরি করে—এমন ছবিগুলো বাদ দিতে। যেমন যুদ্ধের ছবি। যদিও সভ্যতা বিকাশে যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, তবু যেহেতু রেকর্ডটি বন্ধুর (ভিনগ্রহের) কাছে পাঠানো হচ্ছে, তাই যুদ্ধের ছবি বাদ। তারপর রাজনীতি আর ধর্মবিষয়ক ছবিতেও কম নজর দেওয়া হলো। ১০ মাস লেগেছিল দলটির একটি খসড়া তৈরি করতে। শেষ নির্বাচনে জায়গা পেল ১১৫টি আলোকচিত্র, ৫৫টি ভাষার সম্ভাষণ, একটি ১২ মিনিট দৈর্ঘ্যের শব্দ ভাণ্ডার এবং ৯০ মিনিট দৈর্ঘ্যের সংগীতকোষ। ফেরিস মূলত সংগীতকোষে বেশি সময় দিয়েছেন। বলেছেন, হাজার হাজার সুন্দর সংগীত সৃষ্টি করেছে পৃথিবী। কোনটি রেখে কোনটি বাদ দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমার মনে হয় যাঁরা শব্দভাণ্ডার তৈরিতে কাজ করেছেন, তাঁরা আরো বিপদে ছিলেন। ’ 

এবার রেকর্ডের কিছু ছবি, শব্দ ও সংগীত নিয়ে একটু বেশি বলা যাক—

 

একজন পুরুষ ও এক গর্ভবতী

নারীর ছায়াচিত্র

ওয়ার্ল্ড বুক এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে ছবিটি নিয়েছিল সাগানের দল। তারা চেয়েছিল মানুষের আকার সম্পর্কে ধারণা দিতে। প্রথমে নেওয়া হয়েছিল আলোকচিত্রী ওয়েন এফ মিলারের একটি আলোকচিত্র, যা প্রদর্শিত হয়েছিল ১৯৫৫ সালে ফ্যামিলি অব ম্যান শীর্ষক এক প্রদর্শনীতে। কিন্তু নাসা নগ্ন ছবি দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিল। তাই পরে ছায়াচিত্র যোগ করা হয়।

 

খাওয়া, লেহন করা ও পান করা চিত্র

এমন ছবির উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মুখের ব্যবহার বোঝানো। তাই দলটি  ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি, নাসা ও স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডের সংগ্রহশালায় জোর অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু ঠিক ছবিটি তারা কোথাও পায়নি। তারপর নিজেরাই  তিনটি ছবি নিয়ে একটি ছবি তৈরি করে। এতে একজন নারীকে আইসক্রিম লেহন করতে, একজন পুরুষকে একটি স্যান্ডউইচে কামড় বসাতে ও আরেকজন পুরুষকে জগ থেকে পানি পান করতে দেখা যায়।

 

অলিম্পিক স্প্রিন্টারস

একটা ব্যাপার উল্লেখ করা দরকার, সাগানের দল সৌন্দর্যের চেয়ে তথ্যের দিকটিতে বেশি নজর দিয়েছিল। অলিম্পিক স্প্রিন্টারদের ছবি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যেমন অনেক জাতির মানুষ আছে—এমন ছবিই নির্বাচন করা হয়েছিল।

 

তাজমহল

সিটিস্কেপ দেওয়ার কথাও ভেবেছিল দলটি। কিন্তু এতে সূক্ষ্ম দিকগুলো নজর করা যায় না। তাই নির্দিষ্ট একটি বৃহৎ ও আকর্ষণীয় স্থাপনা সংযোজনের কথা ভাবা হলো। মায়ান পিরামিডও ছিল তালিকায়। কিন্তু তাজমহল সবগুলোকে ছাপিয়ে যায়।   

 

গোল্ডেন গেট ব্রিজ

রেকর্ডের চার ভাগের তিন ভাগই সংগীতের জন্য বরাদ্দ ছিল। বোঝাই যাচ্ছে, আলোকচিত্রের জন্য বরাদ্দ কম ছিল। সানফ্রানসিসকোর ওই ব্রিজের ছবিটি বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফার আনসেল অ্যাডামসের তোলা। সাগানের দল চেয়েছে ইটিদের দেখাতে, কিভাবে একটি সাসপেনশন ব্রিজ দুটি স্থলভাগকে জুড়ে দেয়। তাঁরা একটি গাড়ির শব্দও যোগ করতে চেয়েছিল ছবির সঙ্গে কিন্তু তখনকার প্রযুক্তি এত শক্তিশালী ছিল না।

 

আ পেইজ ফ্রম আ বুক

ইটিদের লিখিত ভাষার কথা বলতেই বইয়ের পৃষ্ঠা দেওয়া হয়েছে রেকর্ডে। একটি পৃষ্ঠাও দিলে হতো কিন্তু খোলা বইয়ের একটি পৃষ্ঠা তো আরো বেশি তথ্য দেয়। প্রথমে লোমবার্গ বেশ কিছু বইয়ের নাম হাজির করেছিলেন। ইংলিশ রেনেসাঁ আমলে ছবি সংযোজিত চসারের বই, শেকসপিয়ারের ১৬২৩ সালে প্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, ইউক্লিডের জ্যামিতি বইয়ের পুরনো সংস্করণ ইত্যাদি। একপর্যায়ে কথা বলতে যান এমআইটির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট ফিলিপ মরিসনের সঙ্গে। মরিসন তাঁকে স্যার আইজাক নিউটনের সিস্টেম অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইটির পাতা দিতে পরামর্শ দেন। কক্ষপথে কোনো বস্তু প্রেরণের উপায়—প্রথমবারের মতো ওই বইতেই উল্লেখ করা হয়।

 

বিভিন্ন ভাষার সম্ভাষণ

৫৫টি ভাষার সম্ভাষণ আছে রেকর্ডে। বার্মিজ সম্ভাষণটি সরল ও ছোট্ট, ভালো আছ? বাংলা সম্ভাষণ আছে—নমস্কার, বিশ্বের শান্তি হোক। ইন্দোনেশীয় সম্ভাষণটি দীর্ঘ—ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ শুভ রাত্রি, পরে আবার দেখা হবে। আমোয় নামের চীনা একটি উপভাষায় নারীকণ্ঠে সম্ভাষণ আছে—মহাজগতের বন্ধুরা ভালো আছ তোমরা? কিছু খেয়েছ? সময় পেলে আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসো। শেষ সম্ভাষণটি ইংরেজিতে। নিক সাগান (কার্ল সাগানের পুত্র) নামের ছয় বছরের একটি বালক এ সম্ভাষণ জানিয়েছে। সে বলেছে, পৃথিবী নামের গ্রহের সব শিশুর পক্ষ থেকে তোমাদের জানাই শুভেচ্ছা।

 

একটি চুম্বনের শব্দ

কিছু চুম্বনে কোনো শব্দ হয় না। কোনো কোনো চুম্বন বেশ শব্দ তৈরি করে। তাই নির্বাচনে বিপাকে পড়েছিল সাগানের দল। অবশেষে শব্দগ্রাহক জিমি আয়োভাইনের চুম্বনটিই নির্বাচন করা হয়েছিল। তিনি তাঁর নিজের বাহুতে চুম্বন করেছিলেন।

 

চাক বেরির জনি বি গুড

১৯৫৮ সালে গানটি গেয়েছিলেন চাক বেরি। কার্ল সাগানেরই প্রস্তাব ছিল। কিন্তু লোককলাবিদ অ্যালান লোমাক্স আপত্তি তুলেছিলেন। বলেছিলেন, রকগানের সবে কৈশোরকাল চলছে। সাগান উত্তর দিয়েছিলেন, পৃথিবী নামের গ্রহে অনেক কিশোর-কিশোরী আছে।

আরো অনেক কিছু আছে গোল্ডেন রেকর্ডে, যেমন হোয়েল গ্রিটিংস, প্রাণের স্পন্দন, ডিএনএ কাঠামো ইত্যাদি অনেক কিছু। দলের সদস্য ফেরিস কিছুকাল আগে বলেছেন, অনেক কিছুই দেওয়া যেত, পৃথিবী অনেক মহৎ জিনিসের মালিক কিন্তু আমরা খারাপ কিছু বাছাই করিনি। আমার কোনো আফসোস নেই এ ব্যাপারে। অন্য একটি দল করলে হয়তো অন্যরকম কিছু করত। কিন্তু আমরাও ভালো করেছি।   সূত্র : স্মিথসোনিয়ানডটকম

 

এটা একটা ভালোবাসার গল্পও

ঘটনাটা ওই ১৯৭৭ সালের গ্রীষ্মেরই। গোল্ডেন রেকর্ড দলে অ্যান ড্রুইয়ান ছিলেন ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। রেকর্ডে দেওয়ার জন্য অ্যান একটি চীনা সংগীত খুঁজছিলেন। যুত্মতো কিছু পাচ্ছিলেন না। শেষে ঘেমে-নেয়ে উঠে যখন আড়াই হাজার বছরের পুরনো ফ্লোয়িং স্ট্রিম (প্রবহমান ঝরনার অনুকরণে সৃষ্ট সংগীত) পেলেন, তখন উত্তেজনায় কেঁপে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে সাগানের হোটেলে ফোন করলেন; কিন্তু পেলেন না। শেষে একটি চিরকুট রেখে ফিরে গেলেন ডেরায়। হোটেলে ফিরে এক ঘণ্টা পরে যখন সাগান অ্যানকে ফোন দিলেন তখনই কিছু একটা ঘটে গেল। ফোন রাখার আগে তাঁরা পরস্পরকে মন দিয়ে ফেলেন। বিয়ের ব্যাপারেও আলোচনা করেন। অথচ এই ফোন কলটির আগে তাঁরা শুধু সহকারী ছিলেন, বড়জোর বন্ধু। অ্যান পরে বলেছেন, ফোন রেখে আমি কাঁদতে শুরু করেছিলাম। এটাকেই বুঝি ইউরেকা মোমেন্ট বলা হয়। যেন দুজনে মিলে একটা কিছু আবিষ্কার করেছি। ’

ওই ফোনকলের কয়েক দিন পরে অ্যান ভাবল মানুষের মস্তিষ্কের তড়িতায়িত ঘাত বা বেগ শব্দে রূপান্তরিত করে রেকর্ডে দিতে পারে। তাহলে হয়তো হাজার মিলিয়ন বছর পরে এলিয়েনরা এটা পড়ে নিয়ে বুঝতে পারবে, পৃথিবীর মানুষ কেমন করে ভাবত বা কী ভাবত। যেই না ভাবা সেই না সাগানকে বলা আর তার পরই চলে যাওয়া নিউ ইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে। সেখানেই অ্যানের মস্তিষ্কের ঘাত বা বেগ রেকর্ড করা হয়। সেই সঙ্গে শরীরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও। অ্যান পরে বলেছেন, ‘আমি ওই সময় ভাবছিলাম ভালোবাসার সৌন্দর্য নিয়ে, ভালোবাসাবাসি নিয়ে। ’

অ্যান পরে, অনেক পরে আরো বলেছেন, ‘আমার যখন মন খারাপ হয়, তখন আমি ভাবি আমাদের ভালোবাসা ঘণ্টায় ৩৫ হাজার মাইল বেগে ছুটে চলেছে মহাজগতের মহাসমুদ্রে। আমরা থাকব না কিন্তু ভালোবাসা থাকল সব মানুষের ভালোবাসার নিদর্শন হয়ে। ’

 ভয়েজারের দুটি স্পেসক্রাফট মহাশূন্যে পাঠানোর (২০ আগস্ট ১৯৭৭) দুদিন পরেই অ্যান আর সাগান তাঁদের এনগেজমেন্টের কথা ঘোষণা করেন। ১৯৮১ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। সাগানের মৃত্যু (১৯৯৬ সাল) পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা শত নয়, হাজার অথবা লাখো জন্মের সাক্ষী হয়ে থাকল।

সূত্র : রেডিওল্যাব, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১০

 

কার হাসি? 

বিটোফেনের ফিফথ সিম্ফনি, কেসরবাই কেরকর, উইলি জনসনের গান যেমন আছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লোকগীতিও আছে গোল্ডেন রেকর্ডে। আছে মাইক্রোস্কোপসহ একজন নারী, একজন মা ও শিশু, মহাশূন্যে একজন নভোচারী, ইথাকার গাড়ি, একটি খোলা বইয়ের পাতা, একটি ভায়োলিন ইত্যাদি ইমেজ। কয়েকটি ডায়াগ্রামও আছে। বেশ কিছু অডিও ক্লিপ আছে, যেগুলো দিয়ে প্রাণের স্পন্দন বোঝা যায়। যেমন সমুদ্রের গর্জন, তিমির গান, হাতির বৃংহিত, মানুষের পদধ্বনি, মানুষের হাসি ইত্যাদি। এগুলো সংযোজনের উদ্দেশ্য প্রাণের বিবর্তন বোঝানো। এই শব্দভাণ্ডারটিরই দৈর্ঘ্য ১২ মিনিট। বৃষ্টি, বাতাস, ঝিঁঝি পোকা, ব্যাঙের ডাক, হায়েনার চিৎকার, পাখির কূজনও আছে।

মুশকিল হয়েছে, ওই মানুষের হাসিটি নিয়ে। ভয়েজারের ওয়েবসাইটে হাসিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গবেষক (অ্যাড্রিয়েন লাফরেন্স, দ্য আটলান্টিকডটকমের সম্পাদক) জানতে চেয়েছিলেন, কী ধরনের হাসি সাগান ও তাঁর দল ব্যবহার করেছে? এবং এটা কার হাসি? এটা কি খুনখুনে হাসি না হিহিহি হাসি, না হাহাহা হাসি?

অনেকে ভাবছেন, এটি হলিউড ভিলেনের হাসি।

শব্দভাণ্ডারটিতে মানুষ প্রাণীটির একটি চিহ্ন হিসেবে হাসিটি এসেছে। তাই এটি ভাবনার বিষয় বটেই। লাফটার : আ সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন বইয়ের লেখক রবার্ট প্রভিন বলেছেন, হাসি অর্বাচীন নয়, প্রাচীন ব্যাপার। হাসিও মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ’

বলতে শেখার অনেক আগেই শিশু হাসে। তবে শুধু মানুষই হাসে না। ইঁদুর, শিম্পাঞ্জিও  হাসে। তবে মানুষের হাসি হাসির মতোই। মানুষ জানে হাসি বলতে কী বোঝায়, আর হাসির শব্দ কেমন হয় এবং কোন হাসির কী অর্থ। কিন্তু গোল্ডেন রেকর্ডের হাসিটা গেল কই? ভয়েজারের ওয়েবসাইটে পদধ্বনি আর হার্টবিটের সাউন্ড আছে কিন্তু হাসিটা নেই। অবশেষে নাসার একজন কর্মকর্তা জানালেন, আরো একটি ওয়েবসাইট আছে (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এটির অ্যাডমিন), যেখানে হাসিটা শোনা যায়। তো গবেষক সেটি শুনলেন এবং হাসিটা খুঁজে পেলেন। খুশি হলে মানুষ যেমন হাসে তেমন হাসি। খুব অল্প দৈর্ঘ্যের। এবার গবেষক খুঁজতে বের হলেন, হাসিটা কার? একে ওকে তাকে জিজ্ঞেস করেন কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। অবশেষে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির এলিজাবেথ ল্যানডাউ জানালেন, হাসিটি সাগানের।

গবেষক নিশ্চিত হওয়ার জন্য গেলেন শাশা সাগানের (অ্যান ও সাগানের মেয়ে) কাছে। শাশা নিশ্চিত করলেন, হ্যাঁ, মায়ের কাছ থেকে জেনেছি, হাসিটি বাবারই।

সূত্র : দ্য আটলান্টিকডটকম

৩০ জুন ২০১৭


 

ভয়েজারে গোল্ডেন রেকর্ড বসানো হচ্ছে


 

মানুষের মুখের ব্যবহার নিয়ে গোল্ডেন রেকর্ডের একটি ইমেজ


 

রেকর্ডের গোল্ড প্লেটিং


 

অ্যান ও সাগান


 

নিউটনের সিস্টেম অব দ্য ওয়ার্ল্ড


 

পুত্র নিক সাগানের সঙ্গে কার্ল সাগান

 


মন্তব্য