kalerkantho


অদম্য মানুষ

আয়শা অপরাজিতা

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আয়শা অপরাজিতা

আয়শার আঁকা প্রেম

কেরালা রাজ্য সরকারের নিরাপত্তা হেফাজতে থাকার সময়ই আয়শা কবিতা লিখতে শুরু করেন। লিখেছেন গল্পও। ছবিও এঁকেছেন। বাংলাদেশের একমাত্র লেখক আয়শা, যাঁর কবিতার বই মালয়ালমে  প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর একটি একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী হয়ে গেল যশোর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে। আরেকটি হবে ঢাকায় আমেরিকান কালচারাল সেন্টারে ২৮ মার্চ। লিখেছেন ফখরে আলম। ছবি তুলেছেন ফিরোজ গাজী

 

আয়শার মেয়েবেলা 

যশোর সদর উপজেলার অজপাড়াগাঁ কচুয়ায় আয়শার জন্ম। বাবা নিয়ামত আলী ক্ষুদ্র কৃষক। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট্ট খাল। বান্ধবীদের সঙ্গে এই খালেই লাফান-ঝাঁপান আয়শা।

খালের ওপারে রামনগর গ্রাম। রামনগর স্কুলে ভর্তি হন আয়শা। তাঁর বয়স যখন ১২, তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। বিয়ে হয়ে যায় রামনগর। আয়শার স্বামী সরাফত গ্রামের হাটে সবজি কেনাবেচা করেন। সংসার চলে খুব কষ্টে। অভাব তাড়াতে আয়শা দাদির কাছ থেকে টাকা ধার করে একটা সেলাই মেশিন কেনেন। গ্রামের মেয়েদের পোশাক বানাতে থাকেন। রোজগার হচ্ছিল টুকটাক।

আয়শা এরপর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে দর্জির প্রশিক্ষণ নেন। স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে তিনটি সেলাই মেশিন কেনেন। গ্রামের অসহায় দরিদ্র আরো কয়েকজন মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাড়িতেই ছোটখাটো একটি পোশাক তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন। এরই মধ্যে আয়শা তিন কন্যার জননী হন। তাদের নাম হীরা, অনু আর নুন।

 

রামনগর থেকে কেরালা

হঠাৎই আয়শার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে মেনে নিতে পারছিল না। ঝগড়াঝাঁটি হচ্ছিল প্রায়ই। আয়শা ভাবছিলেন ভারতে গিয়ে ডাক্তার দেখাবেন। পাসপোর্ট-ভিসাও জোগাড় করেন। স্বামীরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় সরাফতের যাওয়া হয়নি। আয়শা একাই সীমান্ত পাড়ি দেন। দিনটি ছিল ২৮ মার্চ ২০১৫। সীমান্ত পার হওয়ার পরই এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে যেচে কথা বলে। আয়শার চিকিৎসার ব্যাপারে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। বনগাঁ রেল স্টেশন থেকে আয়শা কলকাতার ট্রেনে চাপেন। ওই ব্যক্তি ও তার এক বন্ধু আয়শার সহযাত্রী হয়। ট্রেন ছাড়ার পরই আয়শা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তারপর তাঁর আর কিছু মনে নেই। তিন দিন পর আয়শার যখন জ্ঞান ফেরে নিজেকে একটি বাথরুমে বন্দি দেখতে পান। তাঁকে প্রায় প্রতিদিনই মারধর করা হতো।   কথাবার্তায় বুঝতে পারেন, তাঁরা নারীপাচারকারী। একদিন খুব ভোরে পালিয়ে যান। পুলিশের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেন। আয়শাকে পুলিশ কেরালার কালিকট মালাবার হাসপাতালে ভর্তি করে। কয়েক দিন থাকার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন আয়শা। তারপর তাঁকে কেরালার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র মহিলা মন্দিরামে থাকতে দেওয়া হয়। আশ্রয়কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ আয়শার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। স্বামী শরাফত হোসেন স্ত্রীকে উদ্ধারের জন্য কেরালায় যান। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে আয়শাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। আয়শার তখন মেয়েদের কথা খুব মনে পড়ত।

 

একটি ডায়রি ও একজন নতুন আয়শা

আশ্রয়কেন্দ্রে আয়শার সম্বল ছিল ২০১১ সালের একটি পুরনো ডায়রি। ওই ডায়রিতেই তিনি তাঁর বন্দিজীবনের কথার পাশাপাশি গল্প-কবিতা লেখা শুরু করেন। আয়শা বললেন, ‘তারপর একদিন দেখি এক কৌটা রং। আমি আঙুলে রং লাগিয়ে ছোট একটি কাগজে ছবি আঁকলাম। আশ্রয়কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ এই ছবি স্থানীয় এক চিত্রশিল্পীকে দেখায়। তিনি বেশ খুশি হন দেখে। আয়শাকে রংতুলি আর ক্যানভাস কিনে দেওয়ার কথা বলেন কর্তৃপক্ষকে। ক্যানভাস পাওয়ার পর আয়শা নির্যাতিত নারীর জীবন আঁকতে শুরু করেন। কর্তৃপক্ষ একপর্যায়ে স্থানীয় ললিতকলা একাডেমিতে তাঁর একক চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে। ‘থার্টিফোর ফিমেল বাংলাদেশ’ নামের এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন কেরালার চিত্রশিল্পী পল কাল্লানোড়ে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আর্ম অব জয়’-এর ম্যানেজিং ট্রাস্টি অনুপজির সঙ্গে আয়শার পরিচয় হয় ওই প্রদর্শনীতেই। তিনি আয়শার কাছ থেকে তাঁর গল্প-কবিতা নিয়ে ঢাকায় এক বন্ধুর কাছে পাঠিয়ে দেন। বন্ধুটি সেগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেন। পরে সেগুলো অনুপজি ও সাংবাদিক অনুপমা মিলি মালয়ালাম ভাষায় অনুবাদ করেন। ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বর কেরালার কোঝিকোড় টাউন হলে ‘এনজান এননা মুরিভু’ নামের ওই বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়। বইটির মুখবন্ধে মানবাধিকারকর্মী ড. সুনীতা কৃষাণ আয়শাকে অপরাজিতা বলে প্রশংসা করেছেন। ৮০ পাতার  বইটিতে ১৮টি কবিতা, একটি ছোট গল্প ও আয়শার আঁকা ২৪টি চিত্রকর্ম রয়েছে। প্রথম দিনই বইটির সব কপি বিক্রি হয়ে যায়। বই আর চিত্রকর্ম বিক্রি করে পাওয়া যায় ৮৫ হাজার রুপি। কেরালার ডিসি প্রশান্ত দাস আয়শার হাতে পুরস্কার তুলে দেন। পুরস্কার হাতে নিয়ে আয়শা কেঁদে ফেলেন। ডিসি জানতে পারেন, সন্তানদের জন্য আয়শার মন কাঁদছে। আয়শা তাঁকে বাড়িতে পাঠানোর অনুরোধ জানান। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কেরালা থেকে ঢাকায় ফেরেন আয়শা। সেখান থেকে রামনগর।

 

এখন আয়শা

আয়শা নবম শ্রেণিতে পড়ছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ছবি আঁকছেন। আয়শা বললেন, অতীত এখনো আমাকে তাড়া করে। প্রতিবেশীরাও নানা কথা বলে। তার পরও আমি আমার ছোট্ট টিনের চালের ঘরে ছবি আঁকছি। শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সহযোগিতায় ঢাকায় আমার একটি চিত্র প্রদর্শনী হবে (২৮ মার্চ, আমেরিকান কালচারাল সেন্টার)। এ ছাড়া নির্যাতিত নারী ও শিশুদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। ’

 

আর্তনাদের ক্যানভাস

যশোর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়শা সিদ্দিকার সাত দিনব্যাপী একক চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। ভারতের কেরালার সেফহোমে থাকার সময় যে ছবি তিনি এঁকেছিলেন, তার মধ্য থেকে কয়েকটি আর বাড়ি ফিরে আঁকা আরো কয়েকটি—সব মিলিয়ে ২৬টি চিত্রকর্ম নিয়ে এই প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মগুলো হচ্ছে রাজকন্যা, ভালোবাসা, মৃত্যু, জলপরী, বৃষ্টি, স্বপ্ন, সুন্দরবন, নৃত্য, হাতকড়া, অতীত। জলরং ও তেলরঙে আঁকা ছবিগুলোতে নারীর পৃথিবী তুলে ধরা হয়েছে।

আয়শার একটি কবিতার অংশবিশেষ

তিন বাবু

আম্মু বলে ডাকে না কেউ

আমার কাছে এসে

যত ডাকি বাবু বলে

পাশের লোকে হাসে।

তোরা আমার সোনামণি

সাত রাজারই ধন,

কত মেয়ে আছে পাশে

ভরে না তো মন।

হীরা আমার চোখের পাতা

অনু চোখের জল,

নুন যে আমার পুরো শরীর

সকল শক্তি বল।

 

আয়শার ডায়েরির একটি পাতা

 

১৮ জুন, ২০১৫

আজ প্রথম রোজা। অনেক দিন পর ভাত খেয়েছি অনেকগুলো। আলুভর্তা সরিষার তেল, কাঁচা পেঁয়াজ কাঁচা ঝাল দিয়ে তৈরি। বাঙালি আর দুটো যে মেয়ে থাকে, তারাও রোজা। কিন্তু ওরা ১০ দিন আগের বিরিয়ানির চিকেন রেখেছিল ফ্রিজে, সেগুলো গরম করে খেয়ে নিল। ওরা দুজনেই খুব খুশি। টেবিলে যে পেপারটা থাকে, সেখানে আজ শেখ হাসিনার ছবিটা দেখে সবাইকে দেখাতে ও গর্বের সঙ্গে বলতে আমার খুব ভালো লাগছিল, আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, আমি বাঙালি আর আমার বাংলাদেশ, এটা যে কী শান্তি। এখানে এসেই সেটা উপলব্ধি হলো। আর সবুজ-শ্যামল ছায়া মাটিকে খুব মনে পড়ে।


মন্তব্য