kalerkantho


তোমায় সেলাম

সবজি বেচে হাসপাতাল

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সবজি বেচে হাসপাতাল

অভাবের কারণে স্বামীর চিকিৎসা করাতে পারেননি। চার সন্তান নিয়ে বিধবা হন। সেই থেকেই স্বপ্ন হাসপাতাল করবেন। সবজি বিক্রি করেছেন, কিন্তু বেচেননি স্বপ্ন। সবজি বিক্রি করে সেই সুভাষিণী মিস্ত্রী গড়েছেন ‘হিউম্যানিটি মালটি-স্পেশালিটি হসপিটাল’। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই মহীয়সীর কথা জানাচ্ছেন মামুন মাহতাব

 

কয়েক বছর আগেও হংসপুকুরের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিল না সাধারণ মানুষ। কিন্তু সুভাষিণী মিস্ত্রীর হাসপাতালের দৌলতে আজ বেশ পরিচিত ওই এলাকা। ১৯ কাঠা জমির ওপর ৪৫ শয্যার হাসপাতাল। রয়েছেন ২০ জন ডাক্তার, ৩২ জন নার্স। লেগে রয়েছে রোগীদের ভিড়।

কিন্তু একজন মহিলা কী করে বানালেন এই হাসপাতাল? সুভাষিণী দেবী নিজেই জানালেন সেই কাহিনি।

তখন সুভাষিণী মিস্ত্রীর বয়স মাত্র ১৮। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মা। মারা গেলেন স্বামী। চার সন্তানকে নিয়ে অকূল পাথারে পড়লেন। স্বামীর মৃত্যুর শোক সামলাতে না সামলাতেই শুরু হলো জীবনযুদ্ধ। পেট চালানোর জন্য  বেছে নিলেন লোকের বাড়িতে কাজ, রাস্তা থেকে বিভিন্ন জিনিস কুড়িয়ে বিক্রি। পরে ঠাকুরপুকুর বাজারে বিক্রি করেছেন সবজি।

খেয়ে না খেয়ে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা চালানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। ছোট ছেলেকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য রাখলেন অনাথ আশ্রমে। ছোট মেয়েকেও ভর্তি করালেন স্কুলে। এভাবেই চলছিল। সেসব দিনের কথা বলতে গিয়ে সুভাষিণী দেবী বলছিলেন, ‘কোনো দিন খেয়ে কোনো দিন না খেয়ে দিন কাটিয়েছি। সারা দিন কাজ করতাম। ছেলে-মেয়েগুলো খিদার জ্বালায় কান্নাকাটি করত। সারা দিন পরিশ্রম করতাম দুবেলা দুমুঠো মুখে তুলে দিতে। ’

বয়স যত বেড়েছে, স্বপ্ন কাছে এসেছে তত। তবে পাছে লোকে হাসাহাসি করে, তাই হাসপাতাল তৈরির স্বপ্নের কথা কোনো দিন কাউকে মুখ ফুটে বলেননি। ১৯৯২ সালে সবজি বিক্রি করে জমানো টাকায় কিনলেন এক বিঘা জমি। হাসপাতাল নির্মাণের কাজে গতি দিতে বেরিয়ে পড়লেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। বললেন নিজের স্বপ্নের কথা। চাইলেন সাহায্য। তাঁর কথায়—‘চার আনা আট আনা যে যা দিত হাত পেতে নিতাম। অনেকে বেশি টাকা দিয়েছেন। অনেকে ফিরিয়েও দিয়েছেন। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। ’ সেই জমানো টাকা দিয়ে শুরু হলো হাসপাতাল তৈরির কাজ।

১৯৯৬ সালে হাসপাতালের উদ্বোধন করেন সে সময়ের রাজ্যপাল কে ভি রঘুনাথ রেড্ডি। ছয়জন ডাক্তার নিয়ে পথচলা শুরু করে হিউম্যানিটি হাসপাতাল। আজ যেখানে রয়েছেন প্রায় ২৫ জন ডাক্তার। ৩২ জন নার্স। কম খরচে এই হাসপাতালে চিকিৎসা করানো যায়। দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা আসে চিকিৎসা করাতে।

হাসপাতালে তিনটি অপারেশন থিয়েটার। রয়েছে ৪৫টি বেড, যার ১৪টিই ফ্রি। বাকিগুলোর ভাড়া সাধারণ বেডের ক্ষেত্রে ১০০ টাকা, তিন বেডের কেবিনে ৩০০ টাকা ও দুই বেডের কেবিনে ৪০০ টাকা। রয়েছে ১০ বেড বিশিষ্ট আইসিইউ, যার মধ্যে চারটি ফ্রি। প্রতিদিন বেড, ওষুধ ও ডাক্তার খরচ দুই হাজার টাকা। আউটডোরে আগে ডাক্তার দেখাতে হলে দুই টাকা করে দিতে হতো, এখন বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০ টাকা।

হাসপাতালের তরফে জানা গেছে, আগের থেকে খরচ বেড়েছে অনেক। যাঁরা অপারেশন করেন, তাঁদের ফি এক হাজার টাকা। এ ছাড়া অপারেশনের সময় যাঁরা সহযোগিতা করেন, রয়েছে তাঁদের জন্যও বরাদ্দ। আউটডোরে দিনে গড়ে দুই শর কাছাকাছি রোগী আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা তো আছেই, এ ছাড়া দূর-দূরান্ত থেকেও আসে অনেকে।

একদিন দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইটা শুরু করেছিলেন স্বামীহারা সুভাষিণী মিস্ত্রী। স্বপ্ন দেখেছিলেন, সাধারণ মানুষ অল্প খরচে চিকিৎসা পাবে। সেই স্বপ্নও সত্যি হয়েছে। কিন্তু তার পরও দম ফেলার ফুরসত নেই। আজও পরিশ্রম করেন নিরলস। নিজে খোঁজখবর নেন হাসপাতালের। রোগীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতালের সমস্যা বোঝার চেষ্টা করেন। হাসপাতালই যে তাঁর বাড়ি। আর এ কাজে পাশে পেয়েছেন ছোট ছেলেকেও। কষ্ট করে অভাবের মধ্যে অনাথ আশ্রমে পড়াশোনা করে ডাক্তার হয়েছেন তাঁর ছোট ছেলে অজয় মিস্ত্রী। মায়ের পাশে থেকে তিনিও আজ এই লড়াইয়ের সঙ্গী।

সুভাষিণী মিস্ত্রীর নতুন স্বপ্ন আরো হাসপাতাল বানাবেন। যেখানে কম পয়সায় সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাবে। যেখানে হাসপাতাল মানে কসাইখানা ভাবতে হবে না। সেই সাধ পূরণের পথে খানিকটা এগিয়েছেনও। শুধু ঠাকুরপুকুরেই নয়, সুন্দরবনের গোসাবাতেও গড়ে উঠেছে এই হাসপাতালের আরেক শাখা। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ সেখানে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে।


মন্তব্য