kalerkantho


এক যে আছে টিভির রাজ্য

মোফাজ্জল তার রাজা। ১০০ সাদা-কালো টিভির মালিক। বেশির ভাগই সচল। ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন। রক্ষা করেছেন ইতিহাস। দেখতে গিয়েছিলেন সানজাদুল ইসলাম সাফা। ছবি তুলেছেন বজলুর রহমান।

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



এক যে আছে টিভির রাজ্য

এগুলো সোনার চেয়েও দামি। ঘুমেও স্বপ্ন দেখি। ঘরে এখনো সাদা-কালো টিভি চালাই। স্ত্রী-ছেলে-মেয়েরা বিরক্ত হতে হতে এখন সয়ে গেছে। টিভি পাঁচ হাজার টাকায় কিনে বাসায় বলি ৮০০ টাকায় এনেছি। বড়লোক বাড়ির ড্রাইভার ও দারোয়ানকে বলে রাখি। তারা টিভির খবর পাঠায়

 

কেনার সঙ্গে সঙ্গে সার্ভিসিং করে ফেলেন। ন্যাশনাল, প্যানাসনিক, সনি, ওরিয়ন, গ্রুন্ডিগ, তোশিবা ইত্যাদি অনেক ব্র্যান্ডের টিভি আছে তাঁর কাছে। এগুলোর কোনোটা টিউব, কোনোটা বা চার পাওয়ালা। মোফাজ্জলের টিনশেডের তিন ঘরের বাসা। টিভি রাখার জন্য আলাদা ঘর নিয়েছেন।

তার জন্য ভাড়া গোনেন না; বরং বাড়িওয়ালার কাজকর্ম করে দেন বিনা বেতনে। এটা করছেন ২০ বছর হয়ে গেল। মোফাজ্জলের সংসার চলে পুরনো দামি ঘড়ি বিক্রি করে।

 

সংগ্রহের নেশা পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে। বাবা রেডিও-ঘড়ি মেরামত করতেন। গ্রামগঞ্জে তখন রেডিও চলত বেশি। টিভি সংগ্রহের কথা সেভাবে কেউ চিন্তাও করেনি। কারণ একটা টিভির টাকা দিয়ে এক টুকরা জমি পাওয়া যেত। মোফাজ্জলের জন্ম ১৯৭৩ সালে। মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছেন বাবার কাছে। রেডিও-টিভির কথাও বলতেন বাবা।

 

ধানক্ষেতে টিভি দেখা

শুনলেন রাতে টিভিতে গোলাপি এখন ট্রেনে ছবিটি দেখাবে। বন্ধুদের নিয়ে নদী পার হয়ে পাশের গ্রামে গেলেন। কারণ ওখানে টিভি আছে। পরদিন ক্লাসে পড়া পারলেন না। সহপাঠিরা শিক্ষককে বলে দিল, মোফাজ্জল কাল টিভি দেখতে গিয়েছিল। স্যার দিলেন পিটুনি। বাবাও জানলেন কথাটি। কয়েক দিন পর ওই শিক্ষক নিজের টর্চ মেরামত করতে বাবার দোকানে যান। বাবা বলেছিলেন, মাস্টার সাহেব, টিভি দেখে কিন্তু শেখাও যায়। বইয়ের পড়ার বাইরেও তো শেখার আছে। একদিন দেখবেন মানুষের পকেটেও টিভি ঢুকে পড়বে।

মোফাজ্জল ভাবতে থাকলেন, পকেটে কিভাবে টিভি থাকবে? এটা কী করে সম্ভব? একদিন ভাবলেন, ধানক্ষেতে বসে টিভি দেখবেন। তখন তাঁর বয়স ১৪। ঢাকার গোপীবাগে মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। এক সারাই দোকানে চার ইঞ্চি মাপের একটি টিভি দেখলেন। ওরিয়ন কম্পানির টিভি। আমেরিকা থেকে কিনে আনা হয়েছিল টিভিটি। ভাবলেন, এটা নিয়ে তো ধানক্ষেতে চালানো যাবে। মামার কাছে টিভিটি কিনে দেওয়ার বায়না ধরলেন। ওদিকে সারাই দোকানের কিশোর তিন হাজার টাকার কমে বেচবে না। ঠিকানাটা মনে রাখলেন মোফাজ্জল। বাড়ি ফিরে গেলেন টাকা জোগাড়ের আশায়। বাবার কাছ থেকে তত দিনে ঘড়ি মেরামতের কাজ অনেকটাই শেখা হয়ে গেছে। সেটা করে এক মাসে কিছু টাকা জোগাড় হলো। মামাও কিছু দেবেন বলেছেন। তাই ঢাকায় এলেন মোফাজ্জল। কিন্তু সারাইকারী ছেলেটি বলল, না, এখন আর টিভিটা বেচব না। আম্মু মানা করেছেন। মোফাজ্জল ছেলেটির আম্মুর কাছে গিয়ে বললেন, ‘খালাম্মা, গরিব মানুষ, টিভি কিনতে পারি না। দান মনে করে হলেও দেন। আপনার ছেলে তিন হাজার টাকা চাইছিল। ওই টাকা আনছি। ’

খালাম্মা রাজি হলেন। দূর থেকে এসেছে জেনে যাতায়াত খরচ বাবদ ৫০০ টাকা ফেরতও দিলেন।

গ্রামে বন্ধুরা ছোট টিভি দেখে ভিড় করল। প্রশ্ন করল, এটা কী? মোফাজ্জল বললেন, আমি টিভি আনছি, তোরা ব্যাটারি কিনে আন। ওই টিভি চালাতে ছয়টি ব্যাটারি লাগে। বিটিভিতে ১০টায় ছায়াছন্দ। ক্ষেতের আইলে ১০-১২ জন বসে টিভি ছাড়তেই গান হলো, ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে আমি আর বাইতে পারলাম না। ’

 

চার ইঞ্চির আরেকটি পুরান টিভি

১৯৯৪ সালে বিয়ে করেছেন মোফাজ্জল। বিয়ের ভিডিও এডিট করতে একটা দোকানে গেছেন। সেখানে একটা চার ইঞ্চি মাপের পুরান টিভি দেখলেন। মালিক জানিয়ে দিলেন, বিক্রি হবে না। ছয় মাস ঘোরার পর চার হাজার টাকায় কিনে আনলেন।

 

ওমেগা ঘড়ির বিনিময়ে

প্রায় বছর দশেক আগে মোহাম্মদপুরে এক প্রাইভেট কার চালক একটা দোকানে টিভি নিয়ে আসেন মেরামত করার জন্য। মোফাজ্জলের টিভিটা পছন্দ হয়। টিভিটা কেনার কথা জানালেন। তখন তাঁর হাতে একটি ওমেগা ঘড়ি। ড্রাইভার দিতে রাজি হলেন, তবে ঘড়িটার বিনিময়ে। নগদ টাকা তাঁর চাই না। সেকেন্ড হ্যান্ড ঘড়িটার দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা। মোফাজ্জল ভাবলেন, ঘড়ি মেরামত করাতে অনেকে আসেন। কোনো একদিন একটা ওমেগা ঘড়িও আসবে। তাই ঘড়িটা দিয়ে দিলেন ড্রাইভারকে। টিভিটি নিলেন।

 

ফেরিওয়ালাকে ফিট করেছিলেন

গুলশানের এক শিল্পপতির বাড়ির গাড়িচালক পুরনো একটি টিভির খবর দিলেন। গিয়ে দেখেন গ্যারেজে পড়ে আছে। সনির চার পাওয়ালা ২০ ইঞ্চি পর্দার শাটার টিভি। গৃহকর্ত্রীকে কেনার আগ্রহের কথা জানালেন। তিনি পরিষ্কার করে কিছু বললেন না। গৃহকর্তা এলে তাঁর মতামত নিয়ে জানাবেন। আবার গেলেন। গৃহকর্তা খেপে আগুন, ‘এ আমার বাবার জিনিস। কিছুতেই বিক্রি করব না। ’ মোফাজ্জল বললেন, স্যার, তাঁর জিনিস তাহলে এভাবে ফেলে রাখছেন, আমি বরং যত্নে রাখ

 

ব। কর্তা আরো রেগে গেলেন। বলতে গেলে, একরকম বের করে দিলেন। পরে এক ফেরিওয়ালাকে ফিট করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, টিভিটি আনতে পারলে পাঁচ হাজার টাকা দেবেন। ফেরিওয়ালা গৃহকর্ত্রীকে পটিয়ে তিন হাজার টাকায় কিনে এনেছিল টিভিটি।

 

প্রথমে ফেরিওয়ালা, পরে টিভি মেকার

আট বছর আগের ঘটনা। একদিন খবর পেলেন, আমেরিকা থেকে আনা টিভি। এখন নষ্ট। ম্যাডাম খুব কড়া, তাই বাড়ির দুই দারোয়ান রাজি হলেন না। তবে আরেকজন দারোয়ান ছিলেন। তিনি গিয়ে বললেন, ম্যাডাম, নষ্ট টিভিটা আমাকে দিয়ে দেন। আমি ঠিক করে চালাব। ম্যাডাম দিলেন না। এরপর একদিন ওই দারোয়ান জানালেন, ম্যাডাম, কিছু পুরনো জিনিস বিক্রি করব, আপনি আসেন। ফেরিওয়ালা সেজে বাসায় গেলেন মোফাজ্জল। নষ্ট টিভিটার সামনে একটি এলসিডি টিভি রাখা। মোফাজ্জল জানালেন, ‘সে টিভি ঠিক করতেও জানে। আরো অনেক মনরাখা কথাও বলেছিল ম্যাডামকে। কিন্তু সেদিন টিভিটা বিক্রি করেননি ম্যাডাম। কয়েক দিন পর আবার জানলেন, এলসিডি টিভিটা নষ্ট হয়ে গেছে। দারোয়ানকে ম্যাডাম বলেছেন মোফাজ্জলকে খবর দিতে। মোফাজ্জল গিয়ে এলসিডি টিভিটা নিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁর মনে ওই পুরান টিভিটা। এলসিডি টিভিটা সারিয়ে ম্যাডামকে দিতে গেলেন। একটা ফন্দিও আঁটল। বললেন, ম্যাডাম সমস্যা তো এলসিডিতে না। ওই পুরনো টিভিটায় সমস্যা। পুরনোটা না সরালে এটা পুরোই নষ্ট হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে গৃহকর্ত্রীর নির্দেশ—হটাও, গ্যারেজে রাখো। দারোয়ান আবার বুদ্ধি করে বললেন, এটা গ্যারেজে রেখে কী হবে ম্যাডাম, বিক্রি করে দেন। ম্যাডাম রাজি হয়ে গেলেন।

 

পুলিশে ধরল

১৯৯৫ সালে টিভি খুঁজতে চট্টগ্রামে যান। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কিছু পাননি। ঢাকা ফেরার সময় কুমিল্লা আর নোয়াখালীর মাঝামাঝি এক জায়গায় গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। সেই ফাঁকে গাড়ি থেকে নামলেন। বাজার ঘুরতে ঘুরতে এক টিভি সারাইকারীর দোকানে গেলেন। দেখতে পেলেন আট ইঞ্চি মাপের একটি তোশিবা টিভি। টিভির টানে অনেক সময় গেল। ফিরে এসে দেখেন বাস চলে গেছে। সারাই দোকানে গিয়ে আবার খোঁজ চালালেন। জানলেন, টিভির মালিক আগামীকাল আসবেন। রাত নামতে থাকল। থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে পেলেন ইটভাটা। শ্রমিকদের সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লেন। পরদিন টিভির মালিক জানালেন, চার হাজার টাকা হলে বিক্রি করবেন। মোফাজ্জল দরাদরি করে তিন হাজার টাকায় রফা করলেন। কিন্তু তাঁর কাছে তখন ছিল দুই হাজার টাকা। হাতে একটি সিকো ফাইভ ঘড়ি ছিল। ৫০০ টাকায় তা বিক্রি করলেন। বাকি টাকার জন্য আট দিন মজুর হিসেবে খাটলেন ইটভাটায়।

টিভি নিয়ে বিকেলে বাসে চড়ে রাত ১০টায় সায়েদাবাদে নামলেন। টিভি দেখে পুলিশ জিজ্ঞেস করল, এটা কোথা থেকে? মোফাজ্জল জানালেন, মেকারের কাজ করেন, নোয়াখালী থেকে এনেছেন। পুলিশ বলে, ‘চেহারা দেখে তো মেকার মনে হয় না। টিভির কাগজ দেখান। ’ কাগজ না থাকায় পুলিশ চুরি বলে ভাবল। কূলকিনারা না পেয়ে মোফাজ্জল শেষে বলেন, টিভি সংগ্রহ করি। পুলিশ ধমক দিয়ে বলে, ‘কয় টাকার মালিক তুই, টিভি সংগ্রহ করিস? কয়টা টিভি আছে তোর কাছে?’ কেউ বিশ্বাস করল না। থানায় নিয়ে গেল। থানায় গিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার দেখা পেল। একসময় ওই কর্মকর্তার ঘড়ি ঠিক করে দিয়েছিলেন মোফাজ্জল। তিনি মোফাজ্জলকে চিনতে পেরে চিৎকার দিলেন। তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে বললেন।

 

শাড়ির টাকায় টিভি

ঈদের কয়েক দিন আগে স্ত্রী জমানো টাকা বের করে মোফাজ্জলকে দিলেন শাড়ি কিনতে। যাওয়ার পথে রিকশায় বসে টিকাটুলিতে একটা ছোট টিভি দেখলেন। ১৪ ইঞ্চি, ন্যাশনাল টিভি। স্ত্রীও ছিল সঙ্গে। ভাবলেন, টিভিটা কেনা দরকার। মার্কেটে গিয়ে শাড়ি দেখতে থাকলেন। স্ত্রীর পছন্দ হচ্ছে, কিন্তু মোফাজ্জল তাতে সায় দিচ্ছেন না। শেষে স্ত্রীকে বললেন, এই মার্কেটে ভালো শাড়ি নেই, আজকে থাক আগামী দিন তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেব। স্ত্রী রাজি, তাঁকে রিকশায় তুলে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। তারপর গেলেন টিকাটুলি। সাড়ে তিন হাজার টাকায় টিভিটা কিনে ফেলেন। সেদিন আর বাসায় ফেরেননি। এক আত্মীয়ের বাড়ি টিভি রেখে পরদিন সকালে বাসায় গিয়ে বলেন, টাকা হারিয়ে ফেলেছেন। কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বলে, টিভি কিনে ফেলেছেন। তবে কথা রেখেছিলেন মোফাজ্জল। স্ত্রীকে ঈদের আগেই একটি ভালো শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন।

 

বিয়ে করিয়ে টিভি

১৯৯৭ সালের ঘটনা। একজনের বাসায় আশির দশকের ওরিয়ন কম্পানির একটি ১৪ ইঞ্চি টিভি দেখলেন। কিনতে চাইলে গৃহকর্তা জানালেন, অনেক শখের টিভি, বিক্রি করবেন না। যা-ই হোক, কর্তার একটি বিবাহযোগ্য মেয়ে আছে, তা জানতে পেরে ফিরে এলেন। কয়েক দিন পর একটা ভালো পাত্র নিয়ে গেলেন ওই বাড়িতে। দুই পক্ষেরই বনিবনা হলো। পাকা হলো বিয়ের দিন-তারিখ। পাত্রকে মোফাজ্জল বললেন, একটা জিনিস চাই ভাই তোমার কাছে। ওই তোমার হবু শ্বশুরের টিভিটা। পাত্র সেটি চাইতেই শ্বশুর অবাক হয়ে বললেন, তোমাকে একটা নতুন টিভি কিনে দিই, পুরনোটা দিলে লোকে কী বলবে? কিন্তু পাত্রের ওই পুরনো টিভিটাই চাই। অগত্যা টিভি পেলেন মোফাজ্জল।

 

কমলাপুর স্টেশনে রাত

একবার দুই মাসের বাসাভাড়া বকেয়া পড়েছিল। বাড়িওয়ালা প্রতিদিন না পৌঁছানো পর্যন্ত বসে থাকতেন। সবে ভাড়ার জন্য পাঁচ হাজার টাকা সংগ্রহ করেছেন। একজন খবর দিল একটা টিভি আছে। এখন গেলে কিনতে পারবেন। কোনো চিন্তা না করে কিনে ফেললেন। এখন তো আর বাসায় যেতে পারছেন না। টিভি নিয়ে ঘুরছেন। থাকলেন ওই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে।

 

ছবি: আজিম রানা


মন্তব্য