kalerkantho


লোকনায়ক

নজরুল ইসলাম খান

আকস্মিক এক অশান্তির শিকার হয়েছিল ময়মনসিংহের চুরখাই। গরু চুরির হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। তাই মাঠে নেমেছিলেন নজরুল ইসলাম খান লেবু ভাই। নিয়ামুল কবীর সজল জানাচ্ছেন আরো অনেকটা

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নজরুল ইসলাম খান

লেবু ভাইয়ের নিজের হাতিয়ার ছিল তীর-ধনুক, সাড়ে তিন হাত লম্বা একটি রাম দা, টর্চলাইট, হকি স্টিক, বাঁশি ও কাঁসর ঘণ্টা। ২০০৪ সালের ১ নভেম্বর লেবু ভাই এসব অস্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন আনসার ভিডিপি জাদুঘরে। ডাকাতমুক্ত হওয়ার পর লেবু ভাই পাড়াইলের সামাজিক উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছিলেন

চুরখাইয়ে অনেক গরুর খামার। শান্তিতেই ছিল খামারিরা। গরু চুরির ঘটনা ঘটতে শুরু করে হঠাৎই। যাদের গরু খোয়া যায়নি, তারাও ছিল দুশ্চিন্তায়। কয়েক শ খামারি দিশাহারা হয়ে পড়েছিল।

মানুষের বিপদ-আপদে পাশে থাকা লেবু ভাইয়ের জন্য নতুন কিছু নয়। চুরখাইয়ের ঘটনা জানতে পেরে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসেন। যোগাযোগ করেন কোতোয়ালি থানায়। কামরুল ইসলাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ওদিকে লেবু ভাই স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন আমরা কজন শিল্পীগোষ্ঠী ও মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক কল্যাণ সংঘের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এগিয়ে আসেন শহীদুল ইসলাম শহীদ, আব্দুল আলীম, নুরুল ইসলাম প্রমুখ। যোগাযোগ করেন গ্রামের আরো সব লোকের সঙ্গে। শেষে ২২ ফেব্রুয়ারি নাজিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জড়ো হয় চুরখাইয়ের লোকজন। কোতোয়ালি থানার পুলিশ কর্মকর্তারাও যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে থানার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলামও ছিলেন। সভায় গ্রামের বাসিন্দারা গরুচোরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এলাকাবাসী পুলিশের সহযোগিতা চায়। পুলিশও সহযোগিতা চায় গ্রামবাসীর। পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় একটি টহল গাড়ি। এলাকাবাসী কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে পাহারা বসায়। তারপর থেকে চুরখাইয়ে নতুন করে গরু চুরির ঘটনা ঘটেনি। একটা উদাহরণ সৃষ্টি করলেন লেবু ভাই। লেবু ভাই অবশ্য বেশি কৃতিত্ব দেন প্রশাসন আর গ্রামবাসীকে।     

 

পাড়াইল দিয়ে শুরু

সদর উপজেলার পাড়াইল গ্রাম খুব ভুগছিল মাস্তানদের অত্যাচারে। ১৯৯৪ সালের কথা। লেবু ভাই পাড়াইলের ৩২ জন নারী ও ৩২ জন পুরুষ নিয়ে একটি শান্তি কমিটি গঠন করেন।   লাঠিসোঁটা বানিয়ে নিয়েছিল শান্তি কমিটির লোকেরা। সন্ত্রাসীরা কোথাও আক্রমণ চালালে বাজাত কাঁসর ঘণ্টা। বাঁশিতে দিত ফুঁক। জড়ো হয়ে যেত কমিটির সব সদস্য। তারপর লেবু ভাই উদ্যোগ নিয়ে আনসার ভিডিপি ক্লাবও গড়ে তোলেন। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করে পাড়াইলবাসী। একপর্যায়ে তারা তীর-ধনুকও হাতে তুলে নিয়েছিল। পাড়াইলবাসীকে অত্যাচার থেকে বাঁচাতে ময়মনসিংহের তৎকালীন পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক ও আনসার কর্মকর্তারাও সহযোগিতা দিয়েছিলেন। লেবু ভাই বিশেষ করে নাম করেন অধ্যাপক ডাক্তার মীর্জা হামিদুল হকের। তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা একে একে এলাকা ছাড়তে থাকে। অস্ত্র, গুলিসহ ধরা পড়ে ২৫ জন কুখ্যাত ডাকাত। লেবু ভাই পাড়াইলের নারীদের ভূমিকার কথাও ভোলেননি। লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁরাও ডাকাতদলের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তখন লেবু ভাইয়ের নিজের হাতিয়ার ছিল তীর-ধনুক, সাড়ে তিন হাত লম্বা একটি রাম দা, টর্চলাইট, হকি স্টিক, বাঁশি ও কাঁসর ঘণ্টা। ২০০৪ সালের ১ নভেম্বর লেবু ভাই এসব অস্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন আনসার ভিডিপি জাদুঘরে। ডাকাতমুক্ত হওয়ার পর লেবু ভাই পাড়াইলের সামাজিক উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছিলেন। সুতিয়া নদীর ধারে বৃক্ষরোপণ করেছিলেন। গ্রামের স্যানিটেশন ব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটান। বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। পাড়াইল এখন একটি আদর্শ গ্রাম। প্রশাসনের কর্মকর্তারা গ্রামটিকে সাহসী ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।

 

স্বীকৃতিও পেয়েছেন

১৯৯৮ সালের ১০ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অবদান রেখে অসীম সাহসিকতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে লেবু ভাই পেয়েছেন ভিডিপি পদক। ২০১৩ সালে আনসার ভিডিপি একাডেমি থেকে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সেবা পদক। একই বছর তিনি রাষ্ট্রপতি সেবা পদকও (ভিডিপি সেবা পদক) লাভ করেন। উল্লেখ্য, নজরুল ইসলাম খান লেবু বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য।

           

ছবি : সংগ্রহ ও জাহাঙ্গীর কবীর জুয়েল


মন্তব্য