kalerkantho


পথিকৃৎ

আছ হৃদ-মাঝারে

৮ মার্চ নারী দিবসে গুগলের ডুডলটি অনেকেই দেখেছেন। এতে ১৩ জন কীর্তিমান নারীর কথা বলা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজনকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বুশরা নাজরীন ও সৈয়দ আশফাকুল হাসান

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আছ

হৃদ-মাঝারে

৮ মার্চ গুগল ডুডলের প্রথম স্লাইড

ডুডলটির প্রথম স্লাইডে দেখা যাচ্ছে একজন দাদি তাঁর নাতনিকে গল্প শোনাচ্ছেন। সেসব মানুষের গল্প, যাঁরা তাঁর নায়িকা।

গল্প শুনতে শুনতে নাতনি মহীয়সী সেই নারীকে কল্পনা করতে থাকে। দাদির ১৩ জন নায়িকা হলেন আমেরিকার সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী ইডা ওয়েলস, মিসরের প্রথম নারী পাইলট লতিফা এল নাদি, মেক্সিকোর শিল্পী ফ্রিদা কাহলো, ইতালিতে জন্ম নেওয়া ব্রাজিলের স্থপতি লিনা বো বার্দি, বধির ও অন্ধদের জন্য যোগাযোগ সূত্র তৈরির সোভিয়েত গবেষক ওলগা সকোরোখোদোভা, দক্ষিণ আফ্রিকার সংগীতশিল্পী ও মানবাধিকারকর্মী মিরিয়াম মাকেবা, আমেরিকার প্রথম নারী মহাকাশচারী স্যালি রাইড, তুরস্কের প্রত্নতাত্ত্বিক হালেত কাম্বেল, বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার প্রগ্রামার আডা লাভলেস, ভারতের নৃত্যশিল্পী রুকমিনি দেবী, আর্জেন্টিনার প্রথম ডিগ্রিধারী নারী চিকিৎসক সেসিলিয়া গ্রিয়েরসন, কোরিয়ার প্রথম নারী উকিল লি তাই-ইয়ং এবং ফরাসি টেনিস চ্যাম্পিয়ন সুজান লেংলেন।

মিসরের লতিফার জন্ম কায়রোর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯০৭ সালে। প্রাইমারি স্কুল পাসের পর বাবা তাঁর বিয়ের কথা ভাবছিলেন; কিন্তু মা তাঁকে উৎসাহ দেন আরো পড়ার জন্য। লতিফা ফ্লাইং স্কুল নিয়ে একটি লেখা পড়েছিলেন, স্কুলটি কায়রোতে সদ্যই স্থাপিত হয়েছিল। বাবা রাজি ছিলেন না; কিন্তু মায়ের উৎসাহ তাঁকে বাধা ডিঙাতে সাহসী করে। লতিফা সোজা চলে যান ইজিপ্ট এয়ারের পরিচালক কামাল এলওয়ির কাছে। কামাল তাঁকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেন। কিন্তু খরচ জোগানোর সামর্থ্য ছিল না লতিফার।

তাই তিনি বিনিময় হিসাবে ফ্লাইং স্কুলের টেলিফোন অপারেটরের কাজ করতেন। ১৯৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর লতিফা পাইলটের লাইসেন্স পান। তিনি আফ্রিকা মহাদেশ ও আরব অঞ্চলের প্রথম নারী পাইলট।

সোভিয়েত রাশিয়ার ওলগা জন্মেছিলেন ১৯১১ সালে। তাঁর বাবা যুদ্ধে (১৯১৪) গিয়ে আর ফেরেননি। তাঁর মা একজন পাদ্রীর বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে তিনি পাঁচ বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান। ১৯২২ সালে মা মারা যাওয়ার পর তাঁকে ওডেসার একটি অন্ধ স্কুলে পাঠানো হয়। ১৯২৫ সালে ওলগা খারকিভের অন্ধ-বধির স্কুলক্লিনিকে যোগ দেন।

তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, লেখিকা, শিক্ষিকা ও থেরাপিস্ট। পরে তিনি সোভিয়েত একাডেমি অব পেডাগগিক্যাল সায়েন্সে পৃথিবীর একমাত্র অন্ধ-বধির গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৪৭ সালে তাঁর বই হাউ আই পারসিভ দ্য ওয়ার্ল্ড প্রকাশিত হয়। কিভাবে তিনি স্পর্শ, গন্ধ, কম্পন, তাপমাত্রা এবং স্বাদ গ্রহণ ও অনুভবের উচ্চতর মাত্রা অর্জন করেছেন, তার বর্ণনা আছে বইটিতে। তিনি ১৯৮২ সালে মারা যান।

দক্ষিণ আফ্রিকার মিরিয়াম মাকেবা জন্মেছেন ১৯৩২ সালে জোহানেসবার্গে। তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৮ দিন, তখন তাঁর মাকে জেলে পাঠানো হয়। তাই বলা যায়, মাকেবার পৃথিবী শুরু হয়েছে জেলখানায়। পরে অবশ্য তাঁকে নানির কাছে প্রিটোরিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানেই তিনি চার্চ ও স্কুলের কয়্যার দলে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে তিনি যান সোফিয়াটাউনে। সেটি যেন গানেরই দেশ। পথে পথে আফ্রিকান জ্যাজ ছড়ানো। মাকেবা কয়েকটি গানের দলের সঙ্গে গাইতে থাকেন। অভিনয়েও নাম লেখান। ১৯৫৯ সালে তিনি একটি প্রামাণ্যচিত্রে অংশ নেন। এ কারণে তিনি সরকারের রোষানলে পড়েন। তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান এবং ১৯৬৫ সালে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন। তিনি তাঁর খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার নিপীড়িত মানুষের কথা পৌঁছে দিতে থাকেন। তাঁর মৃত্যুর পর নেলসন ম্যান্ডেলা বলেন, তাঁর কণ্ঠে নির্বাসনের ব্যথা ছিল আর ছিল মুক্তির আশা।

তুরস্কের হালেত তুরস্কের প্রধানতম প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল কেইহান নদীর আশপাশে খননকাজ পরিচালনা করেন। তিনি কারাটেপে একটি জাদুঘরও প্রতিষ্ঠা করেছেন। ১৯৪০ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর জন্ম ১৯১৬ সালে বার্লিনে। তাঁর বাবা হাসান কেমিল বে ছিলেন মিলিটারি অ্যাটাশে। মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ১৯৩৬ সালে সামার অলিম্পিকেও অংশ নিয়েছেন। অলিম্পিকে অংশ নেওয়া তিনিই প্রথম মুসলিম নারী। ২০১৪ সালে তিনি মারা যান।

আর্জেন্টিনার প্রথম ডিগ্রিধারী নারী চিকিৎসক সেসিলিয়া গ্রিয়ারসনের জন্ম ১৮৫৯ সালে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনার খুব কম মেয়েই মাধ্যমিক স্কুলে যেত। আর গ্রিয়ারসন সেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনি মানবাধিকার বিষয়েও কাজ করে গেছেন ক্লান্তিহীনভাবে, বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য এবং দাস ব্যবসা বন্ধ করার জন্য। তিনি আর্জেন্টিনায় প্রথম নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যাম্বুল্যান্সে অ্যালার্ম বেল রাখার কথাটি তিনিই প্রথম তুলেছিলেন।

নৃত্যশিল্পী রুকমিনি দেবীর জন্ম ১৯০৪ সালে ভারতে। ভারতনাট্যম পুনরুদ্ধারের কৃতিত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। এ নৃত্যশৈলী লুকিয়ে ছিল হাজার বছরের ঐতিহ্যে। তিনি নৃত্যধারার আধুনিকায়নেও ভূমিকা রাখেন। এর সংগীত, নৃত্যভঙ্গি এবং পোশাকেরও উন্নতি ঘটান। তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে মিলে চেন্নাইতে কলাক্ষেত্র একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩৬ সালে। প্রাণী অধিকার রক্ষায়ও কাজ করে গেছেন তিনি। ভারতের প্রাণী অধিকার সংরক্ষণ বোর্ডের তিনিই প্রথম সভাপতি (১৯৬২ সাল)। প্রাণীর প্রেমে পড়ার ঘটনা তিনি এভাবে উল্লেখ করেছেন, একদিন আমি রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে শাড়িতে টান অনুভব করি। পেছন ফিরে দেখি একটি বানর, খাঁচায় বন্দি। মুক্ত হওয়ার জন্য আমার সাহায্য চাইছে। আমি উপলব্ধি করলাম, বানরটি আমাকে একটি কাজ দিয়ে গেল।

 


মন্তব্য